Topic: কী করে শ্যামবাজার হল_মাকসুদা খাতুন রিঙ্কু_SHYAMBAZAR FIVE POINT

কী করে শ্যামবাজার হল
মাকসুদা খাতুন রিঙ্কু

ছিল চার্লসবাজার। হয়ে গেল শ্যামবাজার। না, কোনও মন্ত্রবলে রাতারাতি চার্লসবাজার শ্যামবাজারে পরিণত হয়নি। এর জন্য কয়েক শতাব্দ সময় লেগেছে। কালচক্রের স্বাভাবিক নিয়মে একদা দস্যুর আশ্রয়স্থল অরণ্যঘেরা নির্জন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে জনপদ। জঙ্গল কেটে বসত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু হয়েছে। জায়গার হাত বদল হয়েছে। এই ভাবেই বিতর্কিত হতে হতে সেই জায়গা হয়ে উঠেছে আজকের ব্যস্ততম নগরাংশ শ্যামবাজার। সে এক ঘটনাবহুল ইতিহাস।

সেই ইতিহাসের প্রান্তভাগ ছুঁতে হলে আমাদের ফিরতে হবে সপ্তদশ শতাব্দে। গঙ্গাতীরে চিৎপুর তখন গভীর জঙ্গল। সেই অরণ্যানীরই একাংশ বিস্তৃত ছিল আজকের শ্যামবাজার পর্যন্ত। ঘন জঙ্গলের ভিতরে ছিল বিশাল এক ডাকাত দলের আস্তানা। আজকের ক্যানেলের ধারে, জঙ্গলের প্রান্তসীমায় ছিল শ্মশান। শ্মশানকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল ভৌতিক নানান কল্পকাহিনী। আস্তানাকে নিরাপদ রাখার লক্ষ্যেই ডাকাতরা ওই কল্পকাহিনী রটিয়েছিল।

shyambazar

সপ্তদশ শতাব্দের শেষভাগে কলকাতা-সুতানটি-গোবিন্দপুরে পরিবর্তনের হাওয়া ঢুকছে। জোব চার্নক জাহাজ থেকে নেমে কলকাতার মাটিতে পা রেখেছেন। সুতানটি বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি জাঁকিয়ে বসছে। জোব চার্নক ওই কোম্পানির এজেন্ট। তাঁরই সাব-এজেন্ট জনৈক চার্লস সাহেব। ব্যবসার প্রয়োজনে গঙ্গার কাছাকাছি তাদের প্রয়োজন এক উপ-বন্দরের। তারই জায়গা খুঁজতে খুঁজতে কোম্পানির নজরে আসে ওই জঙ্গল। পাশেই পাওয়া যাবে গঙ্গা-সংযুক্ত খাল। ডাকাতরা বুঝতে পারে এখানে উপ-বন্দর হলে জঙ্গল কাটা হবে, তাদের আস্তানাও তুলতে হবে। তাই চার্লস জঙ্গল পরিদর্শনে এলে ডাকাতরা আক্রমণ চালায়। সে যাত্রায় চার্লস কোনও ক্রমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান। পরে কোম্পানির সেনাদের সঙ্গে ডাকাত দলের সংঘর্ষ হয়। ডাকাতরা অনেকে পালিয়ে যায়, অনেকে মারা পড়ে। এভাবে জঙ্গল দখল হয় কোম্পানির। ততদিনে মুর্শিদাবাদের নবারের উপ-বন্দর গড়ার অনুমতিও হাতে এসে গেছে কোম্পানির।

গড়ে ওঠে উপ-বন্দর, লোকালয়, বাজার। পণ্যবাহী নৌকা আসে উপ-বন্দরে। চার্লস সাহেবের ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠে বলেই লোকে এটাকে চার্লসবাজার নাম দেয়। এর মধ্যে একদিন চার্লস খুন হয়ে যান। কোম্পানি অনেক চেষ্টা করেও খুনিদের ধরতে পারেনি। কারও কারও মতে পলাতক ডাকাতরাই নাকি চার্লসকে খুন করেছিল।

চালর্সবাজারে বাঙালি বণিকরাও আসতেন। তাদেরই একজন শোভারাম বসাক এরপর চার্লসবাজারের উপ-বন্দরের দায়িত্ব নেন। ক্রমশ তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ে। তথ্য বলছে, প্রথমে তিনি তিনটি কাজ করেন। এক, চার্লসবাজারের আয়তন বৃদ্ধি করেন। দুই, গঙ্গা-সংযুক্ত ক্যানেল সংস্কার ও প্রশস্ত করেন। তিন, তারই পূর্বপুরুষ শ্যাম বসাকের নামানুসারে চার্লসবাজারের নতুন নামকরণ করেন শ্যামবাজার। এই নামকরণের ব্যাপারে ভিন্নমতও আছে। তবে বেশিরভাগ ঐতিহাসিক এই মতটাকেই প্রধান্য দিয়েছেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি বোধহয় নতুন নামকরণ সহজে মেনে নিতে পারেনি। তাই শ্যামবাজারের নাম লোকমুখে চালু হয়ে গেলেও, কোম্পানির কাগজপত্রে অনেক দিন তা চার্লসবাজার হয়েই ছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দে শোভাবাজার রাজবংশে সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। সেই বিবাদে রাজবংশের কিছুটা সম্পত্তি হাইকোর্ট দখল করার নির্দেশ দেয়, যার মধ্যে শ্যামবাজারও ছিল। সেই নির্দেশনামায় শ্যামবাজারেরকে চার্লসবাজার বলে উল্লেখ করা হয়। নির্দেশনামায় বলা হয়: It is hereby ordered that Eliot Mc-Naughten Esq, the official Receiver of this Court do take possession of the following immovable properties situate in Calcutta that is to say Charles Bazar. Hogol cooudy ete...

পরিবেশগত বদল শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দ থেকেই। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও শ্রমিকশ্রেণীর আগমনে আজকের চেহারা নেয় শ্যামবাজার।

আর একটি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, শ্যামবাজারেরই এক তান্ত্রিকের আখড়া এবং এক পীরের মজলিশ থেকে সারা বাংলায় নীলবিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়া হত। সম্ভবত শোভাবাজার রাজবংশের দ্বিতীয় পুরুষের আমলে এটা সংঘটিত হয়েছিল। ডাকাতদের ছেড়ে যাওয়া কালীমন্দিরে চণ্ডীচরণ ব্রহ্মচারী নামে এক তান্ত্রিকের আগমন ঘটে। পাশের এক গাছতলায় নুরউদ্দিন মোল্লা নামে এক পীর আস্তানা গাড়ে। দিনে তাঁদের মধ্যে কোনও যোগাযোগ না থাকলেও, রাতে নাকি তান্ত্রিক এবং পীরের মধ্যে সম্মিলন ঘটত।

দু’পক্ষের ভক্ত-শিষ্যরাও মিলেমিশে যেতেন। সে সময় ইংরেজ সরকার নীল বিদ্রোহের জেরে নাজেহাল। এই সময় দালালরা খবর আনে, বাংলাদেশে নীলবিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছে শ্যামবাজারেরই তান্ত্রিক আখড়া ও পীর মজলিশ। তান্ত্রিক এবং পীর আসলে ছদ্মবেশি দুই নেতা। সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ সেনা আক্রমণ চালায়। তাতে ব্রহ্মচারী কোনও রকমে পালাতে পারলেও নিহত হন নুরউদ্দিন। ইংরেজ সেনারা তাঁর মৃতদেহ খালে ফেলে দিয়ে গেল, ভক্তরা সেই মৃতদেহ তুলে কালীমন্দিরের পাশে সমাধিস্থ করে।

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ৫ আশ্বিন ১৪০৯ রবিবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০০২

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up