মা আনন্দময়ী
প্রণবেশ চক্রবর্তী

সেই দিনটা ছিল মধ্য বৈশাখ মাসের শেষ রাত্রি। ১৮৯৬ সালের ৩০ এপ্রিল। অনন্ত প্রকৃতির অপার লীলাভূমি ত্রিপুরা জেলার খেওড়া গ্রামের আকাশ সেদিন সেই কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থী তিথিতে সন্ধ্যা থেকেই ঘোর মেঘাচ্ছন্ন। রাত যতই বাড়তে থাকে মেঘও ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে। তারপর একসময় আকাশ জুড়ে দেখা দিল আলোর ছ’টা। সেই আলোর বন্যায় ভেসে গেল খেওড়া গ্রাম। জ্যোতির্ময় হয়ে উঠল দরিদ্র ব্রাহ্মণ, বিপিনবিহারী ভট্টাচার্যের কুটির। আর সেই স্বর্গীয় আলোতেই বিপিনবিহারীর পত্নী মোক্ষদা সুন্দরীর কোল আলো করে যে শিশুকন্যা আবির্ভূতা হলেন—সেই শিশু কন্যা কিন্তু অন্যান্য নবজাতকের মতো জন্মের পর কাঁদেনি—বরং এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম ঘটিয়ে মহানন্দে হেসেছিল।

ma anandamayi

জন্মসিদ্ধা নির্মলার অলৌকিক লীলার শুরু সেই জন্মলগ্ন থেকেই—পরবর্তীকালে যিনি মা আনন্দময়ী রূপে তাঁর অপার যোগবিভূতির মহিমায় বিশ্বজনকে মোহিত করেছেন।

একদিন শিশু নির্মলা তাঁর বাবা বিপিনবিহারীকে প্রশ্ন করেন, ‘আচ্ছা বাবা, হরি নাম করলে কী হয় ?’ শিশুকন্যার মুখে এই প্রশ্ন শুনে পরম ভক্ত বিপিনবিহারী জবাব দেন, ‘হরির নাম গান করলে যে হরিকে দেখা যায় মা।’ এবার মেয়ের দ্বিতীয় প্রশ্ন, ‘হরি কি খুব বড় নাকি বাবা ?’ সরল শিশুর মুখে এই প্রশ্ন শুনে আনন্দ পান বিপিনবিহারী, বলেন, ‘হ্যাঁ গো, হরি যে খুব বড়।’ কিন্তু কত বড় ? পাঁচ বছরের শিশুকন্যা ভেবেই পায় না। শেষ পর্যন্ত সামনের মাঠটা দেখিয়ে পিতাকে প্রশ্ন করেন, ‘এই মাঠের মতো বড় ?’

লোকনাথ ব্রহ্মচারী
প্রণবেশ চক্রবর্তী

এখন আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এই বাংলাদেশকেই বলা হত পূর্ববঙ্গ। সেই পূর্ববঙ্গের মুড়াপাড়া গ্রামের ব্রাহ্মণ জমিদাররা ছিলেন ধনে-জনে আভিজাত্যে বিখ্যাত।

এই জমিদার পরিবারের তৎকালীন প্রধান পুরুষ ছিলেন পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়—যিনি অন্যসব দিক থেকে সুখী মানুষ হলেও একটা ব্যাপারে তিনি সবসময় ভিতরে ভিতরে দুঃখের জ্বালা বহন করতেন। বাইরে তিনি সদাহাস্যময় কিন্তু ভিতরে তাঁর দীর্ঘশ্বাসের ঝড়। কারণ, তাঁর দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে তিনি তখনও কোনও পুত্রসন্তানের জনক হতে পারেননি। ফলে সকলের আড়ালে তিনি মাঝে মাঝেই হতাশায় আক্রান্ত হয়ে পড়তেন, অবসাদে বিপন্ন বোধ করতেন এবং এই জমিদারির ভবিষ্যৎ ভেবে বিমর্ষ হয়ে পড়তেন।

loknath baba

জীবনের এরকমই এক সঙ্কটাপন্ন সময়ে তিনি লোকমুখে শুনলেন, ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ মহকুমার বারদী গ্রামে একজন বিস্ময়কর অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্রহ্মচারী বাস করেন। নাম তাঁর লোকনাথ ব্রহ্মচারী। তাঁর আসল বয়স কেউ জানে না, তবে সবাই বলে, তাঁর বয়স নাকি দেড়শ বছর। তাঁর চোখের পলক পড়ে না, চোখের তারা স্থির। সুদীর্ঘকাল হিমালয়ে বরফের বুকে বসে সাধনা করে তিনি সমতলে নেমে এসেছেন। এখন অবস্থান করছেন বারদী গ্রামে। এই বারদী গ্রামের নাগবাবুরাও তাঁর পরম ভক্ত।

রত্নদীপা আমার ফেস বুকের বন্ধু। ওর সঙ্গে আমার আলাপ ফেস বুকের মাধ্যমে। এখনো মুখো মুখি কিংবা ফোনালাপ হয় নি। লাইব্রেরীর লিঙ্ক আদান-প্রদানের মধ্যেই হৃদ্যতা। কয়েকদিন আগে তালসারি গেছিল কলকাতায় নাভিশ্বাস ওঠা চাপ থেকে মুক্তির সন্ধানে। সেখানে থেকে তুলে এনেছে বেশ কিছু ছবি। আমি দেখে লোভে পরে গেলাম। ওর অনুমতি চাইলাম লাইব্রেরীতে রাখার জন্য। রত্নদীপা অনুমতি দিল। তাই সবার সঙ্গে ছবিগুলো শেয়ার করলাম।

আমার সংগ্রহে থাকা রত্নদীপার সংক্ষিপ্ত পরিচয়।
Ratnadipa Banerjee
banerjee.ratnadipa@gmail.com
http://ratnadipa-kegoantarotarose.blogspot.com/


TALSARI...NIRJAN SAIKATE...by Ratnadipa Banerjee

talsari_nirjan saikate

talsari_nirjan saikate

talsari_nirjan saikate

talsari_nirjan saikate

house of vivekananda in calcutta
একসময় এখানেই বিবেকানন্দের শৈশব কেটেছে তখন তিনি বিবেকানন্দ নন সেই সময় তাঁর নাম ছিল বিলে।

house of vivekananda in calcutta
এই বাড়ি বিবেকানন্দরোডের ওপর।

house of vivekananda in calcutta

house of vivekananda in calcutta

house of vivekananda in calcutta
এই জনপথেই বিবেকানন্দ কতো শতোবার হেঁটে নিজের বাড়িতে গেছেন।

গোড়ায় গলদ
অমর্ত্য সেন


আপনার নতুন প্রবন্ধ সংকলন ‘দি আরগুমেন্টেটিভ ইণ্ডিয়ান’-এর একটা লেখায় বিশ্বভারতীতে সে আমলে কী ভাবে লেখাপড়া হত তার একটা উদাহরণ আছে। যে, হয়তো প্রাচীন সাহিত্যের ক্লাস হচ্ছে, শিক্ষক হয়তো পড়াতে পড়াতে স্বচ্ছন্দে আধুনিক সাহিত্যে চলে এলেন, অনেকগুলো বিষয় জড়িয়ে নিয়ে পড়াতেন তাঁরা। পড়ানোর এই যে শৈলী, এটা কি ইদানীং হারিয়ে যায়নি? অতিরিক্ত স্পেশালাইজেশন করতে গিয়ে, এমনকী স্কুলের পড়ানোতেও... এতে কি ছাত্রদের তর্কশীল হয়ে ওঠার পথে বাধা পড়ে না?

the_argumentative_indian

এ রকম সমালোচনা আমি করতে পারব বলে মনে করি না। কারণ প্রথম কথা, এখানে কী ঘটছে না ঘটছে আমি ঠিক জানি না। দ্বিতীয়ত, আমাদের যে ভাবে পড়ানো হত, সে জিনিসটাই ওই ভাবে পড়াতে গিয়ে একেবারে পড়াশোনা হবে না, তারও একটা সম্ভাবনা ছিল। এটা নির্ভর করে মাস্টারমশাইদের ক্ষমতার উপরে। সে দিক দিয়ে আমি খুব সৌভাগ্যবান ছিলাম যে আমাদের যাঁরা পড়িয়েছেন তাঁদের অনেকেরই যে যথেষ্ট জ্ঞান এবং উৎসাহ ছিল শুধু তা-ই নয়, এই নতুন ধারায় পড়ানোর একটা ক্ষমতাও ছিল। সেই কারণেই তাঁরা শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। এখন, সব শিক্ষকই ঠিক এ ভাবে করতে পারবেন, তা তো নয়। এবং এটা করতে গিয়ে পড়াশোনার ডিসিপ্লিনটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, সেই আশঙ্কা আছে। তাই আমি এটাকে, কী ঘটেছিল, সে বিষয়েই একটা বক্তব্য বলে মনে করছি; কী ঘটা উচিত, আমাদের স্কুলে যে অবস্থা আছে, শিক্ষকদের যে ভাবে ট্রেনিং দেওয়া হয়, সেটা মেনে নিয়ে এবং ছাত্ররা কী করতে চান না করতে চান তা মেনে নিয়ে, কী করা উচিত সে বিষয়ে কোনও মত দেওয়ার জন্যে আমি বিশ্বভারতীর সেই সময়কার কথা বলিনি।

অনেক সময় বলা হয় যে আজকাল শিক্ষায় প্রযুক্তির ওপর খুব বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে, সে পুরনো অর্থে শিল্প-প্রযুক্তিই হোক কি নতুন তথ্য-প্রযুক্তিই হোক। হিউম্যানিটিজ সেই তুলনায় অনেকটাই অবহেলিত। এটা সমস্যা তৈরি করছে। এর কি কোনও গুরুত্ব আছে?

৫২ ব্যঞ্জন
পবিত্র সরকার

বর্ণপরিচয় নামে একটি প্রাথমিক ভাষাশিক্ষার বই প্রকাশ করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। অবশ্যই ‘লিখিত’ ভাষাশিক্ষার; মুখের ভাষা প্রায়ই শেখানোর দরকার হয় না। আজ থেকে দেড়শো বছর আগে, ১২৬২ বাংলা সনের পয়লা বৈশাখ বেরিয়েছিল তার ‘প্রথম ভাগ’। এতে আছে যুক্তব্যঞ্জনহীন একুশটি পাঠ। বর্ণমালা দিয়ে শুরু, শেষ পাঠ এক থেকে দশ সংখ্যার অঙ্ক আর শব্দগত রূপ। তার আগের আগের পাঠে লম্বা টানা বাক্য এসেছে— ‘পাঠশালার ছুটি হইলে, বাড়ী গিয়া, গোপাল পড়িবার বইখানি আগে ভাল জায়গায় রাখিয়া দেয়; পরে, কাপড় ছাড়িয়া, হাত পা মুখ ধোয়।’ আগের পাঠে এ রকম একটি টানা বাক্য— ‘ছুটী হইলে, বাড়ীতে গিয়া, রাখাল পড়িবার বই কোথায় ফেলে, কিছুই ঠিকানা থাকে না।’

barnaparichay

‘দ্বিতীয় ভাগ’ বেরোল ঠিক দু’মাস পরে, ১ আষাঢ়, ইংরেজি সাল ১৮৫৫। এখন আমরা তাই দেড়শো বছর উদযাপন করছি, বর্ণপরিচয় প্রকাশের। দ্বিতীয় ভাগের শুরুতেই আছে যুক্তব্যঞ্জনের পাঠ, য-ফলা এসেছে প্রথম পাঠেই। বর্ণপরিচয়ের সজ্জা তখনকার সব বর্ণশিক্ষার বইয়ের মতোই বর্ণানুক্রমিক। প্রথম ভাগে আ-কার, ই-কার, ঈ-কার পর পর এসেছে; দ্বিতীয় ভাগে একই ভাবে সাজানো হয়েছে য-ফলা, র-ফলা, ল-ফলা।

বিদ্যাসাগর রচিত এই দু-ভাগের বর্ণপরিচয় বাঙালি শিশুদের বর্ণশিক্ষার জন্য লেখা বা প্রকাশিত প্রথম বই নয়। গবেষকদের তথ্য থেকে পাই, ঊনচল্লিশ বছর আগেই শ্রীরামপুর মিশন থেকে বেরোয় ‘লিপিধারা’ (১৮১৬); ১৮১৮-তে কলকাতার স্কুল বুক সোসাইটি প্রকাশ করে বর্ণমালা— রচয়িতা জেম্‌স স্টিউয়ার্ট। মাঝখানেও বেরিয়ে যায় বেশ কয়েকটি বর্ণপরিচয়ের বই। যার মধ্যে সব চেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিল ‘পাখি সব করে রব’-খ্যাত মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শিশুশিক্ষা। তার প্রথম ভাগ বেরোয় ১৮৪৯-এ, দ্বিতীয় ভাগ ১৮৫০-এ। বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়-এর অর্জন আলোচনা প্রসঙ্গে এ বইদুটি গুরুত্বপূর্ণ।

লিতেরাচুর
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য

পৃথিবীর প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থের জনক কোনও ফরাসি নন; সে-কৃতিত্ব জার্মানির মাইনৎস শহরের ইয়োহানেস গেন্সফ্লাইশ গুটেনবের্গের। পৃথিবীর বহু বিক্রিততম বইটিও কোনও ফরাসির লেখা নয়; সে-বই কস্মিন কাল থেকে কপিরাইটহীন কিং জেমসেজ ভার্সান-এর বাইবেল। কপিরাইটকৃত বইয়ের শীর্ষ বিক্রয়ের শিরোপা নিয়ে যাঁরা লড়ছেন— গিনেস বুক বা আগাথা ক্রিস্টি রচনাবলির প্রকাশন সংস্থা, ‘আ ব্রিফ হিষ্ট্রি অব টাইম’ নিয়ে স্টিফেন হকিং, কী হ্যারি পটার পুস্তকাদি নিয়ে জে কে রলিং— এই এঁদের মধ্যেও কোনও ফরাসি নেই। অথচ, নারী ও নগরী, সুরা ও সুগন্ধি, ছবি বা ছায়াছবির মতো বই কিংবা বইয়ের কথা উঠলেই এসে পড়ে ফ্রান্স এবং ফ্রান্স এবং ফ্রান্স। ছেপে বই আবিষ্কার করা হয়নি দেখে তা পড়ে পড়ে, পড়ে পড়ে পুনরাবিষ্কৃত করে বসেছে ফ্রান্স। বই মগজের বস্তু না হৃদয়ের, জগৎ ও বইয়ের বাস্তব কোথায় কতটুকু মেশে— এ সব নিয়েও যখন ভাবালু বিতর্ক জারি চার দিকে, তখন কিছু কিছু ফরাসির মনে হয়েছে বইয়ের ব্যাপারে শেষ কথা বলবে পাঠক, কারণ বইয়ের বস্তুর শেষ, পরিণত চেহারাটা তো তারই মাথায় ঘোরাফেরা করছে।

The_Gutenberg_Bible
The Gutenberg Bible

আজকের রোলঁ বার্থ বা জাক দেরিদার প্রস্তাবিত সৃষ্টিশীল বা বিধ্বংসী পাঠকের বহু আগেই বিশ্বকোষকার দনি দিদরো প্রকাশকের আমন্ত্রণে এফ্রাইম চেম্বার্সের ‘স্লাইকোপিডিয়া’-র (১৭২৭) পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করতে গিয়ে বিষয়টিকে এমন ভাবে পাকড়াও করলেন যে, বিশ্বকোষ ধারণাটারই একটা সামুদ্রিক পরিবর্তন ঘটল। বিশ বছরের প্রয়াসে, নানা মুনির সহযোগিতায় তাঁর নানা খণ্ডের এনস্লাইকোপিডিয়ার শেষ খণ্ডটি যখন প্রকাশ পেল ১৭৬৫-তে, সেটি তত দিনে থোড়াই রইল এক নিরীহ তথ্যভাণ্ডার। তত্ত্ব ও তথ্যের সন্নিবেশে, পূর্বজ্ঞানের নতুন ব্যাখ্যায় তা হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক যুদ্ধের এক দার্শনিক যন্ত্র— engine of war. আর এই সবটুকুই কেবল বিষয় ও তত্ত্বের পাঠভেদে, পাঠচরিত্রে। আর দিদরোর মৃত্যুর বছর নব্বই পর আর এক ফরাসি— কবি স্তেফান মালার্মে পাঠের আরও এক নীতি নির্ধারণ করে বসলেন তাঁর ‘অল দ্য সোল সাম্‌ড আপ...’ কবিতার শেষ পংক্তিতে। লিখলেন:

‘ল্য সঁস ত্রো প্রেসি রাতুরতা ভাগ লিতেরাচুর।’

ইংরেজি তর্জমায় দাঁড়িয়েছে ‘Too precise a meaning erases your mysterious literature’: খুব নিখুঁত অর্থ করলে রসের রহস্য মুছে যায়। সে-কারণেই কি অন্য এক কবিতা ‘সি ব্রিজ’-এ (সমুদ্রের হাওয়া) কবি লিখলেন?— ‘The flesh is sad, alas! and I have read all the books.To escape! To escape far away!’ কিন্তু পালাতে পারলেন কই? শেষে জগৎকে উপহার দিয়ে গেলেন বই বিষয়ে মানুষের শেষ কথা, ঋষির ওঁ মন্ত্রের মতো ‘তুতাবুতি দঁজাঁ লিভ্র্‌’: ‘Everything ends up in a book’. সবের শেষ একটি বইয়ে। যেখানে ফ্রান্সের জন্ম।

জীবন টুকরো জীবন

অ্যাম্বিশন ছিল, মুচি হবেন। বিদেশে ট্রাক-ড্রাইভারির পরীক্ষা দিয়েছেন।
পুষবেন বলে সাপ ধরে এনেছিলেন। স্লো সাইকেল রেসে চ্যাম্পিয়ন।
বাংলা কবিতার মহারথী। আলগোছে কিছু জীবন বললেন

উৎপলকুমার বসু

আমি জন্মেছি কলকাতায়, ভবানীপুরে। ছেলেবেলায় মা’কে হারাই, তার পর আমার এক নিঃসন্তান মাসি আমাকে নিয়ে যান দিনহাটা। কুচবিহারে। আমাকে মাসিই মানুষ করেন। দিনহাটা হাইস্কুলে ক্লাস থ্রি থেকে পড়েছি। ওই স্কুলে আমাদের এক জন মাস্টারমশাই ছিলেন কমল গুহ, আমাদের রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী। দিনহাটার আর এক জন বিখ্যাত ছেলে পেয়ারাদা, ভাল নাম এরশাদ, পরে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। ভারতবর্ষ তখন স্বাধীন হব হব। কুচবিহারের রাজা রাস্তা দিয়ে গেলে সামনে রাস্তায় ঝাঁট পড়ত। তার পর বিউগিল বাজাতে বাজাতে এক দল যেত, তার পর সেপাইসহ রাজা যেতেন, শেষে আমরা রাস্তা নোংরা করতে করতে।

utpal kumar basu

বাড়ির কাছেই স্কুল ছিল। হেঁটেই যাতায়াত করতাম। টিফিন খেতে বাড়িতে আসতাম। যেহেতু আমি শহর থেকে গেছি, তাই একটু নিঃসঙ্গ ছিলাম, বন্ধুবান্ধব বিশেষ ছিল না। কিন্তু আমার নিজের একটা ছোট চিড়িয়াখানা ছিল। সেখানে কুকুরছানা বেড়ালছানা থেকে আরম্ভ করে পাখি, পোকামাকড়, শিশির মধ্যে গিরগিটি ছিল। একটা পাহাড়ি ময়না ছিল। বাবু টাইপের। রোজ দুপুরে বলত— স্নান করব, স্নান করব। তখন তাকে স্নান করাতে হত। মাসি অসম্ভব রেগে গেল যখন আমি একটা সাপ ধরে আনলাম পোষার জন্য। বলল, আর না, ঢের হয়েছে।

তোমাকে লিখছি
প্রজাতন্ত্র দিবস পেরিয়ে সংবিধান নিয়ে একটি খোলা চিঠি 

পুড়ল আদিকন্দ দলুই
পুড়ছে আমার সংবিধান
পুড়তে পুড়তে হয়তো আগুন
লিখবে নিজেই একটা গান।

বন্ধু,

গান চেয়েছ। ওই চার লাইন দিয়ে শুরু করলাম। এই কথাগুলোই যে গোড়ায় থাকবে তার মানে নেই। লিখতে লিখতে হয়তো দেখব ওগুলো পরে কোথাও চলে যাচ্ছে। কোন খেয়ালে যে তুমি আমায় এমন এক বরাত দিলে তুমিই জানো। আমি কিন্তু জানি না, কোন আক্কেলে আমি রাজি হয়ে গেলাম। সংবিধানবিশারদ বা আইনজ্ঞ নই আমি। এ দেশের নাগরিক, পেশায় সংগীতকার এবং এক ধরনের সাংবাদিক, নিবন্ধকার। আমার পাসপোর্টে অবশ্য অামার নাম কবীর সুমনের তলায় নির্দিষ্ট একটি জায়গায় আমার পেশা ‘সংগীতকার’ই লেখা অাছে। এই দেখ, পাসপোর্ট। এক স্বাধীন, সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের নাগরিক হিসেবে আমার পরিচিতি দলিল, যার পাতায় পাতায় অন্যান্য দেশের ভিসার ছাপ পড়ে, যদি সেই ভিসা আমি আবেদন করে পেয়ে যাই।

independence day

যে দিন থেকে আমাদের দেশের সংবিধান কার্যকর হয়েছিল (আমার বয়স তখন দশ মাস, আর তুমি তখনও আসোনি) সেই দিনটি যথারীতি পালন করা হল। সারা পৃথিবীতেই তো প্রতি বছর নানান ‘দিবস’ উদযাপন করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও। এ বারে, প্রজাতন্ত্র দিবস, মানে যে দিন ভারত এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণ করেছিল স্বাধীনতা লাভের পর তার প্রথম সংবিধান, সেই দিনটির অল্প কাল আগে তুমি বায়না ধরলে— এত কিছু নিয়ে গান লিখেছ, আজ আমাদের সংবিধান নিয়ে একটা গান লেখো। তুমিও জানো, আমিও জানি সংবিধানের সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা-সমৃদ্ধ কোনও গান লিখতে তুমি আমায় বলোনি। এই সময়ে, এই বয়সে, এই অবস্থায় আমাদের সংবিধান আমায় কী বলছে, তার পটভূমিতে আমি কী দেখছি, কী বুঝছি, তা নিয়েই লিখতে বলেছ তুমি আমায়। পেশাদার গান লিখিয়ে-সুর করিয়ে এই আমি নিজের কথা জানিয়ে দেওয়ার জন্য যেমন গান লিখেছি, আজও লিখি, তেমনই অপরের বরাত অনুসারেও লিখেছি, সুর করেছি কম নয়। ওখানেই পেশাদিরিত্বের জায়গাটা। ছায়াছবির বিশেষ একটি দৃশ্যের জন্য, হয়তো নায়ক বা নায়িকার জন্য গান বাঁধার সময় নিজেকে রেখেছি সেই চরিত্রগুলির জায়গায়। পার্শ্বচরিত্রের বেলাতেও তাই। সিরিয়াল বা টেলিফিল্‌মের টাইটেল সং-এ ধরতে হয়েছে গল্পটার মেজাজ। আবার, ধরো, এক নামজাদা বিস্কুট কোম্পানির জন্যেও দু’লাইনের গান বাঁধতে হয়েছিল। রুশ সঙ্গীতকার চাইকভ্‌স্কি এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘এক জন মুচি যেমন প্রতি দিন নানান পায়ের মাপে জুতো বানান, আমি সেই ভাবে সংগীত রচনা করি।’ সত্যিকার পেশাদার লোক এমনই হয়। আমাদের দেশের অনেক সৌখিন, মেঘলোকবাসী, শুচিবায়ুগ্রস্ত ‘শিল্পী’ অবশ্য ভীষণ দুঃখ পান এমনধারা কথা শুনলে।

প্রথম বই
উজ্জ্বলকুমার দাস

৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ মে চিন দেশে বিশ্বের প্রথম বইটি প্রকাশিত হয়। জাপানের ধর্মপ্রাণা সম্রাজ্ঞী মোবতকু বুদ্ধদেবের প্রায় দশ লক্ষ বাণী-সহ ‘হীরকসূত্র’ নামে একটি গ্রন্থ প্রচারের পরিকল্পনা করেন।

তখনকার দিনে এ কালের মতো বিদ্যুৎচালিত কোনও ছাপার মেশিন আবিষ্কৃত হয়নি। তাই কাঠের ব্লক তৈরি করে হস্তচালিত মেশিনের সাহায্যেই ‘হীরকসূত্র’ বইটি ছাপা হয়েছিল। বইটি ছেপেছিলেন ওয়াং চি। পৃথিবীর মুদ্রণের ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে চিনের কাংসু শহর থেকে এই বইটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।

book

ভারতবর্ষের প্রাচীনতম বই পাওয়া গিয়েছিল কাশগড়ে। সেটি চতুর্থ শতকের কথা। লেখা হয়েছিল সিদ্ধমাতৃকা লিপিতে তেরেট পাতা বা তালপাতায়। লেখার জন্য কোথাও প্যাপিরাস, কোথাও পার্চমেন্ট বা ফলক ব্যবহৃত হয়েছিল।

বই তৈরির পদ্ধতিতে বিপ্লব আনেন জোহান গুটেনবার্গ। ১৪৫৬ সালে তিনি প্রথম মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন। তাঁর ছাপাখানায় প্রথম ছাপা হয় ‘বাইবেল’, যা ‘গুটেনবার্গের বাইবেল’ নামে পরিচিত। এই বইটি এক সময় হারিয়ে যায়। ১৭৬০ সালে আবার বইটি খুঁজে পাওয়া গেলে তার নামকরণ হয় ‘মার্জারিন বাইবেল’।

গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই মুদ্রণযন্ত্র সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ১৪৫৬ সালে ইতালিতে, ১৪৬৮ সালে সুইজারল্যাণ্ডে, ১৪৭০ সালে ফ্রান্সে, ১৪৭৩ সালে হল্যাণ্ডে, ১৪৭৪ সালে স্পেনে এবং ১৪৭৬ সালে ইংল্যাণ্ডে প্রথম বই ছাপা হয়। তাই এই দশককে বলা হয় বই ছাপার শৈশবকাল, আর এই সময়ে প্রকাশিত বইগুলিকে ইংরেজিতে বলা হয় CRADLE BOOK।

গঙ্গাসাগর: পুরাণে এবং ইতিহাসে
নির্মল কর

সাগরদ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে সুন্দরবনাঞ্চলের এই দ্বীপটিরই পৌরাণিক নাম শ্বেতদ্বীপ। এরই দক্ষিণাংশে গঙ্গা যেখানে সাগরের সঙ্গে মিলেছে, সেই স্থানটি গঙ্গাসাগর নামে খ্যাত। সামনে আদিগন্ত সমুদ্র, পেছনে শ্যামল বনানী আর বালুকাময় বেলাভূমির মাঝখানে মহর্ষি কপিলের মন্দির। হিন্দু-মানসে গঙ্গাসাগর একটি মহাতীর্থ হিসেবে গণ্য। সাগরতীরের সার কথা মকর-সংক্রান্তিতে সাগর সঙ্গমে পুণ্যস্নান। তাই যুগ যুগ ধরে সাধুসন্ত ও মোক্ষকামী মানুষের এত ভিড়।

mokor sankranti

এককালে সাগরদ্বীপ ছিল ১৭০ বর্গ মাইলের এক সমৃদ্ধ জনপদ। ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে সামুদ্রিক ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে সাগরদ্বীপের প্রায় দু’লক্ষ মানুষ সমুদ্রের টানে ভেসে যায়। সেই থেকে দ্বীপটি বহুকাল জনহীন এবং শ্রীহীন হয়ে পড়েছিল। সপ্তদশ শতাব্দে বিদেশি বণিক এবং ইংরেজরা সাগরদ্বীপকে পরিত্যক্ত অবস্থায় আবিষ্কার করেন। হবসন জবসন অভিধানে এই দ্বীপের উল্লেখ আছে। জেমস প্রাইস নামে এক ইংরেজের লেখায় দেখা যায়, সাগরদ্বীপের নাম গঙ্গাসাগর। ১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে হেজেস এখানে একটি হিন্দুমন্দির দেখতে পান। এখানকার রাজা নাকি বছরে দু’লাখ টাকা তীর্থকর আদায় করতেন। পরে লুইল্লিয়ার নামে আর এক সাহেব সাগরদ্বীপে দুই সাধুকে দেখেছিলেন। ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে আলেকজেণ্ডার হ্যামিলটনের বিবরণ থেকে জানা যায়, সাগরদ্বীপ হিন্দুদের কাছে খুবই পবিত্র তীর্থস্থান। প্রতি বছর শীতে বহু সাধু ও তীর্থযাত্রী এখানে স্নান করতেন এবং পুজো দিতেন।

যে বইয়ের বৃহৎ অংশই পোড়া
সুদীপ জোয়ারদার

প্রাচীন সাহিত্যে একটি বিখ্যাত গ্রন্থ—গুণাঢ্যের ‘বৃহৎ কথা’। প্রাকৃত ভাষায় লেখা এই গ্রন্থটিতে রয়েছে এক লক্ষ শ্লোক। শুনলেও অবাক লাগবে, আদতে গ্রন্থটি কিন্তু কবি লিখেছিলেন সাত লক্ষ শ্লোকে। ছ’লক্ষ শ্লোকের বিরাট অংশ কবি নিজেই পুড়িয়ে ফেলেছিলেন।

ঘটনাটির সূত্রপাত অন্য এক ঘটনায়। সংস্কৃত ভাষা শিক্ষায় ইচ্ছুক সাতবাহন রাজ সিমুক তাঁর রাজসভার দুই পণ্ডিত গুণাঢ্য ও শর্ববর্মাকে একদা শুধোলেন, কতদিনে তাঁরা তাঁকে সংস্কৃত শেখাতে পারবেন। গুণাঢ্য ভেবে বললেন, বারো বছর অধ্যয়ন না করলে সংস্কৃত সাহিত্যে বুৎপত্তি জন্মায় না, তবে তিনি এই কাজটি করতে পারবেন ছ’বছরে। শর্ববর্মা গুণাঢ্যের কথায় বাধা দিয়ে বললেন, মহারাজের মত লোকের পক্ষে ছ’বছর বিদ্যাভ্যাসে কষ্ট স্বীকার করা কঠিন, তিনি এই কাজটি ছ’মাসে করার ক্ষমতা রাখেন। শর্ববর্মার অদ্ভুত কথা শুনে গুণাঢ্য অবাক হয়ে গেলেন। ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, এই অসম্ভব শর্ববর্মা সম্ভব করতে পারলে তিনি সংস্কৃত ভাষাচর্চা করাই ছেড়ে দেবেন। শর্ববর্মার চোখে দম্ভের ঝিলিক। বললেন, এই কাজে ব্যর্থ হলে বারো বছর তিনি গুণাঢ্যের পাদুকা মাথায় বহন করবেন।

http://forum.banglalibrary.org/extensions/image_upload/images/1296038291.gif

শর্ববর্মা কিন্তু সফল হলেন। লিখলেন ‘কলাপ ব্যাকরণ’ নামের একটি উৎকৃষ্ট গ্রন্থ। গ্রন্থটি পড়ে সাতবাহন রাজ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই চলনসই সংস্কৃত শিখে গেলেন। এদিকে কথামতো, গুণাঢ্য সংস্কৃত ভাষাচর্চা ছেড়ে দিলেন। কিন্তু পণ্ডিত কবি বিদ্যাভ্যাস তো ছাড়তে পারলেন না। ছাড়লেনও না। সংস্কৃত থেকে চলে এলেন প্রাকৃত ভাষায়। অল্প সময়ের মধ্যে রচনা করলেন সাত লক্ষ শ্লোকে বিখ্যাত গ্রন্থ—‘বৃহৎ কথা’। রাজার কাছে গুণের কদর আগেই কমেছিল। ‘বৃহৎ কথা’ও সে কদর কিন্তু ফেরাতে পারল না। উপরন্তু রাজা ‘বৃহৎ কথা’র অনেক উপাখ্যানের দোষ-ত্রুটির উল্লেখ করলেন। গুণাঢ্যের মন একেবারে ভেঙে গেল। তিনি স্থির করলেন গ্রন্থটি পুড়িয়ে ফেলবেন। একদা রাজধানী প্রতিষ্ঠান নগরের অদূরে তিনি বসলেন এই দহন কর্মে। সে এক আশ্চর্য দৃশ্য। গুণাঢ্য ‘বৃহৎ কথা’র একটি করে পত্র পাঠ করেন আর নিক্ষেপ করেন প্রজ্বলিত আগুনে। এই গ্রন্থ দহনের খবর পৌঁছল সাতবাহন রাজের কাছে। ছুটে এলেন তিনি। কিন্তু এর মধ্যেই পোড়ান হয়ে গিয়েছে সাত লক্ষ শ্লোকের মধ্যে ছ লক্ষ শ্লোকের বিরাট অংশই। রাজার বাধায় বাঁচল এক লক্ষ শ্লোক।

‘বৃহৎ কথা’র বৃহৎ অংশ পুড়ে গেল তবু ‘বৃহৎ কথা’ নামেই কিন্তু বেঁচে রইল গ্রন্থটি। এখন অবশ্য প্রাকৃত ভাষায় লেখা ‘বৃহৎ কথা’ বইটি আর পাওয়া যায় না। সংস্কৃতে কেউ কেউ ‘বৃহৎ কথা’র সারাংশ লিখেছিলেন। ‘বৃহৎ কথা’ বেঁচে আছে সেগুলোর মধ্যেই।

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৯ মাঘ ১৪০৮ রবিবার ১০ ফেব্রুয়ারি ২০০২

বই শুধু Book নয়
কিশোরী শাস্ত্রী

কৃষ্ণের মতো অষ্টোত্তর শতনাম না হোক, নয় নয় করে বইয়ের কিন্তু ডজন খানেক নাম। এসেছে নানান দেশের নানান ভাষা থেকে। আমাদের কাছে ‘বই’ শব্দটি আপনতম। এর নাড়ী-নক্ষত্র ঘাঁটতে গেলে আরবি ভাষায় পৌঁছতে হয়। পণ্ডিতরা বলেন, ‘বই’ শব্দটির শেকড় আরবি ভাষার ‘ওয়হী’ শব্দে। ওয়হীর ছাঁটকাট ‘বহি’। আর তা থেকে বই। অর্থটি বেশ পবিত্র। ওয়হী মানে ঈশ্বর বা আল্লার বাণী বা দিব্যবাণী, বই হল তাই ‘দিব্যবাণীর বই’।

বইয়ের ভারতীয় নাম কম করে তিনটি। গ্রন্থ পুস্তক পুথি। গ্রন্থের গোড়ায় গ্রন্থন। কাগজের পাতাগুলি একত্র সাজিয়ে সুচ-সুতোয় গেঁথে ফেলার পোশাকি নাম গ্রন্থন। গ্রন্থি গ্রন্থনা শব্দগুলিও গ্রন্থ শব্দটিরই জাতভাই। সংযোজনা শব্দটির বিকল্প গ্রন্থনা শব্দটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বেশ পরিচিত। পুস্তক শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘পুস্ত্‌’ থেকে এসেছে বলে পণ্ডিতদের অভিমত। শব্দটির অর্থ ‘বন্ধ’। অর্থাৎ বন্ধন। পাতার সঙ্গে পাতার বন্ধনই তো বইকে সম্ভব করে। পুথি শব্দটির সৃষ্টি সংস্কৃত শব্দ ‘পুস্তিকা’ থেকে। পুস্তিকা থেকে পুথিয়া এবং তা থেকে পুথি বা পুঁথি। ভারতে ভূর্জপত্র থেকে পুথি তৈরি হয়েছে প্রথম। তবে সে-কথা এখন নয়।

এখন বরং দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়া যাক। যাওয়া যাক ইংরেজদের দেশে। বুক শব্দটি আবালবৃদ্ধবনিতা বোধহয় সকলের জানা। কিন্তু এ কথা ক’জনের জানা যে Book শব্দটি আধুনিক? পুরনো আমলে Book ছিল Boc । ইংরেজরা এখন সভ্য হয়ে ওঠেনি। সেই অ্যাংলো-স্যাকশন যুগে BEECH (বিচ) নামে এক গাছ ছিল। তার ছাল-বাকল ছিল মসৃণ। লেখালিখির পক্ষে সুবিধাজনক। ফলে বিচ-বাকলের বই। তো এই বিচগাছের থেকেই নাম এসে থাকবে বিচ। উচ্চারণের বিকৃতির সূত্রে Boc বা বোক্‌। পরে পরে Book (বূক্‌ বিকল্পে বুক)।

calcutta book fair

এই ইংরেজি শব্দটির কাছাকাছি আরও দুটি শব্দ পাওয়া যায়। জার্মান ভাষায় BUCH আর সুইডিস ভাষায় BOK. CH উচ্চারণে চ বা ক দুই-ই হতে পারে। অর্থাৎ BUCH পারে বুচ্‌ বা বুক্‌। তবে দেখা যায় যে তুলনামূলক ভাবে সুইডিশ শব্দ BOK ইংরেজি শব্দ BOOK-এর নিকটতম আত্মীয়। পুরনো ইংরেজি শব্দে যা ‘C’ , সুইডিশ শব্দে তা ‘K’ । তফাত এই যে ইংরেজি Book স্বরধ্বনি O আর এক-কটি আমদানি করেছে। Bok থেকে Book।

এ বার লাতিন ভাষা। এ-ভাষায় LIBER (লিবার) নামে একটি শব্দ আছে। শব্দটির অর্থ ‘বই’। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় এই LIVRE শব্দটি থেকেই LIBRARY (লাইব্রেরি) বা বইঘর, পুথিঘর, পুস্তকাগার, গ্রন্থশালা ইত্যাদি। আবার ফরাসি ভাষায় LIBER হলো LIVRE, আর স্প্যানিস ভাষায় LIBRO । আসলে শব্দ দুটি বইয়েরই সমার্থক।

তবে এ-কথা ঠিক যে LIBER, LIVRE এবং LIBRO শব্দগুলির উচ্চারণ BOOK শব্দের কাছাকাছি নয় আদৌ। যেমন নয় BOOKVA শব্দটি। এটি রুশ শব্দ। শব্দটির শরীরে BOOK শব্দের আদল ধরা পড়লেও অর্থে কিন্তু ফারাক আছে। BOOKVA মানে বই নয়— পত্র। ঠিক, রুশ শব্দটি কিছু বিদঘুটে। KNIGA। রুশ শব্দের মতন চিনা ভাষায় বইও বেখাপ্পা। বইয়ের চিনা শব্দ SHU (শু)।
পরিশেষে ইউরোপ ঘুরতে ঘুরতে গ্রিসে পাড়ি দেওয়া যাক, এ-মুল্লুকে BOOK-এর নাম BIBLION। না, শব্দটিতে LION লুকিয়ে নেই— বরং আছে প্যাপিরাস গাছের ছাল। তার মানে ‘বাকলবই’। গ্রিক ভাষার বিবলোজ শব্দটি বেশ শক্তপোক্ত। এর থেকেই তৈরি হয়েছে বাইবেল, বিবলিওগ্রাফি, বিবলিও ফাইল শব্দগুলি। গাছের ছালের মহিমা অনেক! লাতিন ভাষায় ফোলিয়েজ (FOLIAGE) নামে একটি শব্দ আছে। অর্থ, গাছের ছাল। এই ফোলিয়েজ থেকেই এসেছে ফোলিও (FOLIO) শব্দ। শব্দটির অর্থ হুবহু এক নয় অবশ্য। এর মানে ভাঁজ-করা পাতা। আর কে না জানে যে বই ভাঁজ করা পাতাই আদতে। অনেকগুলি পাতা যখন বই বানায় তখন তার নাম FOLIO VOLUME অর্থাৎ মোটা বই।

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ২২ মাঘ ১৪০৮ রবিবার ৩ ফেব্রুয়ারি ২০০২

লালাবাবু
প্রণবেশ চক্রবর্তী

শুধু একটি কথা। তা-ও কোনও মহাপুরুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়নি। উচ্চারিত হয়েছিল এক অতি সামান্য ধীবর কন্যার কণ্ঠে। আর তাতেই সেকালের পূর্ব ভারতে বিত্ত ও মর্যাদায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী লালাবাবুর জীবনে ঘটে গেল আমূল রূপান্তর।

ঠাকুরদা গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ ছিলেন বাংলার গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রবল প্রতাপাম্বিত দেওয়ান। তিনিই আদরের নাতিকে ‘লালা’ বলে ডাকতেন। নাম কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ। কিন্তু সেই কৃষ্ণচন্দ্র নাম ঢাকা পড়ে গেছে আদরের ‘লালা’ নামে। সকলের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন ‘লালাবাবু।’ মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি’র সিংহ পরিবারের গৌরব তিনি।

সেই ঐশ্বর্যবান মানুষটি একদিন সামান্য এক কথায় ঘর সংসার বিত্ত-বৈভব, স্ত্রী-পুত্র সব কিছু ছেড়ে দীন কাঙালের বেশে পথে নেমে গেলেন। কথায় বলে বাস্তব ঘটনা কখনও কখনও কল্পনার চাইতেও চমকপ্রদ হয়। হয় যে, সেটাতো লালাবাবুর জীবনেই প্রমাণিত।

ঊনিশ শতকের প্রথম পাদে লালাবাবু স্বীয় কর্মদক্ষতায় ওড়িশা প্রদেশের সর্বোচ্চ দেওয়ানের পদ লাভ করেন। সেই সময় পুরী জগন্নাথ মন্দিরের কর্তৃপক্ষ অবহেলা করে দীর্ঘদিন বার্ষিক কর সরকারের কাছে জমা দেননি। পরিস্থিতি এমনই হয়ে উঠল যে, কর না দেওয়ার অভিযোগে মন্দির নিলামে ওঠার জোগাড় হল। খবরটা গেল লালাবাবুর কানে। পরম ধর্মপ্রাণ লালাবাবু এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করলেন এবং তিনিই ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী হয়ে নিলাম বন্ধ করলেন। পুরীর রাজাকে বললেন, আর দেরি করবেন না, এবার তাড়াতাড়ি বকেয়া কর শোধ করে দিন। সুযোগ পেয়ে পুরীর রাজাও যথেষ্ট তৎপরতার সঙ্গে কর শোধ করে দিলেন।

যোগী শ্যামাচরণ
প্রণবেশ চক্রবর্তী

ব্রিটিশ আমলের সামরিক পূর্ত বিভাগে চাকরি করতেন শ্যামাচরণ লাহিড়ি। তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল রাণীক্ষেত। হঠাৎই একদিন তাঁকে রানীক্ষেত থেকে বদলি করা হল দানাপুরে। দানাপুরে এসে তিনি অফিসের কাজে যোগ দিলেন বটে, কিন্তু কাজে মন দিতে পারলেন না। দ্রোণগিরিতে থাকার সময় যোগ-সিদ্ধ গুরুর কৃপায় তিনি যে যোগসাধন শুরু করেছিলেন—সোই তখন তাঁর জীবনে একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। তাঁর সামনে আধ্যাত্মজীবনের শতদল যেন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে।

shyamacharan

তাঁর দানাপুর অফিসের উপরওয়ালা ছিলেন একজন ইংরেজ সাহেব। এই সাহেবও জানতেন, শ্যামাচরণ লাহিড়ি একজন প্রচ্ছন্ন সাধক, তিনি আদর করে উদাসীন-প্রকৃতির শ্যামাচরণকে ‘পাগলাবাবু’ বলেই ডাকতেন। আবার এই উপরওয়ালা সাহেবের জন্যই একদিন শ্যামাচরণের প্রচ্ছন্ন যোগবিভূতি গোপনীয়তার আবরণ ভেদ করে প্রকাশ্যে এসে পড়ে। সেই ঘটনাটাই এখন বলছি।

হঠাৎই একদিন লাহিড়ি মশাই অফিসে এসে দেখলেন, সদা হাস্যময় ইংরেজ সাহেবের মুখ ভার—কেমন যেন উদ্বেগের কালো ছায়া তাঁর মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে আছে। এরকম তো কখনও হয় না। কিন্তু সাহেবকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করারও কোনও সুযোগ নেই। তাই, এমন একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নজরে পড়লেও তিনি এ বিষয়ে প্রথমদিন চুপচাপই রয়ে গেলেন।

জননী সারদামণি
প্রণবেশ চক্রবর্তী

শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী জয়রামবাটি গ্রামের রামচন্দ্র মুখার্জির কন্যা সারদার সাধারণ মানবীরূপ থেকে অসাধারণ দেবী রূপ-এ উত্তরণ, সাধারণ এক গ্রাম্যরমণীর আবরণ ভেদ করে যথার্থই বিশ্বজননীতে রূপান্তর আধুনিক কালের ধর্ম আন্দোলনের ইতিহাসে এক মহান অলৌকিক ঘটনা হিসেবেই চিহ্নিত।

saradamoni

এই দেবী-মানবীই জন্মগ্রহণ করেছিলেন এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের ঘরে শ্যামাসুন্দরীর কোল আলো করে। মা শ্যামাসুন্দরী সারাক্ষণ কন্যা সারদাকে (আদর করে ডাকেন ‘সারু’) ঘরে রাখতে পারেন না, অভাবের সংসার। জমিতে তুলোর চাষ হয়, মাঠে যেতে হয় তুলো তুলতে। শিশুকন্যাকেও সঙ্গে নিযে যান। যখন তুলো তোলেন, শিশুকে শুইয়ে রাখেন খেতের মধ্যে। মা খেতে কাজ করেন, শিশু খেলে আপন মনে। শিশু সারদা একসময় ‘বালিকা’ হলেন। মা-কে সংসারের নিত্যকাজে সাহায্য করতে শিখলেন, তখনকার কথা পরে মা জয়রামবাটিতে ভক্তদের কাছে বলছেন, ‘ছেলেবেলায় দেখতুম, আমারই মত একটা মেয়ে সর্বদা আমার সঙ্গে সঙ্গে থেকে আমার সকল কাজে সহায়তা করত—আমার সঙ্গে আমোদ-আহ্লাদ করত। কিন্তু অন্য লোক এলেই আর তাকে দেখতে পেতুম না। দশ-এগারো বছর পর্যন্ত এরকম হয়েছিল।’ (শ্রীমা সারদাদেবী, পৃঃ ২৫)।

বালিকা সারদা যখন জলে নেমে দলঘাস কাটতেন, দেখতেন সঙ্গিনী মেয়েও তাঁর সঙ্গে ঘাস কাটছে। ঘাস কাটা হলে আঁটি বেঁধে যখন পাড়ে রেখে আসতেন, দেখতেন ঐ মেয়েটি এক আঁটি ঘাস ইতিমধ্যেই কেটে রেখে গিয়েছে।

গোরখনাথ
প্রণবেশ চক্রবর্তী

সতী-পীঠ নির্ণয়ের যে-সব বিবরণ বা তালিকা আমরা পাই, তার প্রথম নামটিই থাকে হিঙ্গুলা বা হিঙ্গুলাট। অনেকেই বলেন মরুতীর্থ হিংলাজ। এখানে পড়েছিল সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র। এখানকার মহাদেবী হলেন ত্রিগুণা দিগম্বরী কোট্টারীশা। কেউ কেউ বলেন, কোট্টরী বা কোট্টভী। আর এই সতী-পীঠে যে মহাদেব বা ভৈরব অবস্থান করছেন, তার নাম হল ভীম লোচন।

এই দুর্গম সতী-পীঠের সঙ্গে মহাযোগী গোরখনাথ এবং নাথযোগী সম্প্রদায়ের রয়েছে আত্মিক সম্পর্ক। তাই সূচনাতেই আমরা সেই সতী-পীঠ সম্পর্ক একটু জেনে নিতে পারি।

gorakhnath

অবিভক্ত ভারতের মানচিত্রে বেলুচিস্তানে কাৎ করে বসানো থাকত ইংরেজি অক্ষর ‘এম।’ সেই এম-এর (M) অধবোষ্ঠই হল মাকরান।

স্বাধীনতার আগে যে-টা ছিল ভারতে। এখন সেটা প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানে। পাহাড়শ্রেণীর মাথায় এখানে অবস্থান করছেন এক ভীষণা কালীমূর্তি। সেখানে আছে এক কালী মন্দিরও। স্থানীয় লোকেরা সেই মন্দিরের দেবীকে ডাকে মহামায়া বা নানী বলে। প্রশ্ন দেখা দেয়, এখনও কি সেই মাকালী সেভাবেই আছেন ?

নবীন সন্ন্যাসী-শিষ্য গোরখনাথকে নিয়ে গুরুদেব মৎস্যেন্দ্রনাথ কাশী, বৃন্দাবন, কেদার-বদ্রী ইত্যাদি তীর্থ দর্শন করার পর গেলেন রামেশ্বর, ত্র্যম্বক, পুষ্কর এবং দ্বারকা তীর্থ দর্শনে। কিন্তু এতসব তীর্থ দর্শন করার পরও রয়ে গেল অপূর্ণতা। কারণ, তখনও হিংলাজ অনেক দূর, অনেক দুর্গম।

সেখানে তো যেতেই হবে।

WELCOME READERS OF BANGLALIBRARY FORUM

We are happy to inform you that we launched a paid horoscope service in ENGLISH, BENGALI, HINDI, GUJARATI, KANNADA, MARATHI, TAMIL, TELEGU and all other major Indian Languages with just Rs. 50/-.

We'll send you the report in pdf format through e-mail.

You need to give your details :

Your Full Name, Date of Birth, Time of Birth, Place of Birth in Detail and Your e-mail id.

You need to send Demand Draft worth Rs. 50/- in favour of

A/c name :Bengali E Library
A/c No. : 017010200018692
IFS CODE : UTIB0000017

and mail the DD in the following address :

BENGALI E LIBRARY
JYOTI TOWER, P-313, NABAPALLY
SALT LAKE, SEC-IV, KOLKATA-700 105
PH: 033-2335-3176, 9831193298

paro airport

paro airport

paro airport

খ্রিস্টমাসের খোশখবর
গৌরী মিত্র

 
বাইবেলে লেখা নেই যিশুর জন্মদিন কবে। রোমান ক্যাথলিক চার্চের যাজকরা যিশুর জন্মদিন হিসেবে পঁচিশে ডিসেম্বরকে নির্দিষ্ট করেছিলেন। জন্মদিনপালন, উৎসব আয়োজন শুরু হয়েছিল চতুর্থ শতকের আগে নয়। রোমান জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসে ছিল ‘স্যাটারনালিয়া’ উৎসবের আয়োজন। স্যাটার্ন মানে কৃষির অধিদেবতার পুজো। উৎসব শুরু হত সতেরোই ডিসেম্বর, চলত সাত দিন। এর সঙ্গেই রোমানরা জুড়ে দিয়েছিল খ্রিস্টমাস— পঁচিশে ডিসেম্বরে।

খ্রিস্টধর্মীয়দের মধ্যে এই উৎসবের আয়োজন শুরু হয়ে যায় পয়লা ডিসেম্বর থেকেই এখন। পঁচিশে ডিসেম্বর— যিশুর জন্মদিনের বারো দিন পরে আসে ‘এপিথ্যানি’। যিশুর দীক্ষা নেওয়ার দিন। সদ্যোজাত যিশুর জন্য উপহার এনেছিলেন তিন জন মহাজ্ঞানী পুরুষ এই দিন। এই সব স্মরণের উৎসব হল টুয়েলফথ নাইট বা এপিফ্যানি। যিশুর জন্মস্থান জেরুজালেমের ‘চার্চ অব নেটিভিটি’তে খ্রিস্টমাস উৎসব পালিত হয় সাড়ম্বরেই। ক্যাথলিকদের উদযাপিত উৎসবে যিশুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহু আদি ধর্মনির্ভর কানুন। প্রোটেস্ট্যান্টরা যিশুকেই স্মরণে রেখে চার্চে বাতি জ্বালায়, প্রার্থনা করে, গান গায়। ফ্রান্স, ইটালি, গ্রিস, স্পেন, জার্মান, চিন, জাপান— সর্বত্র এখন খ্রিস্টমাসের উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে দেশীয় কিছু প্রথাও। মেক্সিকোয় এ উৎসব উপলক্ষে ‘লস পাসটোরেস’ অর্থাৎ ‘দ্য শেফার্ডস’ নামক নাট্যানুষ্ঠানটি অভিনব।

christmas tree

খ্রিস্টমাস উপলক্ষে কেক, পেসট্রি খাওয়া, উপহার বিনিময়, খ্রিস্টমাস কার্ড মানে শুভেচ্ছাপত্র প্রেরণ— এ সব শুরু হয়েছে উনিশ শতকে। ১৮৪৩ সালে এক ইংরেজ আর্টিস্ট জন ক্যালট হার্সলে প্রথম বানিয়েছিলেন খ্রিস্টমাস কার্ড। তাতে লেখা হয়েছিল— এ মেরি খ্রিস্টমাস অ্যাণ্ড এ হ্যাপি নিউ ইয়ার টু ইউ। খ্রিস্টমাস ট্রি, ‘সাইলেন্ট নাইট, হোলি নাইট’ ক্যারল— এ সব এসেছিল জার্মানদের সৌজন্যে।

খ্রিস্টধর্মী জার্মান যাজক উইনফ্রেড এক গভীর বনে দেখেছিলেন— এক ওক গাছে রজ্জুবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে এক বালক। বৃষ্টি, বজ্রের দেবতা থরের পায়ে বলি দেওয়ার জন্য বালককে বেঁধে রাখা হয়েছিল। উইনফ্রেড সে ওক গাছ সমূলে উৎপাটিত করলে সেখানে গজিয়ে উঠেছিল এক সুদৃশ্য ফার গাছ— দি ট্রি অব লাইফ। জার্মান ধর্মসংস্কারক মার্টিন লুথার জ্যোৎস্নারাতে অপরূপ সুন্দর হয়ে থাকতে দেখেছিলেন এক ডুমুর গাছকে। তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন— এটি হল খ্রিস্টমাস ট্রি, চিরসবুজ— সিম্বল অব লাইফ। উর্বরতার প্রতীক।

সান্টাক্লস ছাড়া খ্রিস্টমাস জমে? সান্টাক্লস কোনও কাল্পনিক চরিত্র নয়। চতুর্থ শতকে নিকোলাস নামে এক ব্যক্তি জন্মেছিলেন তুরস্কে। রোমান দেবতা ভায়ানার বেদিতে তিনি মাথা নোয়াননি বলে রোমান সম্রাট ভায়োক্লিসিয়ান তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরবর্তী রোমান সম্রাটের দয়ায় নিকোলাস মুক্ত হয়েছিলেন। তুরস্কের মাইরা শহরের একটি চার্চে বিশপ পদে থাকার সময়ে তিনি ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন অপরাধীদের খোঁজে। দুঃখী-দরিদ্রদের খোঁজে। অপরাধীদের তিনি দণ্ড দিতেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষেরা তাঁর কাছ থেকে পেত অর্থ, খাদ্য, বস্ত্র। সেন্ট নিকোলাস মারা গিয়েছিলেন ৬ ডিসেম্বর। অনেক দেশেই এই ৬ ডিসেম্বর নিকোলাসকে মনে রেখেই ছোটদের উপহার দেওয়ার রেওয়াজ আছে। সেন্ট নিকোলাস ইউরোপের বিভিন্ন জনজীবনে বিভিন্ন নাম পেয়েছেন: ক্রিস ক্রিঞ্‌টল, সিন্টার ক্লাস, কোথাও পেরে নোয়েল, পাপাই নোয়েল। রাশিয়ায় গ্রাণ্ড ফাদার ফ্রস্ট, ইটালিতে লা বাফানা। লা বাফানা এক যাদুকর যিনি ঝাঁটায় চড়ে ঘুরে বেড়ান আর ছোটদের উপহার দেন এপিফ্যানিতে। আসলে দেশের উপকথা, লোককথা অনুসারে চরিত্রটি পেয়েছে বিশেষত্ব। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্কে ‘সেইন্ট লুসিয়া’— আসোর রানিই উপহারদাতা। উত্তর গোলার্ধের মানুষেরা লুসিয়াকে শ্রদ্ধা করে, তাঁর কল্যাণে ছ’মাস রাতের জীবনে পথ হারায় না মানুষ। লাল টুকটুকে জামা গায়ে, মুখ ভর্তি লম্বা সাদা দাড়ি, পিঠে উপহারের থলি — সান্টাক্লস বলতে এখন সবাই একেই চেনে। এমন বিশ্বজনীন রূপ কী করে হল? ইউরোপের মানুষরা যখন আমেরিকায় গিয়েছিল তখন তাদের সঙ্গে এসেছিল খ্রিস্টমাস, আর সেই সঙ্গে সিন্টার ক্লাস নামক উপহারদাতাও।

১৮২৬ সালে নিউ ইয়র্কের এক পত্রিকায় ক্লিমেন্ট ক্লার্ক মুর লিখেছিলেন একটি কবিতা— এ ভিজিট ফ্রম সেইন্ট নিকোলাস। সেটি পড়ে বিশিষ্ট আর্টিস্ট টমাস নাস্ট এঁকেছিলেন নিকোলাসের মনকাড়া অনেক ছবি। সেই ছবির সিন্টার ক্লাস অর্থাৎ সান্টা ক্লসই অনবদ্য হয়ে রইল।

উত্তর গোলার্ধ, দক্ষিণ গোলার্ধ— দু জায়গায় খ্রিস্টমাসের আয়োজন দু রকমের। উত্তরে ডিসেম্বরে অনেক জায়গায় বরফে ঢেকে যায়। গাছপালায় তুষার! খ্রিস্টমাস মানেই ‘হোয়াইট খ্রিস্টমাস’। আর দক্ষিণের দেশগুলোয়? এ সময় গ্রীষ্মকাল। খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সবাই আতসবাজি পোড়ায়, রাতের তারা দেখে। সমুদ্রের ধারে নাচগান করে।

‘খ্রিস্টমাস বক্স’, না হলে উৎসব ব্যর্থ। যিশু দরিদ্রের দুঃখমোচন করতে চেয়েছিলেন। ইউরোপ, আমেরিকায় সব শহরে, পথের মোড়ে সাজানো থাকে বাক্স। বাক্সের গায়ে লেখা থাকে— ‘হেল্প পুয়োর’ অথবা ‘শেয়ার ইয়োর জয়েস উইথ আদারস’। বাক্সয় দরিদ্র বন্ধুর জন্য কিছু দিলে খ্রিস্টমাসের উৎসব পূর্ণাঙ্গ হয়। যিশুও খুশি হন।

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ পৌষ ১৪০৯ রবিবার ২২ ডিসেম্বর ২০০২

THE ARDDHODAYA AND THE MAHODAYA BY PANDIT S.M. NATESA SASTRI


THE Hindus regard the two occasions of Arddhodaya and Mahodaya as very sacred occasions for taking baths in holy rivers and in sacred spots on the seashore. The Arddhodaya is considered to be the more sacred of the two. It is the rising of the sun and the moon in conjunction at the beginning of which, the sun is in Capricorn—Makara—on a Sunday in the month of Poushya (January-February) and the moon in the 22nd asterism— Sravana and the seventh Yoga. These five events do not occur in conjunction oftener than once in sixty years. The most important circumstance in the Arddhodaya is the half-rising of the sun with which are connected the four events above mentioned. Owing to this half-rising of the sun this occasion is called tho Arddhodaya, which is a Sanskrit compound meaning the half-rising. Thus the Arddhodaya is a very rare opportunity for sacred baths and we have no recollection of its occurrence in the immediate past.

But the Mahodaya occurs oftener. It is considered a little less meritorious as compared with the Arddhodaya, but for all that it is also considered a very sacred opportunity for baths. The Mahodaya is the rising of the sun and the moon in conjunction on a Monday, the sun being in Capricorn, in the month of Poushya (January-February) and the moon in the asterism of Sravana when it is in conjunction with Vyatipata yoga. The last Mahodayas occurred on Monday, the 5th February, 1894, and on the 1st February, 1895. Both the Arddhodaya and the Mahodaya are deemed to be very sacred occasions for religious bathing, almsgiving, propitiating the spirits of the departed forefathers, and performing other religious duties. Wealthy Hindus generally go on pilgrimages to Benares and Rameswaram to bathe in the sacred waters in these places. The sacred water of Dhanushkoti near Rameswaram is considered to be most holy on this occasion as it is said to have been opened by llama with his bow. The Hindus of Madras generally proceed to Mahabalipuram—the Seven Pagodas—to bathe in the sea on this occasion.

MAHODAYAM AT MAHABALIPUR

The small village of Mahabalipuram assumes an unusually busy appearance at the Mahodayam, a special New Moon day occurring on a Monday in the month of Pushya. This special New Moon day occurs once in 30 years and as such is considered extremely sacred by the Hindus. Pilgrimages are undertaken to Benares and Rameswaram for baths in the holy Ganges or in the Dhanushkoti. Orthodox Hindus who have not the time and convenience for such undertakings, go to some sacred place situated on the sea: and Mahabalipuram on the Madras Coast is a specially sacred place for occasions like this. From the Sunday previous country carts begin to pour in from all directions notwithstanding the difficulties of the marshes on all the sides of this little village. More than a thousand carts could be seen in this place, and boats from the Adyar would be emptying pilgrim passengers here in several hundreds every hour. The petty traders of Madras make a good profit in selling fruits and other petty things. On the morning of the Monday, more than fifteen thousand heads are seen bathing in the sea. The whole shore would be one mass of Hindus and most fortunately there are generally no accidents of any kind. Mahabalipuram is known to the European world by the antiquarian remains in which this village is rich and which have been well described to the public by many eminent writers on antiquities. All the pilgrim sojourners visit these remains after the bath and the ideas they express of what they see are very amusing and give us an insight into their knowledge of their own history. "These are the caves where the Pandavas lived," say some. "No," denies another with all the authority of a historian and states that these caves were constructed by Kishis. A third greyhead, with anger in his face, states that Mahabali was a very powerful sovereign, that even gods from the heavens were visiting him every day, and it was to accommodate them that Mahabali built these caves. These and such like are the theories. But not one is to be seen expressing a wish to know anything historically about these relics. No one studies or attempts to study them, though several works exist already giving as much as inquiry has hitherto been able to ascertain of information on this subject. "Whether these caves accommodated the gods at the time of Mahabali or not, it cannot be denied that they now accommodate the pilgrim-sojourners of Mahabalipuram. Thousands and thousands of people find their home now in these Pallava caves. This village is very small and house accommodation is very scanty, the number of ruined houses and those now in occupation being not more than eighty. And where could the fifteen thousand pilgrims find their home for a day now but in these caves '? The whole place is full of people, the major portion being Vaishnavas, by which sect this place is held specially sacred. The bath and sightseeing of the relics are generally over by about 10 in the morning and the pilgrims return home for breakfast. Fortunately a good supply of provisions is kept ready by the merchants. But the supply of pure water is not sufficient, and this difficulty is not felt as the sojourners are all to return to their respective homes by the evening. Visitors from Madras generally go down to Mahabalipuram by the Canal and return by the land route via Tirukkalukkunram and Chingleput. There is no road between Mahabalipuram and Tirukkalukkunram. There is a rough path by the thick copse of shrub wood in which the whole plain round about Mahabalipuram abounds, and a walk through it by the setting sun repays all the pain and trouble of a day's sojourn at Mahabalipuram. The fine breeze, the rosy rays of the setting sun, the scenery of the blue flowers of the Kasan shrub, the fluttering peacock which happens to be peculiar to this copse, and the sweet scent of a thousand wild flowers cheer the exhausted pilgrim and when the sun sets, the heart of the pilgrim droops down with the approaching night. To add to his gloom the copse changes into marsh and broken country tracks with ruts and muddy pools—till Tirukkalukkunram is reached. Thence it is all a nice road to Chingleput, which is performed in two hours by a jutka.

ভূস্বর্গে মসিহা
গৌতম চক্রবর্তী

এই সেই শ্রীনগর! চার দিকে পাহাড়, মাঝে প্রশস্ত ডাল লেক। একটু দূরে বিশাল সব হাউসবোট, জলের বুকে ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে শিকারা। ডাল লেকের ধার ঘেঁষেই প্রশস্ত রাস্তা। এই রাস্তাই সোজা চলে গিয়েছে শালিমার বাগ, নিশাত বাগ... সুরম্য সব বাগিচায়। পাহাড়, হ্রদ, চিনার গাছ অনন্য ভূস্বর্গ। শুধু কয়েক হাত অন্তর কারবাইন নিয়ে সেনানী। হ্যাঁ, এত সুন্দর জায়গার জন্য দুটো দেশ কামড়াকামড়ি করতেই পারে।

এই শ্রীনগরের পেটের মধ্যেই আর একটা পুরনো শ্রীনগর। ঝিলম নদীর ওপরে বাদশা কাদাল ব্রিজের ঠিক আগে ডান দিকে একটা রাস্তা বেঁকে গিয়েছে। সেখানেই পুরনো মহল্লা ‘খানিয়ার’। ঘিঞ্জি এলাকা, পুরোটা জুড়ে দারিদ্রের ক্ষতচিহ্ন। শাহি হামাদান, জামা মসজিদ... শ্রীনগরের বিখ্যাত বহু স্থাপত্যই এই এলাকায়।

did jesus travel india_rozabal-shrine

‘রোজা বাল’ নামের মসজিদটাও এই এলাকাতেই। একেবারেই অখ্যাত, হতদরিদ্র এক সমাধি। পর্যটন দফতরের গাইডবইতে হাজার ঢুঁ মেরেও এর নাম পাওয়া যাবে না।

দুই বিখ্যাত সাধকের সমাধি এই মসজিদে। ছোটটা সৈয়দ নাসিরউদ্দিন নামে মধ্যযুগের এক সুফি সাধকের। আর বড়টা ইয়ুজ আসফের। কে এই ইয়ুজ আসফ, সেটা মসজিদে ঢোকার পথে খোদাই করাও আছে। বহু শতাব্দী আগে তিনি কাশ্মীরে এসেছিলেন।

রহস্য এই ইয়ুজ আসফকে নিয়েই। পীর বা সাধুসন্তদের সমাধি সাধারণত উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বিভাবে রাখা হয়। এটাই নিয়ম। কিন্তু কাশ্মীরের অখ্যাত এই দরগায় ইয়ুজ আসফের সমাধি একেবারেই উল্টো দিকে। পূর্ব-পশ্চিমে আড়াআড়ি ভাবে রাখা। জেরুজালেম, জেরিখো তথা ইজরায়েলের প্রাচীন ইহুদিদের যে ভাবে সমাহিত করা হত! ইয়ুজ আসফ তা হলে কয়েক হাজার বছর আগে কাশ্মীরে আসা এক ইহুদি ধর্মগুরু?

কিন্তু সমাধির ওপরে ওই দুটো পায়ের ছাপ? আর পাঁচটা দরগার মতো এখানেও গত কয়েকশো বছর ধরে ভক্ত পুণ্যার্থীরা সবাই মোমবাতি, প্রদীপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। কিন্তু কয়েক বছর আগে সেই পুরনো মোমের চিহ্ন ওঠাতে গিয়েই বিপত্তি।

সমাধির ওপর অস্পষ্ট দুটো পায়ের ছাপ। পুরাকালের সেই ধর্মগুরু ইয়ুজ আসফেরই হয়তো। কিন্তু আশ্চর্য, দুটো পায়েই বড় বড় ক্ষতচিহ্ন। ক্রসকাঠে কাউকে ঝুলিয়ে পেরেক গেঁথে দিলে যে রকম হবে, অবিকল সেই রকম!

did jesus travel india_rozabal-shrine

তা হলে?... না না, এ কখনও হতে পারে নাকি! বাজে কথা।

কিন্তু ঘোরটা কিছুতেই কাটছে না। ইরান, ইরাক বা পশ্চিম এশিয়ার অনেক জায়গাতেই উপকথা, ক্রসে বিদ্ধ হয়ে আসলে যিশু খ্রিস্টের মৃত্যু হয়নি। শত্রুর চোখে ধুলো দিয়ে তিনি মিশর, দামাস্কাস, পারস্য এ সব জায়গায় চলে আসেন। পারস্যের উপকথা ও ইতিহাসের প্রাচীন সংকলন ‘ফিরাং-ই-আসফিয়া’, ‘জামি-উত-তাওয়ারিক’ ইত্যাদি নানা গ্রন্থ এ সব কথাই জানাচ্ছে। এমনকী বলছে, এই এলাকায় তাঁর নাম ছিল ইয়ুজ আসফ।

তা, উপকথা, লোককথা এ সব গালগল্প কতটাই বা বিশ্বাস করা যায়? বাইবেলে ইঙ্গিত নেই, স্রেফ উপকথা! আর ও ভাবে ক্রসবিদ্ধ হওয়ার পর কারও পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নাকি?

বেশ তো, উপকথা ছাড়ুন! কিন্তু মুঘল সম্রাট আকবরের সভাসদ, ‘আইন- ই- আকবরী’র লেখক আবুল ফজলের ওই লাইনটা! ‘এই কি নাম ই তো ইয়ুজ ও ক্রিস্টো।’ মানে, ‘তিনি, যাঁর নাম ইয়ুজ বা খ্রিস্ট।’ প্রাচীন কাল থেকে মুখে মুখে চলে আসা ইয়ুজ আসফের ট্রাডিশনটাই কী স্বীকৃতি দিচ্ছেন না আবুল ফজল?

ট্রাডিশন মানে? আবুল ফজলেরও প্রায় দেড়শো বছর আগে ১৪১৩ সালে, কাশ্মীরের মুল্লা নাদিরি ‘তারিখ ই কাশ্মীর’ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাতে জানাচ্ছেন, রাজা গোপদত্তের আমলে পারস্যের এক স্থপতি শ্রীনগরের ‘সলোমনের মন্দির’ সংস্কার করেন। প্রসঙ্গত, ‘শঙ্করাচার্য মন্দির’ এই পাহাড়েই। প্রবাদ, খ্রিস্টের জন্মের আড়াই হাজার বছর আগে থেকে এই শিবলিঙ্গ এখানেই। আদি শঙ্করাচার্য এখানে এসেই মন্দির স্থাপনা করেন।

did jesus travel india_rozabal-shrine

তা, মুল্লা নাদিরি জানাচ্ছেন, পারস্যের সেই স্থপতি মন্দির সংস্কারের পর প্রাচীন পারসিক ভাষায় সেখানে খোদাই করে দিয়েছিলেন, ‘৫৪ সালে এই সংস্কার সাধিত হল। ইয়ুজ আসফ এই সময়েই কাশ্মীরে তাঁর ধর্মপ্রচারে ব্যাপ্ত। তিনি, ইয়ুজ আসফই যিশু। ইজরায়েলের সন্তানদের উদ্ধারকর্তা।’

উপকথা, প্রাচীন ইতিহাস কোনও কিছুতেই বিশ্বাস রাখতে পারছেন না? বেশ, তা হলে জেনে রাখুন, ‘কোরান’ পরিষ্কার জানাচ্ছে, ‘ওরা (ইহুদিরা) মিথ্যা রটিয়েছিল, ক্রসবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। না, ওরা তাঁকে মারতে পারেনি। মেরি আর তাঁর পুত্রকে আমরা শান্ত পাহাড়ের কোলে, এক ঝরনার ধারে রেখে দিয়েছিলাম।’ হজরত মহম্মদের সঙ্গে তাঁর কন্যা ফতিমার কথোপকথন চলছে। ফতিমা বললেন, ‘কেন, যিশু খ্রিস্ট! তিনি তো ১২০ বছর বেঁচেছিলেন।’

একশো না একশো কুড়ি বছর, সেটা প্রশ্ন নয়। আসল কথা একটাই। পৃথিবীর দিকে দিকে ছড়িয়ে থাকা এই সব উপকথা, লোককথা, ধর্মকথা মাঝে মাঝেই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছে যে ক্রসবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়নি। গোটাটাই সাজানো ঘটনা।

এমনকী, এই ভারতেই গুপ্তযুগে সঙ্কলিত ‘ভবিষ্যৎ মহাপুরাণ’? প্রায় এক গল্প। রাজা বিক্রমজিতের পৌত্র শালিবাহন বহিরাগত পার্থিয়ান শক, হুনদের দমন করেছিলেন। এক দিন ঘুরতে ঘুরতে বরফ-ঢাকা পাহাড়ের নীচে এক যোগীকে দেখেন। শ্বেতবস্ত্র পরিহিত, শুভ্রকেশ এক যোগী। ‘কে আপনি?’ প্রশ্ন করলেন রাজা।
‘আমি ইশাপুত্র। কুমারী মায়ের গর্ভজাত। আপনারা যাঁদের ম্লেচ্ছ বলেন, তাঁদের মধ্যে আমি সত্যধর্ম প্রচার করি।...’

did jesus travel india_rozabal-shrine

ক্রসকাঠে মৃত্যু

হোলগার কার্স্টেন-এর নাম হয়তো অনেকেই শোনেননি। এই জার্মান ভদ্রলোক ধর্মীয় ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত, গত কুড়ি বছর ধরে তিনি ‘জেসাস লিভ্‌ড ইন ইণ্ডিয়া’, ‘দ্য জেসাস কনস্পিরেসি’ ইত্যাদি একের পর এক বই লিখে রীতিমত আলোড়ন ফেলে দিয়েছেন। প্রতিটি বইয়ের প্রতিপাদ্য মোটামুটি এক।

ক্রসবিদ্ধ হওয়ার পরেও যিশু বেঁচেছিলেন, প্রায় গুপ্তচরের ভঙ্গিতে সকলের অগোচরে রোম সাম্রাজ্যের বাইরে পালিয়ে আসেন। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তাঁর বরাবরই ভাল যোগাযোগ ছিল। বস্তুত, হোলগারের ‘জেসাস লিভ্‌ড ইন ইণ্ডিয়া’ ইতিমধ্যেই ৩২টি ভাষায় অনূদিত। ইয়ুজ আসফ এবং রোজা বাল দরগার কথা সে বইয়ে রীতিমত জোরের সঙ্গে বলেছেন হোলগার।

তা, হোলগার কোনও উদ্ভট তত্ত্ব প্রচার করে নিজে নাম কেনার মতলবে নেই তো? বলা শক্ত। ভদ্রলোক নিজে খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্বের স্নাতক। উপরন্তু উপকথা-লোককথার পাশাপাশি ফেলেছেন আধুনিক ভাষাতত্ত্বের নানা আলো। রোমান ইতিহাসের খুঁটিনাটির সঙ্গে হাজির করেছেন বাইবেলের হরেক সুসমাচার। দাবি করেছেন, বাইবেলও আসলে বলতে চায়, ক্রসবিদ্ধ হয়ে যিশুর মৃত্যু হয়নি।

কী রকম? ক্রসবিদ্ধ অবস্থাতেই ‘পিতা, এদের ক্ষমা করো’ বলে প্রাণত্যাগ করলেন যিশু। দুপুর ১২টায় ক্রসে গাঁথা হয়েছিল তাঁকে, বিকেল ৩টেয় মৃত্যু। মৃত্যুর কথা শুনে রোমান শাসক পন্টিয়াস পাইলেটও বিস্মিত, ‘সে কী! এত তাড়াতাড়ি!’ ফরিসি ও ইহুদি পুরোহিতেরাও জানাল, হ্যাঁ, যিশু মারা গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর দু’পাশে যে দুই ডাকাতকে ঝোলানো হয়েছিল, তারা এখনও মরেনি। তাড়াতাড়ি মারতে ওদের পা ভেঙে দেওয়া হোক।

রোমান সেনাধ্যক্ষ তাই করল। অতঃপর যিশুর কাছে এসে দেখল, তিনি ইতিমধ্যেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। সে পাশ থেকে যিশুর বুকে একটু বর্শা দিয়ে আঘাত করল, হ্যাঁ। সত্যিই মৃত। অ্যারামাথিয়া অঞ্চলের শিষ্য জোসেফ মরদেহ নামিয়ে তাড়াতাড়ি নিজের পারিবারিক কবরখানায় তাঁকে সমাহিত করতে গেল। সঙ্গে আর এক শিষ্য নিকোডেমাস। মস্তকি (myrrh) আর অ্যালয়ভেরা... দুই ভেষজে তৈরি প্রায় একশো পাউণ্ড ওজনের এক তৈলাক্ত মিশ্রণ নিয়ে এসেছিল সে।

এই বাইবেলীয় বর্ণনার ওপর ভিত্তি করেই একের পর এক প্রশ্ন তুলেছেন হোলগার। তিন ঘন্টা ক্রসবিদ্ধ হয়ে কেউ মরে না। দুই দস্যুও মরেনি। এমনকী, পন্টিয়াস পাইলেটও বিস্মিত! তা, খ্রিস্টিয় ধর্মগুরুরা এ ব্যাপারে ক্রসবিদ্ধ হওয়ার আগের রাতের কথা তুলছেন। যে রাতে যিশুর শরীর চাবুকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল ইহুদি পুরোহিতেরা। মেল গিবসনের ‘দ্য প্যাশন অব দ্য ক্রাইস্ট’ ছবিটা যাঁরা দেখেছেন, তাঁরাই মনে করতে পারবেন সেই বীভৎস অত্যাচার! গির্জার বক্তব্য, আগের রাতে অত প্রহারেই দুর্বল ছিলেন যিশু। নিজের ক্রসটাও গোটা রাস্তা বয়ে নিয়ে যেতে পারেননি।

did jesus travel india_rozabal-shrine

হোলগার অবশ্য থামছেন না। তিনি প্রাচীন রোমান আইন ঘাঁটছেন, ক্রসবিদ্ধ করার আগের রাতে অপরাধীকে ৩৯ ঘা চাবুক মারার নিয়ম ছিল। যিশুর পাশের দুই দস্যুকেও চাবুক মারা হয়েছিল, তারা তো মরল না। বলতে বলতে তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, ওই রোমান সেনাধ্যক্ষ দু’জনের পা ভেঙে দিল। কিন্তু যিশুর কাছে এসে সে হঠাৎ দয়াপরবশ হয়ে গেল কেন? স্রেফ বর্শা দিয়ে আঘাত, এবং তাও পাশ থেকে! মনস্তত্ত্ব কী বলে? সে তো সামনাসামনিই আঘাত করবে। তা ছাড়া, মস্তকি আর অ্যালয়ভেরা মাখিয়ে মৃতদেহের সৎকার করতে হবে, এমন কোনও প্রথা সে আমলে ছিল না। বরং ইহুদি প্রথা ছিল, মৃতদেহ জলে ধুইয়ে কবরে রাখতে হবে। এখানে তা তো নয়ই, বরং ঠিক উল্টো। বলতে বলতেই তিনি জানিয়ে দেন, মিশর এবং গ্রিক সভ্যতার আমল থেকে এই ভেষজ মিশ্রণ একটি কাজেই ব্যবহৃত হয়েছে। ক্ষতস্থানের দ্রুত আরোগ্য!

ক্রসে পেরেকবিদ্ধ এক মানুষ। মাথায় কাঁটার মুকুট। তিন ঘন্টা ধরে, চড়া রোদে এ ভাবে থাকার পর তাঁর আরোগ্য সম্ভব? রোম সাম্রাজ্যের প্রথম যুগের ইহুদি ঐতিহাসিক ফ্লাভিয়াস জোসেফাসকে এ বার উদ্ধৃত করছেন হোলগার। ফ্লাভিয়াস জানাচ্ছেন, এক বার এক বিজয় অভিযান সেরে ফেরার পথে তিনি দেখেন, ক্রসে বেশ কিছু লোককে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সেই অসহায়দের তিন জন তাঁর পুরনো বন্ধু। সম্রাটের কাছে তিনি তখনই তাঁদের প্রাণভিক্ষা চাইলেন। রাজ-আজ্ঞায় তিন জনকে নামিয়ে শুশ্রূষা করা হল। দু’জন মারা গেলেন, কিন্তু এক জন বেঁচে রইলেন।

তা হলে? ক্রসবিদ্ধ হওয়া মানেই মৃত্যু, এমনটা নয়। আর শুধু যিশুর কাছে এসে হঠাৎ দয়াপরবশ হয়ে যাওয়া ওই সৈনিক? পুরনো দিনের ইতিহাস ঘেঁটে হোলগার জানাচ্ছেন, ওই সৈনিকের নাম লঙ্গিনাস। পরে কাপাডোকিয়া অঞ্চলের বিশপও হয়েছিলেন তিনি। ওই দয়া তা হলে আচমকা আসেনি? জোসেফাস আর নিকোডেমাস... যিশুর শেষ সঙ্গী এই দু’জন যে রীতিমত প্রভাবশালী ছিলেন, ইহুদিদের যে শক্তিশালী পুরোহিত সংগঠন যিশুকে ক্রসবিদ্ধ করা হোক বলে হইচই তুলেছিল, এঁরা দু’জন সেই সংগঠনের সদস্য ছিলেন, তা বাইবেলেই লেখা আছে। আরও লেখা আছে, দু’ জনেই গোপনে যিশুর শিষ্যত্ব স্বীকার করেছিলেন।

এই জায়গা থেকেই নতুন প্রশ্ন তুলেছেন হোলগার। তাঁর বক্তব্য, দু’ জনেই ক্রস থেকে সাত-তাড়াতাড়ি যিশুকে নামিয়ে তাঁকে বাঁচিয়ে দেওয়ার ফন্দি এঁটেছিলেন। সঙ্গে নিয়েছিলেন লঙ্গিনাসকেও। সে কারণেই ওই রোমান সেনানীর হঠাৎ এত দয়া!

কিন্তু বাইবেলের সেই চিরন্তন পুনরুত্থান? তিন দিন পরে মৃত্যু থেকে উঠে এলেন যিশু, দেখা দিলেন অনুগামীদের? এ বার বাইবেল থেকেই যিশুর শিষ্যা মেরি ম্যাগদালেনের উক্তি তুলে আনছেন হোলগার। ভোরবেলায় সেই কবরখানায় গিয়ে মেরি ম্যাগদালেন দেখলেন, মৃতদেহটা আর নেই। ছুটতে ছুটতে তিনি পিটার আর জনকে গিয়ে জানালেন, ‘ওরা প্রভুকে নিয়ে গিয়েছে। জানি না, কোথায়।’ হোলগারের বক্তব্য, কী আশ্চর্য! কবর চুরি হলে কেউ কি এ ভাবে কথা বলে? কবর-চোর কোথায় যিশুর শরীর রেখেছে, সন্ত পিটারেরা সেটাও জানবেন বলে আশা করছিলেন মেরি?

হোলগারের বক্তব্য, জোসেফাস আর নিকোডেমাসরা তার আগের দিন রাতেই মেরি ম্যাগদালেন আর পিটারকে জানিয়েছিলেন তাঁদের পরিকল্পনার কথা। সব ঠিকঠাক এগিয়েছে, এখন শুধু জেরুজালেমের বাইরে ওঁকে নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা। মেরি ম্যাগদালেন সে সব জেনেই ভোরবেলা কবরখানায় পৌঁছেছিলেন, আর সে কারণেই ওই বিস্মিত উক্তি।

তা হলে? মৃত্যু থেকে খ্রিস্টের পুনরুত্থান বা ‘রেজারেকশন’? এ বার ভাষাতত্ত্বের শরণ নিয়েছেন হোলগার। প্রাচীন আরামিক ভাষায় (ওই ভাষাতেই কথা বলতেন যিশু) ‘চিজা’ নামে একটা শব্দ আছে। ওই শব্দের অনুবাদে হাজার হাজার বছর ধরে ‘পুনরুত্থান’-এর কথা বলা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ‘চিজা’-র মানে একেবারেই অন্য। রোগ থেকে সেরে ওঠা।

ইহুদি কাশ্মীর

তা হলে? ঠিক কী বলতে চাইছেন হোলগার কার্স্টেন?

হ্যাঁ, যিশুখ্রিস্টের জীবনে অজ্ঞাত দুটি পর্ব অবশ্যই আছে। প্রথমটি, তাঁর তিন বছর বয়সে। রাজা হেরদ-এর অত্যাচার থেকে বাঁচতে তিন বছরের শিশুকে নিয়ে জোসেফ আর মেরি পাড়ি দিয়েছিলেন মিশরে।

কী হল সেখানে? কেউ জানে না। তবে, এর পরই বারো বছরের যিশুকে দেখা গেল, জেরুজালেমের মন্দিরে। সেখানকার পুরোহিতেরাও তাঁর শাস্ত্রজ্ঞানে মুগ্ধ। এবং তার পরই আমরা দেখলাম তিরিশ বছরের যিশুকে। মাঝে কী হল, কেউ জানে না।

did jesus travel india_rozabal-shrine

আর এখান থেকেই নানা ব্যাখ্যার উদ্ভব। ওই সময়টায় যিশু ভারতে এসেছিলেন, বারাণসী, উজ্জয়িনী এবং বহু জায়গায় শাস্ত্রশিক্ষা করেছিলেন এ রকম একটা কথা মাঝে মাঝেই শোনা যায়। কিন্তু তা কত দূর সত্যি, কেউ জানে না। উনিশ শতকের শেষাশেষি নিকোলাস নোটোভিচ নামে এক রুশ পর্যটককে লাদাখের হেমিস গোম্ফায় প্রাচীন এক তিব্বতি পুঁথি দেখানো হয়েছিল। সেখানে ছিল, ইজরায়েলে জন্মানো ইশা ছোটবেলায় বণিকদের সঙ্গে সিন্ধুদেশে আসেন। সেখানে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ও বেদ-বেদান্ত অধ্যয়ন করেন। জাতপাত ও প্রচলিত ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি এমন ভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন যে, ব্রাহ্মণেরা তাঁকে হত্যার চক্রান্ত করেন। যিশু পারস্য হয়ে স্বদেশে পালিয়ে যান। নিকোলাস সে কথা লিখতেই সারা ইউরোপ জুড়ে তোলপাড়। জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্সমুলারও রেগে কাঁই হয়ে লিখলেন, এমন হতেই পারে না। নোটোভিচ আসলে প্রতারক।

কিন্তু ফিসফিস থামল না। স্বামী বিবেকানন্দের সতীর্থ, রামকৃষ্ণ-শিষ্য স্বামী অভেদানন্দও তাঁর তিব্বত-সফরের কথা লিখতে গিয়ে জানালেন, হেমিস গোম্ফার প্রধান তাঁকেও সেই প্রাচীন পুঁথি দেখিয়েছেন। অনেকে আবার শিবভক্ত নাথ সাধুদের কথা বললেন। গোরখনাথ, পার্শ্বনাথ ইত্যাদি সাধকের নাথ সম্প্রদায়। তাঁদের মধ্যে প্রচলিত কাহিনি, সন্ত ইশানাথ ১৪ বছরে ভারতে এসেছিলেন। তার পর দেশে ফিরে এক চক্রান্তে পড়েন। তাঁকে ক্রসবিদ্ধ করা হয়। যোগবলে বেঁচে যান তিনি, অবশেষে গুরু চেতননাথের সাহায্যে ফের ভারতে আসেন। হিমালয়ের কোলে আশ্রম স্থাপন করেন। পরিণত বয়সে সেখানেই তাঁর মৃত্যু।

এই ফিসফিসটাকেই এ বার ঐতিহাসিক তথ্যের কাঠামো দিচ্ছেন হোলগার কার্স্টেন। বলছেন, তিন বছরের যিশুকে নিয়ে জোসেফ আর মেরি যখন মিশরে আসেন, সেখানে এক লক্ষ ইহুদির বাস। এবং কয়েকশো বৌদ্ধ বিহার। আরও জানাচ্ছেন, যিশু ‘এসেন’ ধর্মগোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন। বৌদ্ধদের প্রভাবে ওই সন্ন্যাসীরা বিয়ে করতেন না, ইহুদি মন্দিরে বলি এবং রক্তপাতের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। এবং সেখানেই শেষ নয়। চুরি না করা, মিথ্যে না বলা, ব্যভিচার না করা...বৌদ্ধদের যে রকম ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’, এসেন গোষ্ঠীও সে রকম আটটি পথের কথা বলত।

প্রসঙ্গত, যিশুর দীক্ষাগুরু সন্ত জন-ও ‘এসেন’। জর্ডন নদীর জল ছিটিয়ে তিনি যীশুকে দীক্ষা দিয়েছিলেন। তা, হোলগার বলছেন, এ রকম কোনও ইহুদি প্রথা ছিল না। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বরং নতুন শ্রমণদের ওই ভাবে দীক্ষা দিতেন। আর, এই দীক্ষাপর্বের সময় মঠে একটি দীপ জ্বলত। গ্রিক ও রোমান ভাষার প্রাচীন খ্রিস্টিয় সাহিত্যে কিন্তু খ্রিস্টানদের আর একটি নাম ‘আলোকপ্রাপ্ত’।

এবং কাশ্মীর! হোলগার বারংবার একটা জায়গাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। কাশ্মীর। ওল্ড টেস্টামেন্টে রয়েছে, ইহুদিদের আদিপুরুষ আব্রাহাম হারান শহরে থাকতেন। এত দিন ধারণা ছিল, হারান মেসোপটেমিয়া-য়। হোলগার জানাচ্ছেন, না। শ্রীনগরের অনতিদূরে ‘হারওয়ান’ই সেই হারান। ওল্ড টেস্টামেন্টে আছে, ‘বেথ পিওর’ অঞ্চলের সামনে রাখা উপত্যকা বেয়ে মোজেস তাঁর উদ্দিষ্ট ঈশ্বরের দেশে পৌঁছে যান। হোলগার দেখাচ্ছেন, কাশ্মীরের ঝিলম নদীকে প্রাচীন ফারসি ভাষায় বলা হত বেহাত। এবং ঝিলম উপত্যকা যেখানে উলার হ্রদের সঙ্গে মিশেছে, তারই নাম ‘বেহাত পিওর।’

গত দু’ দশক ধরে বিচিত্র সব প্রমাণ উদ্ধার করেই চলেছেন হোলগার। কাশ্মীরের শিকারাগুলির বৈঠা পানপাতা বা ‘হৃদয়’চিহ্নের মতো দেখতে। শিশুর জন্মের পর মেয়েরা চল্লিশ দিনের আঁতুড় পালন করে। হোলগার বলছেন, এগুলি সবই প্রাচীন ইহুদি প্রথা। সবচেয়ে বড় কথা, ইহুদিদের মতোই প্রাচীন কাশ্মীরী কবরগুলি পূর্ব-পশ্চিমে। পরে ইসলামে ধর্মান্তরিত হলেও কাশ্মীরীরা আসলে নাকি ইহুদি সভ্যতারই উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন।

did jesus travel india_rozabal-shrine

এবং স্বয়ং যিশুখ্রিস্ট শিষ্যদের গোপন চেষ্টায় মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে মিশর, পারস্য হয়ে শেষ অবধি চলে এসেছিলেন এই কাশ্মীরেই। ক্রসবিদ্ধ হওয়ার ১৬ বছর পরে। মনটা বড় খারাপ করে দিয়েছেন হোলগার। তাঁর লেখা পড়ে এ বারে বড়দিন কেমন যেন পানসে। দু’ হাজার বছর পরেও বোঝা গেল না সেই ঈশ্বরপুত্রকে!

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা ১১ পৌষ ১৪১১ রবিবার ২৬ ডিসেম্বর ২০০৪

আসকে পিঠে, বাসকে পিঠে
অভিজিৎ সেন

শিক্ষিত এবং কৃষ্টিমনস্ক শহুরে বাঙালির কাছে পৌষ উৎসব এখন শান্তিনিকেতনের পৌষমেলাকে কেন্দ্র করেই। এ উৎসব মহর্ষির দীক্ষা-দিবসের ধর্মীয় অনুষঙ্গে আবর্তিত হলেও কালক্রমে গ্রামীণ এবং নাগরিক সংস্কৃতির যথার্থই এক ধরনের মিলনমেলা হয়ে উঠেছে।

কিন্তু, পৌষের উৎসবের আর একটি রূপ আছে। একেবারেই ধর্মীয় নয়, এমন একটি অঘোষিত উৎসব পৌষের সারাটা মাস জুড়ে চলে, শেষ হয় সংক্রান্তির নাচগান পিঠেপায়েসে, যার-যেমন-জোটে’র আড়ম্বরে। সারা মাস জোড়া এই উৎসবের কিছুটা আভাস যেন পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে’ গানটিতে। পৌষে কাজও উৎসব। সারা মাঠ জোড়া ফসল, কৃষিভিত্তিক মানুষের এক মুহূর্তও বিরাম নেই। সারা দিন ধরে ফসল কেটে ঘরে আনা, মরাই বেঁধে তার সংরক্ষণ, একই সঙ্গে ঝাড়ামারা করে কিছু শস্য গোলাজাত করা। রাত জেগে মেয়েদের কোঠাভাণা চলে তার পাশাপাশি। সবাই খুশি, মাঠের বাঁশি শুনে আকাশও খুশি হয়। সত্যিই তো এমন দিনে ঘরেতে কে থাকে? মাঠে ধান কাটা দেখে জীবনে বহু বারই আমার মনে হয়েছে ধান কাটা আসলে কাজ নয়, উৎসবই।

gokul pithe
গোকুল পিঠে

খুব কম বাঙালিরই শহুরে অনুক্রম এক পুরুষের বেশি। ফলে, পৌষপার্বণ এবং মেলার স্মৃতি বহু মানুষের ভিতরে এখনও বেশ জাগ্রত। আমার নিজের ধূসর শৈশবের রিমোট কন্ট্রোল টিপলে এমন দু’একটি উজ্জ্বল আলোর বিন্দু এখনও দেখি। অনেকের মতো কখনও কখনও স্মৃতি-তাড়িতও হয়ে পড়ি। পুব বাংলার আমাদের গ্রামটির ভিতর দিয়ে একটি খাল এঁকেবেঁকে বড় খালে গিয়ে পড়েছে। খুব ছোট খাল, কিন্তু জোয়ার-ভাঁটা হত। আমাদের আট-নয় বছরের শৈশবে গ্রামের বিচ্ছিন্ন ঘরবাড়ি, ঝোপঝাড়, বাগান কিংবা খালপাড়ের ঈষৎ গভীর আগাছার জঙ্গলের ভিতরের ঘাটা-আঘাটায় চলাফেরার স্মৃতি আছে। আমাদের বাড়ির দক্ষিণের দিকে ভুঁইমালিদের বাড়ি খাল-সংলগ্ন। ভুঁইমালিদের বাড়ির পুব দিকে বামুনবাড়ি। বামুনবাড়ি ছাড়িয়ে কুমোর এবং নাপিতদের পাড়া। দুপুর পার হওয়া রোদে আমি আনমনেই ভুঁইমালিবাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে খালপাড়ের শুঁড়িপথ ধরে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ রাস্তা শেষ হল খালের প্রতিবন্ধকতায়। তখন জোয়ারের সময়। দাঁড়িয়ে এ দিক ও দিক তাকাতে আমার হৃৎপিণ্ড আচমকা লাফ দিয়ে উঠল। আমার বাঁ দিকে ঝোপঝাড়ের মধ্যে শুয়ে আছে বিশাল আকৃতির একটা কুমির!

gokul pithe
গোকুল পিঠে

কয়েক পা দৌড়ে পিছন ফিরে তাকালাম। না, কুমির তাড়া করে আসেনি। আসার কথাও নয়। খালের মাটি তুলে তৈরি কুমিরটার আয়ুষ্কাল মাত্র দুদিনের। আমি ফিরে এসে কুমিরের পাশে দাঁড়ালাম। বড় বড় দুটো শামুক দিয়ে বানানো হয়েছে তার চোখ। বড়-ছোট ঝিনুক দিয়ে সাজানো তার পিঠের বর্ম। বাঁকানো লেজটা নেমে গেছে প্রায় জল পর্যন্ত।

এর সঙ্গে বোধহয় গত কয়েক সন্ধ্যায় শোনা ‘বারো বাঘের’ ছড়া গেয়ে মাগনের সম্পর্ক ছিল। পুব বাংলার নিম্নবর্গী যুবকেরা পৌষের সারা মাস জুড়ে এই বারো বাঘের ছড়া গেয়ে মাগন অর্থাৎ চাল এবং পয়সা তুলত। কুমির বানিয়ে তাকে পুজো করা এবং বলি দিয়ে বাস্তু পুজোর পর্ব শেষ করা খাল-বিল-নদী সংলগ্ন মানুষের, অবশ্যই নিম্নবর্গীদের পৌষের একটি বিশেষ পার্বণ। এই ‘বারো বাঘ’ ছড়া ও গানের মাধ্যমে ক্রমশ স্থানীয় পছন্দ ও অপছন্দের বাবুদের প্রতিরূপ হয়ে উঠত এবং স্তুতি ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের লক্ষ্য হত।

কুমির দেখে দৌড়ে বাড়িতে ফিরে এলাম আমি। দেখলাম চিতৈ পিঠের খোলা নামতে শুরু করেছে এবং পাতলা খেজুর গুড়ে ডুবিয়ে ভাইবোনেরা, দাদারা-দিদিরা খেতে শুরু করেছে। আমি কুমিরের কথা ভুলে গেলাম। এত দিন পরে রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপে দুয়ে-দুয়ে চার মেলালাম। বুঝলাম খালপাড়ের ওই কুমির, বারো বাঘের গান পৌষপরবেরই অঙ্গ।

vaja_puli_pitha
ভাজা পুলির পিঠে

পুব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ, যে দিকেই হোক না কেন, বাংলায় পিঠের তেমন রকমফের নেই। সর্বত্রই পিঠে মানে চালের গুঁড়ো, গুড়, দুধ, চিনি, নারকেল। মাটির ছাঁচ কুমোরবাড়ি থেকে আনা হোক বা বাড়িতে নিজেদের বানিয়ে নেওয়া হোক, চালের গুঁড়োর গোলা পড়লে যে পিঠে উঠবে, তার নাম পুবে চিতৈ, পশ্চিমে আস্‌কে। কড়াইতে গোলা ঢেলে ঘুরিয়ে পাটি করে ভাঁজ দিলে সর্বত্রই তার নাম পাটিসাপটা। গুড়-নারকেলের পুর দিলে সাদামাটা, ক্ষীরের পুর দিলে বনেদি। এ ছাড়া আছে পুলি, সর্বত্র তার একই নাম, তৈরি হয় ক্ষীর এবং মুগডাল দিয়ে। ইতস্তত, উত্তরে দক্ষিণে গোকুল পিঠে, সরুচাকলি, চুষির পায়েস এই সব। প্রাগুক্ত দ্রব্যসমূহের সঙ্গে যুক্ত হবে ময়দা, সুজি, আর ময়াম দেওয়ার জন্য ঘি।

উত্তর বাংলার গ্রামাঞ্চলে পৌষ পার্বণ সর্ব সাধারণের মুখে ‘পুষনা’। আগের দিন থেকে ঢেঁকিতে চাল কোটা তো আছেই, গাছপালা, পশুপাখিকে নিমন্ত্রণ করার বিধিও আছে একটা। নতুন খড় এক গোছা হাতে নিয়ে বাড়ির ছেলেমেয়েরা আম, জাম, কাঁঠাল ইত্যাদি গাছের কাছে যাবে, খড় বেঁধে দেবে কাণ্ডে। তার পর বলবে:

আজ পুষনা, কাল পুষনা
হামার বাড়িত্‌ যাইও,
পিঠাপুলি খাইও,
গঙ্গাসিনান যাইও।

উত্তরের গ্রামগুলিতে নদী তেমন অপ্রতুল নয়। দশ-বিশটা গ্রাম নিয়ে ছোট মেলা হয় এক দিন দু’দিনের জন্য। সে যেন শুধু মেলামেশারই মেলা। আনাই, পুনর্ভবা, টাঙ্গন, নাগর, কুলিক, মহানন্দা, কালিন্দীর ঘাটে ঘাটে এমন অজস্র ‘গঙ্গাস্নান’ হয় মকর সংক্রান্তির দিন সকালে।

উত্তর বাংলার আদিবাসীদের গ্রামগুলোতে পুষনা যেন মহামারী। এক গ্রাম শেষ করে পরের গ্রামে লাগে। আর, এক বার শুরু হলে দশ দিন, বারো দিন চলে। পুষনার আসল লক্ষ্য অবিরাম নেশা খাওয়া অর্থাৎ হাড়িয়া পান। এ সময় গ্রামে ঢুকে দেখেছি আর কোনও কাজই যেন নেই মানুষের।

আরও উত্তরে তিস্তা, তোর্সা, মনসা, রায়ডাকের ঘাটা-আঘাটা পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্রের ঘাটে ঘাটে শুরু হয় আর এক উৎসব, যার নাম মাঘবিহু। পৌষপার্বণের অন্তিমে নতুন শরীর ও মন নিয়ে যুবকযুবতীরা মেতে ওঠে নাচ আর গানে, যার প্রতিটি মুদ্রায় শস্য, সন্তান ও সম্পদ কামনার ইঙ্গিত।

আগেই বলেছি, শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা তার প্রারব্ধকদের হিসেবের বাইরে গিয়ে ক্রমশ আড়ে-বহরে বেড়ে উঠতে লাগল। সাতই পৌষ যে মেলা বোলপুরে শুরু হয়, তা এখন গ্রেট কার্নিভাল। নাচ, গান, নেশা, হুল্লোড়, মেলামেশা। কলকাতার নানা দিকের লব্ধপ্রতিষ্ঠদের কাছে এ মেলার আকর্ষণ ক্রমশই বাড়ছে।

শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা শেষ হতেই শুরু হয় কেঁদুলির জয়দেবের মেলা। এই প্রাচীন মেলাটি যথার্থই লোকউৎসব এবং মহামিলনের প্রাঙ্গণ। ভক্ত, প্রেমিক, রসিক, মিস্টিক, শিল্পী— গ্রামীণ ও নাগরিক সব রকমের মানুষের সমাগম হয় জয়দেবের মেলায়।

siddho_puli
সিদ্ধ পুলি

রাঢ়ের পৌষপরবের মধ্যে পৌষবুড়িকে আটকানোর একটা অনুষ্ঠান আছে। ছোট মেয়েরা গান গেয়ে, ছড়া কেটে পৌষবুড়িকে আগলায়। পৌষ যেন লক্ষ্মী, তাকে আগলে রাখতেই হবে। গোবর এবং মাটি দিয়ে তৈরি করা ছোট ছোট মূর্তি বাড়ির বিভিন্ন অংশে আটকে তেল-সিঁদুর লেপে তার উপরে তুলসীমঞ্জরী, দূর্বাঘাস এবং ধান— এই সব মঙ্গলজ্ঞাপক উপচার ছড়িয়ে দেওয়া হয়। খড় দিয়ে তৈরি হয় ছোট ছোট পাঁচটি ‘চাউড়ি-বাউড়ি’— পৌষকে আগলানোর জন্য প্রহরী বোধহয় তারা। সদর থেকে শুরু করে রন্ধনশালার ভাতের হাঁড়ি পর্যন্ত খড় দিয়ে বেষ্টন করে পৌষকে আটকে রাখার ব্যবস্থা করে কৃষি-আশ্রয়ী মানুষ।

আর আছে স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, অভ্যাগত, রবাহূত-অনাহূতকে সঙ্গে করে পিঠে খাওয়া। গত কাল সারা দিন ধরে চাল গুঁড়ো করা, দুধ জ্বাল দিয়ে ক্ষীর করা, ভাল নলেনগুড়ের জোগান দিয়ে যার শুরু হয়েছিল, পিঠেপুলি খেয়ে, খাইয়ে আজই তার শেষ।

খাওয়াদাওয়ার পাট শেষ হলে, যাদের উৎসাহ সব পার্বণে সব থেকে বেশি, সেই কুমারী মেয়েরা যাবে পুকুরঘাটে। ঘটে জল ভরে নিয়ে উলু দিয়ে তারা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করবে, পাছে পৌষ পালিয়ে যায়। রাঢ়ের গ্রামাঞ্চলে পৌষপরবে ছড়াকাটা, নাচগানও চলে। পৌষকে তোষামোদ এবং পুজো করার জন্য যে সব ছড়া বা গান গাওয়া হয়, তার দু’একটি নমুনা আস্বাদন করা যেতে পারে:

ও বুড়ি ও ছুঁড়ি
গাটশিতলা যাই
গাঁয়ের ভেতর দেখে এলাম
দুয়োর সব মরাই।
মরাই নয় মরাই নয়
চার কড়া কড়ি
তাই দিয়ে আমরা
পুজি গো পৌষবুড়ি।

অথবা পৌষবুড়িকে আগলানোর গানটি:

পৌষ আসছে গুড়িগুড়ি
পৌষের মাথায় চালের ঝুড়ি।
এসো পৌষ, যেও না
জন্ম জন্ম ছেড়ো না।

কিন্তু, তবুও তো শেষ পর্যন্ত পৌষকে ধরে রাখা যায় না। পৌষ একছুটে পালিয়ে যায়। গ্রামের গলিপথ ছেড়ে একছুটে সে মাঠে পড়ে, ছোলা এবং আইরি ক্ষেতের ফাঁকফোকর দিয়ে সে ছুটছে। তাকে ধরে আনার জন্য গ্রাম্য বালক-বালিকার আগ্রহ, প্রলোভন, অনুরোধ কিছুই আর শেষ পর্যন্ত কাজে লাগে না। তাদের করুণ গান:

পোষ পালালো
পোষ পালালো
ছোলা আড়ি দিয়ে
ওই পোষকে ধরে আনব
শেঁয়া শাড়ি দিয়ে।
পোষ পালালো
পোষ পালালো
খুদের হাড়ি নিয়ে
ওই পোষকে ধর গা ভাই
লাঙলা দড়া দিয়ে।

পিঠেপুলির পরব, মকরের স্নান আর মেলা, এ সব শেষ করে সূর্য ঢলবে উত্তরায়ণের দিকে। মেলা গাইডে পৌষ সংক্রান্তির মেলার জেলাওয়ারি হাল-হকিকত জানা যাবে। এ সব জেনে এবং না জেনে মানুষ মেলায় যাবে। যারা যায় তাদের বেশির ভাগই সাধারণ গ্রামীণ মানুষ। কেন যায়?

মকর সংক্রান্তির সব থেকে বড় মেলা হয় গঙ্গাসাগরে। সারা ভারত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ আসেন এই মেলায় যোগ দিতে, মকর স্নানের পুণ্য অর্জন করতে, নিছক মেলা দেখতেও আসেন। অনেক মানুষের রক্তের মধ্যে মেলা-বাতিক আছে।

ranga.alur.puli
রাঙ্গা আলুর পুলি

সাতই পৌষের বোলপুরের মেলায় লক্ষ লক্ষ না হোক, লক্ষ লোক আসেন। কলকাতার সম্পন্ন মানুষ, সচ্ছল বুদ্ধিজীবী মানুষও আসেন। তাঁরা কি শুধু নতুন ফুর্তির উপকরণ খুঁজতে আসেন? দামি হুইস্কির বদলে মহুয়া, মহার্ঘ স্ত্রীলোকের বদলে গ্রাম্য যুবতীর বিকল্পে?

এমন মনে হয়নি আমার। বর্তমান পৃথিবীর চিন্তাভাবনাকে প্রবল ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ইন্দ্রিয়সুখ। স্থূল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সুখ এত ভয়াবহ রকমের বাস্তব, এর বিকল্প কোনও ধারণা মানুষের চিন্তাতেই আর আসে না যেন। নিত্য নতুন উদ্ভাবিত ভোগ্যপণ্য তার আগেরটিকে বাতিল করে সামনে অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নির্ধারিত হয় ভোগের সামগ্রীর বিনিময়ে। প্রেম, ভালবাসা, সহানুভূতি, এক কথায় যথার্থ সংবেদনশীল মন যে সম্পর্ককে প্রগাঢ় করে, পণ্যের বাজারে তার কোনও স্থান নেই, দামও নেই। মানুষ নিরন্তর একা হয়ে যাচ্ছে। বহু ভোগের বিস্তৃত পরিধির মধ্যে বাস করেও এই একাকিত্ব বহু মানুষের দম বন্ধ করে দেয়, হাঁপিয়ে ওঠে সে। তাই সে মেলায় যায়, মেলামেশার নতুন দিগন্তে হারিয়েও যেতে চায় কেউ কেউ। পৌষ মেলায় ঘোরে। পৌষ মেলা শেষ করে অজয়ের পাড়ে গভীর রাতে কম্বল মুড়ি দিয়ে উবু হয়ে বসে শোনে—

মন সহজে কি সই হবা
চির দিন ইচ্ছা মনে আলডেঙ্গায়ে ঘাস খাবা—
মন আল ডেঙ্গায়ে ঘাস খাবা
সহজে কি সই হবা।
ডাবার পর মুগুর পড়লে
এক দিনে গা টের পাবা,
মন—

শুনতে চায়:

পরি এই কপ্‌নি ধ্বজা
মজা ওড়ালে ফকিরি—
দেখ না মন ঝকমারি
এই দুনিয়াদারি।

কলকাতার সাহেবপাড়া ছাড়িয়ে বড়দিনের উৎসবের ঢল অলিতে-গলিতে ঢুকে পড়েছে। কী যে মহার্ঘ সব বন্দোবস্ত। পৃথিবীর যাবতীয় সুখাদ্যের আয়োজন আর ভোগ্যবস্তুর সম্ভার থরে থরে সাজানো। রেস্টুরেন্টে, হোটেলে, দোকানে ফুটপাথে ব্যবস্থাপকরা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পণ্য সাজিয়েছেন ইতিমধ্যেই। খবরের কাগজে, টেলিভিশনের চ্যানেলে বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি। প্রত্যেকের জন্য অবারিত আমন্ত্রণ, কিন্তু আমরা সবাই জানি সেখানে প্রত্যেকের প্রবেশাধিকার নেই। যে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ এখানে কাজ করে তা হল পকেটের রেস্ত। পকেটে রেস্ত যার নেই তার অতৃপ্তি বোঝা যায়, কিন্তু অঢেল রেস্ত যার আছে, তার অতৃপ্তিও চোখে না পড়ে যায় না। বহু ভোগের অতৃপ্তি উপভোগের মাত্রাকে ক্রমশ বাড়িয়ে নিষ্কৃতি খোঁজে।

patishapta
পাটিসাপটা

আমাদের যাবতীয় উৎসবই এক কালে লোকায়ত ছিল। গ্রামাঞ্চলে এখনও তা অনেক কিছুর মধ্যে টিকে আছে। পার্ক ষ্ট্রিট পাড়ার মহার্ঘ কেকের সঙ্গে খালপাড়ে কুমির দেখে দৌড়ে বাড়িতে এসে ঝোলাগুড় দিয়ে যে চিতৈ পিঠে খেয়েছিলাম, কোনও ভাবেই এই দুইয়ের উৎকর্ষের তুলনা করা চলে না। পালাপার্বণের পিঠেপায়েস, মকরের স্নান এবং শীতের দুপুরে মেলায় ঘুরে বেড়ানো কিংবা হিমঝরা রাতে চাদরে মাথামুখ ঢেকে বাউল শোনার মধ্যে যে একটা সবার সঙ্গে মিলিত হওয়ার মহত্ত্ব আছে, তা আড়ে-বহরে মানুষকে যেন অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। অন্য কোথাও এ জিনিস আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এখনও বহু সময়েই যাঁর কাছে গিয়ে নিদান খুঁজি, সেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সেই জন্যই বলিতেছিলাম, উৎসব একলার নহে। মিলনের মধ্যেই সত্যের প্রকাশ— সেই মিলনের মধ্যেই সত্যকে অনুভব করা উৎসবের সম্পূর্ণতা। একলার মধ্যে যাহা ধ্যানযোগে বুঝিবার চেষ্টা করি, নিখিলের মধ্যে তাহাই প্রত্যক্ষ করিলে তবেই আমাদের উপলব্ধি সম্পূর্ণ হয়।

golapphul pithe
গোলাপ ফুল পিঠে

মিলনের মধ্যে যে সত্য তাহা কেবল বিজ্ঞান নহে, তাহা আনন্দ, তাহা রসস্বরূপ, তাহা প্রেম। তাহা আংশিক নহে, তাহা সমগ্র; কারণ, তাহা কেবল বুদ্ধিকে নহে, তাহা হৃদয়কেই পূর্ণ করে। যিনি নানাস্থান হইতে আমাদের সকলকে একের দিকে আকর্ষণ করিতেছেন, যাঁহার সম্মুখে, যাঁহার দক্ষিণ করতলচ্ছায়ায় আমরা সকলে মুখোমুখি করিয়া বসিয়া আছি, তিনি নীরস সত্য নহেন, তিনি প্রেম। এই প্রেমই উৎসবের দেবতা— মিলনই তাহার সজীব সচেতন মন্দির।’ (উৎসব)
চলুন পৌষপার্বণে মেতে উঠি, মেলায় যাই।

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা ১ মাঘ ১৪১২ রবিবার ১৫ জানুয়ারি ২০০৬
ছবি সব নেট থেকে সংগৃহ করা।

Let's Go to Bhutan, Land of the Thunder Dragon

Bengali E Library plans to arrange a package tour to Bhutan for creating a fund for Library's Development.

The tour starts on 21st Jan, 2011 and ends on 29th Jan, 2011

We'll start from Sealdah Station, Kolkata by Rail on 21.01.11. The tour schedule is given below :

Start Sealdah to Alipurduar Junction by rail

Alipurduar Junction to Phoonpshilong by car**
Phoonpshilong to Paro via Gedu, Chukha, Chapcha, Bunagu by car
Paro 2 Night halt
Paro city, Amazing Airport of Paro, Chelela and Paro Sight seeing by car
Paro to Thimpu. 2 Night 3 Days
Thimpu sight seeing (Upper & Lower Thimpu) by car
Thimpu to Punakha & Wangdu via Bochula by car
Back to Phoonpshilong by car
Phoonpshilong to Buxa Tiger Project by car

Back Alipurduar Junc to Sealdah by rail

**Car type - 4 Seater
Well furnished Hotel

Cost of Package : Rs. 10000/- each.

Booking will be closed on 21st December. 50% of the amount must be paid before 30.12.10 and rest of the payment must be made within 15.01.11.

chelela_bhutan
পারো থেকে চিলেলা যাওয়ার পথে।

chelela_bhutan

chelela_bhutan

chelela_bhutan
পথের মধ্যে এইরকম অসংখ্য ছোট ছোট ঝর্ণা দেখা যাবে

ফুন্টসলিং (Phuntsholing ) থেকে থিম্পু (Thimpu) যাওয়ার পথে পরবে চাপচা ভিউ পয়েন্ট (Chapcha View Point)

chapcha view point
পাহাড়ের মাথা থেকে পরেছে সূর্যের আলো।

chapcha view point
চাপচা ভিউ পয়েন্টে সকলে দাঁড়িয়েছে।

chapcha view point
বড়ো মনোরম দৃশ্য।

chapcha view point
চারিদিক শুধু সবুজ।

chukkha landslide zone
এই সেই ভয়ঙ্কর রাস্তা

chukkha landslide zone
এই রাস্তা যেতে হবে ২২ কিমি

chukkha landslide zone
সত্যি বুক কাঁপে

chukkha landslide zone

গেদু ছেড়ে আমরা এবার চললাম চুখার পথে। পথে যেতে যেতে যা ভাল লাগল তাইই ক্যামেরা বন্দি করলাম।

ভূটান_চুখা_bhutan_chukha
গাড়িতে চুখার পথে।

ভূটান_চুখা_bhutan_chukha
আঁকা বাঁকা পাহাড়ী রাস্তা।

ভূটান_চুখা_bhutan_chukha
পথের এই বাঁক ভীষণ বিপদজ্জনক।

ভূটান_চুখা_bhutan_chukha
পথে যেতে যেতে পরবে এইরকম ছোট খাটো অনেক ঝরণা।

gedu
ফুন্টসলিং থেকে থিম্পু যাওয়ার পথে।

gedu
যাওয়ার পথে হাল্কা কুয়াশা।

gedu
হঠাৎ কুয়াশায় ঢেকে গেল চারদিক।

gedu
পাহাড়ের কোলে ছোট্ট শহর গেদু।

gedu
প্যাঁচ খাওয়া রাস্তায় উঠে লোপাদেবীর তখন গা বমি বমি করছে। এ্যাভমিন খেলেন।

gedu
রাস্তায় যাওয়ার পথে প্রাকৃতিক দৃশ্য বড়ো মনোরম।

gedu
পথে এরকম অজস্র ছোট ছোট বাড়ি কাম হোটেল পরবে।

gedu
গেদু কলেজ ও হোস্টেল এবং কিছু সরকারী অফিস।

gedu
গেদু কলেজ ও হোস্টেল এবং কিছু সরকারী অফিস।

gedu
চয়নবাবু বললেন শীত করছে একটু চা খাওয়াও।

gedu
আবার থিম্পুর পথে।

phuntsholing
ভূটানের প্রবেশ পথের মুখেই ভূটান ইমিগ্রেসন অফিস।

phuntsholing
এই পথে যেতে হবে থিম্পু।

phuntsholing
থিম্পু যাওয়ার রাজপথ।

phuntsholing
ফুন্টসলিং-এর বিচারসভার তোরণ।

phuntsholing
ফুন্টসলিং-এর এই পেট্রল পাম্প থেকে তেল ভরলাম।

phuntsholing
যাঁর গাড়িতে আমরা গেলাম তার স্ত্রী এবং ছেলের সঙ্গে চয়ন।