Topic: রূপসায়রে ডুব_তিলোত্তমা মজুমদার _ON BEAUTY_UMBERTO ECO

রূপসায়রে ডুব
তিলোত্তমা মজুমদার

সৌন্দর্যের সংজ্ঞা নির্ণয় সহজ নয়। নির্ণয়ের চেয়েও কঠিন সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বিষয়ে একমত হয়ে ওঠা। তাজমহল দেখে অনেকেই চোখ ফেরাতে পারে না। আবার, কারও মতে, সাদা ফ্যাটফেটে চাকচিক্যহীন বস্তু— কী আছে ওতে? তা সত্ত্বেও কিন্তু মানবেতিহাসে সচেতনার আদি থেকে সৌন্দর্যচর্চা অব্যাহত। জ্ঞানী ও বহুদর্শী মানুষেরা সৌন্দর্যের সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন। তাঁদের বিস্তারিত ব্যাখ্যা অবলম্বন করে সৃষ্টি হয়েছে সৌন্দর্য তত্ত্ব, সৌন্দর্য দর্শন। আসলে, গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থার পর মানুষের যা করার কথা, সে হল সৌন্দর্যের উপাসনা। এমনকী, বিজ্ঞানও প্রকৃত পক্ষে সৌন্দর্যের সাধক। যত ক্ষণ সে কল্যাণের পথযাত্রী, তত ক্ষণ মানবজীবনকে সুন্দর ও মহনীয় করে তোলাই তার লক্ষ্য।

bartolomeo veneto flora
বার্তোলোমিও ভেনেতো-র আঁকা ‘ফ্লোরা’। ১৫০৭-১০

তা হলে কি সৌন্দর্যের সঙ্গে কল্যাণের একেবারে সরাসরি সম্পর্ক? অনেক সুন্দরোপাসকের ধারণা তাই। তাঁদের কাছে যা কল্যাণ, তাই সুন্দর। অর্থাৎ, এখানে সৌন্দর্যবোধের আড়ালে আছে এক উপযোগের দাবি। তা হলে কি কুইনিন বা নানা অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের কাছে সুন্দরের আদর্শ হয়ে উঠবে? এ ভাবে ভাবলে ব্যাপারটা হাস্যকর। তবে, বোঝা যাচ্ছে যে, যা কল্যাণ, তাই সুন্দর— এই সরল ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ নয়। এঁদের থেকে একটু পৃথক ধরনে ভাবেন বিশুদ্ধবাদীরা। সৌন্দর্যকে তাঁরা বলেন বিশুদ্ধ রসের, বিশুদ্ধ ভাবের উৎসার। যে-ভাব বা যে-রস মনের মধ্যে আনন্দের সঞ্চার করে, তাকেই আমরা বলতে পারি বিশুদ্ধ রস। তা হলে আরও একটা মত মোটামুটি দাঁড়াল: যা আমাদের মনে আনন্দের সঞ্চার করে, তাই-ই সুন্দর।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: রূপসায়রে ডুব_তিলোত্তমা মজুমদার _ON BEAUTY_UMBERTO ECO

এই যে সুন্দরকে একটি ব্যাখ্যায় গ্রন্থিত করা হল, তা যেন অসুন্দরের থেকে সুন্দরকে আলাদা করে দেখা, সত্য ও অসত্যের মতো, দিন ও রাত্রির মতো। ভাল ও খারাপের মধ্যে একটি দাঁড়ি টেনে আলোচনা সমাধা করা। কিন্তু, এর মধ্যে থেমে থাকেনি সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা। যদি, ধরা যাক, কোনও বীভৎস রস দ্বারা আনন্দ সঞ্চারিত হল, তা হলে কি সেই বীভৎসকে বলা হবে সুন্দর?

এই বৈপরীত্যের সমাধান ঘটাতে এল এক নতুন ব্যাখ্যা: সৌন্দর্য এক প্রকাশ। রসের প্রকাশ দ্বারা উদ্ভূত আনন্দ। একটি করুণ সংগীতে আমাদের মন ভিজে উঠতে পারে, যে-বোধের উৎসার ঘটাল ওই সংগীত, তা দুঃখের বোধ, আর এই যে দুঃখের বোধ ঘটিয়ে তোলার শক্তি ওই সঙ্গীতের অভিব্যক্তিতে বা প্রকাশে নিহিত, সেই উপলব্ধি দুঃখের উৎসার হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দিল এক ধরনের আনন্দ বা তৃপ্তি। লক্ষ করতে হবে যে, এখানে বলা হচ্ছে ‘এক ধরনের’ আনন্দ। অর্থাৎ, আনন্দেরও আছে রকমফের। একে শ্রেণিবদ্ধ করার চেষ্টা মূর্খামি।

যুগযুগান্তের সৌন্দর্যচেতনা, ব্যাখ্যা, শিল্পে বিচিত্র দর্শনের প্রকাশ ও প্রভাব ইত্যাদির সমাহারে উমবের্তো একো সৌন্দর্য বিষয়ে একটি বই লিখেছেন: ‘অন বিউটি’। উমবের্তো পেশায় অধ্যাপক, ইতালির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিয়োটিক্‌স বিষয়ে তিনি পড়ান। ইতিমধ্যে উমবের্তো চারটি উপন্যাস লিখেছেন, যেগুলি বিশ্বখ্যাত। প্রবন্ধমূলক গ্রন্থ লিখেছেন বেশ কয়েকটি। প্রতিটিই গভীর বিশ্লেষণ ও মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সমৃদ্ধ। উমবের্তো অন বিউটি-তে নিজস্ব কোনও দার্শনিক তত্ত্বের কথা বলেননি।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: রূপসায়রে ডুব_তিলোত্তমা মজুমদার _ON BEAUTY_UMBERTO ECO

ভাস্কর্য, চিত্রশিল্প এবং আলোকচিত্রে সাজিয়ে এই গ্রন্থকে তিনি করে তুলেছেন বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে দেখা এক আকর। সতেরোটি পর্বে বিভাজিত এই গ্রন্থে উমবের্তো বলেছেন ছবির কথা, ভাস্কর্যের কথা, স্থাপত্য ও আলোকচিত্রের কথাও। কিন্তু, বলার রকম আলাদা। আসলে, শিল্পবোধ সম্পর্কে প্রত্যেক যুগেরই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। এই গ্রন্থকে বলা যেতে পারে, বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির তুলনা উপস্থাপিত করার গ্রন্থ।

একটি চমৎকার ভূমিকা গোড়াতেই লিখেছেন উমবের্তো। তাতে লিখছেন— ‘Beautiful’ together with ‘graceful’ and ‘pretty’ or ‘sublime’ ‘marvellous’ ‘superb’ and similar expressions— is an adjective that we often employ to indicate something that we like. In this sense, it seems that what is beautiful is the same as what is good, and in fact in various historical periods there was a close link between the Beautiful and the Good.

সুন্দরের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে সুন্দরের সঙ্গে ভালত্বর সংযোগ নিবিড় হয়ে ছিল। এই ভালত্বর অন্তরালেও আছে এক উপযোগবাদ। যেমন, খুব খিদের মুখে একেবারে সাধারণ ভাতের গন্ধও লাগে ‘ভাল’, লাগে ‘সুন্দর’। পেট ভরভরতি থাকলে এই গন্ধ হয়তো আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহকে এতটুকুও আনন্দ দেবে না। অর্থাৎ, সুন্দর এখানে একটি শর্ত বা এক পরিস্থিতির অপেক্ষক।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: রূপসায়রে ডুব_তিলোত্তমা মজুমদার _ON BEAUTY_UMBERTO ECO

উমবের্তো বলছেন, দৈনন্দিনের মধ্যে চোখ ফেললে দেখা যাবে, অসংখ্য, অগুনতি বিষয়কে আমরা নিরন্তর সুন্দর আখ্যা দিয়ে চলেছি। হতে পারে কারও সততা, কারও চমৎকার ব্যবহার, কারও দেশের জন্য শহিদ হয়ে যাওয়া কিংবা নিছক কিছু বিয়ের তত্ত্ব! এই সব সুন্দর বিষয় যে একেবারে নিজের হতে হবে বা নিজের করে পেতে হবে, তার কোনও মানে নেই। নিজের থেকে আলাদা করেও সমস্ত সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায়। আসলে, দৈনন্দিন জীবনে যখন ভাল আর সৌন্দর্য সমার্থক, তখন ‘ভাল’ ব্যাপারটা ভাল করে বুঝে নেওয়া দরকার। উমবের্তো বলছেন, যা আমাদের মধ্যেকার প্রত্যাশাকে অনুপ্রাণিত করে বা পূর্ণ করে, তাকেই আমরা বলি ভাল, বলি সুন্দর।

কিন্তু, এ তো গেল দৈনন্দিনের মোটা দাগের সৌন্দর্যবিচার। আরও একটু ডুব দিলে যখন দাঁড়াব কোনও শিল্পের মুখোমুখি, কিংবা কোনও প্রাকৃতিক দৃশ্যপট— যা চিরন্তনের তুলিতে আঁকা আছে চিরকালের জন্য, যখন সেই অনন্ত রহস্যময়তার ওপর দৃষ্টি ও মন স্থাপিত হবে— তখন সুন্দরের ব্যাখ্যা আসবে আর একটু পৃথক হয়ে। এই পার্থক্যকে উমবের্তো মনে করছেন প্রত্যাশারহিত দৃষ্টি। প্রকৃতপক্ষে সৌন্দর্যবোধ বা সৌন্দর্যোপলব্ধি কোনও ব্যক্তিগত প্রত্যাশার ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং প্রত্যাশা পূর্ণ হলে সৌন্দর্য অনেক গভীর ভাবে উপলব্ধি করা যায়।

উমবের্তো বলছেন, দারুণ তৃষ্ণার্ত কোনও ব্যক্তি যদি একটি অপরূপ ঝরনার সামনে দাঁড়ায়, তা হলে ঝরনার সৌন্দর্য উপলব্ধি করার আগে সে জল পান করবে। তৃষ্ণা তৃপ্ত হলে সে দু’চোখ ভরে উপভোগ করবে দৃশ্যপট। অর্থাৎ, প্রত্যাশার শর্ত পূরিত হয়ে সম্পূর্ণ প্রত্যাশা-নিরপেক্ষ হওয়ার পর সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। অবশ্য একে সামগ্রিক নিরপেক্ষতা বলা নাও যেতে পারে। তৃষ্ণা নিবৃত্তির সুখ আছে বলেই সুন্দরকে দেখার মন আছে। এখানে দেখা যাচ্ছে সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে আছে সুখবোধও।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: রূপসায়রে ডুব_তিলোত্তমা মজুমদার _ON BEAUTY_UMBERTO ECO

অর্থাৎ সৌন্দর্যবোধ কখনওই হয়ে উঠছে না কোনও একাকী চেতনা। মানবজীবনের নানান অনুসর্গ ও উপলব্ধির সমন্বয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে সৌন্দর্য। কিন্তু, এও এক খণ্ডিত কালের চেতনা। এ কালের মানুষের সৌন্দর্যচেতনাকে আর তেমন সরল করে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন উমবের্তো। প্রায় হাজার বছরের সৌন্দর্যচর্চাকে নাড়াচাড়া করে তিনি আলোচনার জন্য বেছে নিয়েছেন কেবল ফাইন আর্টসকেই। ছবি, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও আলোকচিত্রকে। কেননা, দেশকাল-নির্বিশেষে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা যা-ই হোক না কেন, একটি বিষয় সব কালেই বর্তমান। তা হল, শিল্পের সঙ্গে সৌন্দর্যের নিবিড় সম্পর্ক। আবার, এ কথাও ঠিক— সব কালের সব শিল্পেরই উদ্দেশ্য শুধুমাত্র বিশুদ্ধ সৌন্দর্যচর্চা ছিল না। শিল্পের প্রেরণা হতে পারত ধর্মবিশ্বাস, লোকাচার এমনকী রাজাদেশ। প্রাচীন রোমান চার্চের দেওয়ালে বা থামে প্রচুর রাক্ষস-খোক্কস আঁকা দেখতে পাওয়া যায়। তৎকালীন শিল্পীরা এই সব রাক্ষসমূর্তি যে বিশুদ্ধ সৌন্দর্যে প্রাণিত হয়ে এঁকেছিলেন, এমন নয় মোটেই। এগুলো আঁকার পিছনে ছিল কিছু গভীর বিশ্বাস। বর্তমানে আমরা ওই ছবি বা খোদাইগুলিকে সুন্দর বলে থাকতেও পারি, কারণ এ কালে উপযোগিতা ব্যতিরেকী সৌন্দর্যচেতনা আমরা লাভ করেছি। কিছু মাত্রায় হলেও প্রকৃতির হুবহু অনুকরণকেই একমাত্র সৌন্দর্য আর বলি না আমরা এখন। বীভৎসের মধ্যেও পাই উপভোগ্যতা ও আনন্দ। আনন্দ ও সৌন্দর্য বিষয়ে এ কালের মন হয়ে উঠেছে শিক্ষিত ও ধৈর্যশীল। সব রকম শিল্পবস্তুর মধ্যেই সে সুন্দরকে বোঝার ইচ্ছে নিয়ে এসে দাঁড়ায়।

তাই, ফিরে আসে সেই কথাই আবার— শিল্প বা সৌন্দর্যের চূড়ান্ত ও ধ্রুব সংজ্ঞা কিছু হয় না। দেশকালের ওপর তার অবস্থান নির্ভর করে। আসলে, মানুষ নিজেকে যেমন দেখে, যেমন জানে, শিল্পে তেমনই দেখা ও জানার প্রকাশ ঘটায়। এ বিষয়ে একটি চমৎকার কথা বলেছেন সক্রেতিস-পূর্ববর্তী এক জন দার্শনিক। কলোফোন নামের সেই দার্শনিকের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন উমবের্তো। তিনি বলছেন— ‘যদি ষাঁড় কিংবা সিংহের হাত থাকত, আর ওই হাত যদি মানুষের হাতের মতোই সক্রিয় হত, তা হলে তাদের হাতে অঙ্কিত ঈশ্বর পশ্বাকৃতির হয়ে ছবিতে দেখা দিতেন। ঘোড়া আঁকত ঘোড়ার চেহারা, ষাঁড়ের হাতে ঈশ্বর হতেন ষাঁড়ের মতো।’

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: রূপসায়রে ডুব_তিলোত্তমা মজুমদার _ON BEAUTY_UMBERTO ECO

সুতরাং, সৌন্দর্যবোধের আপেক্ষিকতা উমবের্তো স্বীকার করেছেন বার বার। তিনি দেখিয়েছেন দৃষ্টি বদলে যায়, বিশ্বাস বদলে যায়, আবার যুগান্তরের দৃষ্টিভঙ্গিও মিলে যায় কখনও কখনও। যেমন, একই যুগের মধ্যেও পাশাপাশি থেকে যেতে পারে একাধিক শিল্পবোধ, বিশ্বাস ও ধারণা। এমনকী, তাদের মধ্যে বিরুদ্ধ বোধ থাকাও কিছু বিচিত্র নয়।

যেহেতু এ বইয়ের শিল্পালোচনা একেবারে আধুনিকে এসে মিশেছে, সেহেতু উমবের্তো এমন কিছু শিল্পসম্ভার এনেছেন, যার সঙ্গে বিশুদ্ধ শিল্পচর্চার সম্বন্ধ নেই। সেই সমস্ত তিনি সংগ্রহ করেছেন বিজ্ঞাপন থেকে, চলচ্চিত্র থেকে, এমনকী টেলিভিশন থেকেও। বিজ্ঞাপন বা অভিনয়ের প্রয়োজন ছাড়াও কিছু কিছু ছবি এই সংগ্রহে আছে, শুধুমাত্র যৌন আবেদনেই যার ব্যবহার।

উমবের্তো বলতে চেয়েছেন, নান্দনিক শিল্পচর্চা ও সৌন্দর্যবোধের বাইরেও আছে এক ব্যাপ্ত জগৎ, যেখানে কোনও কোটির মানুষের কাছে বিজ্ঞাপনী আবেদন বা যৌন, শরীরী আবেদনই সৌন্দর্যের চূড়ান্ত বোধ। সৌন্দর্যচর্চার ইতিহাসে এই আধুনিকতম দৃষ্টিভঙ্গিকেও বাদ রাখা যায় না কোনও মতেই। উমবের্তো তাই পাতায় পাতায় যে ছবির সম্ভার এনেছেন পাঠকের জন্য, তাতে অ্যাগনেসো ব্রনজিনোর অ্যালিগরি অব ভেনাস (১৫৪৫)-এর পরের পাতায় আছে ১৮৯২ সালে পল গগ্যাঁর আঁকা নগ্ন আদিবাসিনী ও শায়িত পুরুষ— এবং তার পরের পৃষ্ঠা জুড়েই ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, হাইহিল, স্কিন-টাইট প্যান্টস পরা এক মডেল অ্যালেন জোন্স। ১৯৭৩ সালে এই ছবিটি তুলেছিলেন ফিলিপ ক্যাসেল।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: রূপসায়রে ডুব_তিলোত্তমা মজুমদার _ON BEAUTY_UMBERTO ECO

কুড়ি পৃষ্ঠা জোড়া তুলনামূলক সারণি দিয়েছেন উমবের্তো। প্রথম সারণি নগ্ন ভেনাস চিত্রের। ছোট ছোট ছবি পাশাপাশি সাজিয়ে উমবের্তো দেখিয়েছেন কী ভাবে যুগে যুগে উপস্থাপিত হয়েছে নগ্ন ভেনাস। চিত্রিত শিল্পের সঙ্গে সঙ্গে ভাস্কর্যের ছবিও এখানে পাশাপাশি রাখা হয়েছে। প্রথম ছবিটি অত্যাশ্চর্য। খ্রিস্টপূর্ব তিরিশ শতকের একটি অদ্ভুত মূর্তি। এক অসম্ভব স্ফীত নারীদেহ, যার মুখ খোদাই হয়নি। মুখমণ্ডল যেন ঢেকে দেওয়া। স্ফীত দেহের বিশাল ও নতমুখী স্তন নেমে এসেছে নাভিগর্তের কাছাকাছি। পেটটি মোটা ও শরীরের সব চেয়ে চওড়া অংশ। যোনি অতি স্পষ্ট। ঊরুদ্বয় ভারী। যেন বহু সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর শরীর সম্পর্কে বীতস্পৃহ এক রমণী। কিন্তু, একটু গভীর মনোযোগে লক্ষ করলে বোঝা যাবে মেদমাংস-বাহুল্যের আপাত বীতস্পৃহার আড়ালে আছে তীব্র যৌন আবেদন। কারণ, হাতদুটি পিছনে থাকায় বুক সম্মুখবর্তী এবং যোনি স্ফুটিত। সারা অঙ্গে, ওই মূর্তির, বহু যৌন অভিজ্ঞতা ও শান্ত উত্তেজনা।

নগ্ন ভেনাসের শেষ ছবিতে আছেন মণিকা বেলুচি। ১৯৯৭ সালে তোলা অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গের ছবি। এখানে লক্ষণীয়, মণিকা দাঁড়িয়েছেন খ্রিস্টপূর্ব তিরিশ শতকের সেই রমণীর মতো। যদিও মণিকার শরীর মোটেই পৃথুল নয়, কিন্তু পিছনে হাত রেখে টানটান উত্তেজিত ও উত্তেজক ভঙ্গির মধ্যে গভীর সাদৃশ্য।
দ্বিতীয় সারণিতে আছে নগ্ন অ্যাডোনিসরা। এই সারণির শুরু খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকের ভাস্কর্য দিয়ে। একটি হাত ভেঙে যাওয়া এই নগ্ন পুরুষটির মধ্যে আছে স্বাস্থ্যের দীপ্তি। কিন্তু, যৌন আবেদন এখানে অনুপস্থিত। বরং ছবিটি দেখলে মনে হয় মূর্তিটির মধ্যে আছে সৌম্য আত্মগত ভাব। নিজের নগ্নতা সম্পর্কে যে সচেতন নয়।

কয়েক শতাব্দী শেষ করে নগ্ন পুরুষের সারণি শেষ হচ্ছে ১৯৮৫-তে। এখানে ‘কম্যাণ্ডো’ ছবি থেকে নেওয়া হয়েছে আর্নল্ড শোয়ারজেনেগারের  পেশিবহুল লড়াকু শরীরের ছবি। এর পরে আছে পোশাক-পরিহিত বিভিন্ন কালের ভেনাস ও অ্যাডোনিসের সারণি।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: রূপসায়রে ডুব_তিলোত্তমা মজুমদার _ON BEAUTY_UMBERTO ECO

সারণি পেরিয়ে প্রথম পর্বে প্রাচীন গ্রিসের সৌন্দর্যবোধ ও ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন উমবের্তো। প্রাচীন গ্রিসে বিয়ের সময় যে মঙ্গলগান গাওয়া হত, তার প্রতিপাদ্য ছিল যা সুন্দর তাকে ভালবাসো, যা সুন্দর নয়, তাকে ভালবেসো না। সৌন্দর্য বিষয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারেনি তখনকার গ্রিস। পেরিক্লিসের আগে সৌন্দর্য সম্পর্কে স্পষ্ট কোনও তাত্ত্বিক ধারণা প্রাচীন গ্রিসে ছিল না।

সব চেয়ে প্রচলিত ধারণা ছিল— যা যথার্থ, তা-ই সুন্দর। গ্রিক শিল্পের স্বর্ণযুগেও কিন্তু সৌন্দর্যকে ছন্দ বা জ্যামিতিক সামঞ্জস্যের সঙ্গে একই পর্যায়ে দেখা হত। সত্যি বলতে কী, কবিতার ওপরেও গ্রিকদের খুব একটা আস্থা ছিল না। প্লেটো বলেছিলেন, শিল্প ও কাব্য (অবশ্যই সেই সঙ্গে সৌন্দর্য) চোখ ও মনের আনন্দের কারণ হতে পারে, কিন্তু এগুলোর সঙ্গে সত্যের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকে ক্যালোকাগাথিয়া গ্রন্থে স্যাফো বললেন, তুমি যাকে ভালবাসো, তা-ই সুন্দর।

দেখা যাচ্ছে, প্লেটোর পর দুই শতকে সৌন্দর্য সম্পর্কে গ্রিসে একটি সচেতন সংজ্ঞা প্রস্তুত হচ্ছে। স্যাফোর সংজ্ঞার বিপরীতে বহু যুক্তি সাজানো যেতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্লেটো যে ভাবে কাব্য ও সৌন্দর্যকে জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, তেমন আর রইল না স্যাফোর কালে। স্যাফো সুন্দরকে প্রিয় করলেন না, বরং সাবেক ধারণাকে আমূল পাল্টে প্রিয়কে বললেন সুন্দর।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: রূপসায়রে ডুব_তিলোত্তমা মজুমদার _ON BEAUTY_UMBERTO ECO

on-beauty

আধুনিক সৌন্দর্যবোধ যেমন শুধু বাহ্যিক অভিব্যক্তিতেই থেমে থাকেনি, শরীরী প্রকাশে তার হয়েছে আত্মার যোগ, প্রাচীন গ্রিসের কয়েকটি কীর্তি সেই প্রাণের স্বাক্ষর বহন করে। উদাহরণ হিসেবে লাওকুন ভাস্কর্যের কথা বলা যায়। যন্ত্রণা, অসহায়তা, ভীতি ও কান্নার প্রকাশ কী অসামান্য পরিশীলনে চিরকালের শিল্প হয়েছে এই ভাস্কর্যে। এক বলিষ্ঠ নগ্ন প্রৌঢ় ও দুটি নগ্ন তরুণকে পেঁচিয়ে ধরেছে সুদীর্ঘ বলবান সাপ। তার বাঁধন খুলতে পারছে না কেউ, বরং ভেঙেচুরে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। কীসের এই সাপ? কেমন এই ভয়? ব্যাখ্যা যাই হোক, অসামান্য এই ভাস্কর্য। পুরুষের শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, অস্থি, মহাশিরা অপূর্ব কৌশলে ফুটিয়েছেন ভাস্কর। সেই সঙ্গে ভীত, ক্রন্দনরত আত্মার অভিব্যক্তি।

বস্তুর উৎস, গঠন এবং জ্যামিতিক পরিমাপের রহস্য নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছিল প্রাচীন গ্রিসে। বিশ্বতত্ত্ব, অঙ্ক, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও সৌন্দর্যতত্ত্বের বিষয়কে প্রথম এক ছাদের তলায় নিয়ে এলেন পিথাগোরাস ও তাঁর অনুগামীদের দল। পিথাগোরাস বলেছিলেন, এ জগতের সমস্ত কিছুই নিখুঁত অঙ্কের নিয়মে বাঁধা। তাঁর কাছে সৌন্দর্য ছিল এক আঙ্কিক সৌন্দর্য। তিনি বলেছেন, এই মহাবিশ্বের যা কিছু অবস্থিতি, তা সম্ভব হয়েছে সব কিছু নিখুঁত নিয়মে বাঁধা বলে, তারা নিখুঁত নিয়মে বাঁধা, কারণ প্রত্যেকটি অবস্থানই আসলে নানাবিধ আঙ্কিক সূত্রে গ্রথিত— এই আঙ্কিক সূত্রই মহাবিশ্বের সকল বস্তুর অবস্থান ও সৌন্দর্যের কারক। পিথাগোরাসই প্রথম, যিনি অনুধাবন করেছিলেন, কিছু আঙ্কিক সমানুপাতই সুরঋদ্ধ শব্দের উৎস। আবার, সুরের সমানুপাতই সৌন্দর্যের জন্ম দেয়।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: রূপসায়রে ডুব_তিলোত্তমা মজুমদার _ON BEAUTY_UMBERTO ECO

ছবিতে আলো ও রঙের ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় উমবের্তো দেখাচ্ছেন, মধ্যযুগের শিল্পীরা যে রং ব্যবহার করতেন, তার বিবিধ তাৎপর্য ছিল। শিল্পীর বাস্তাবানুকরণ বা কল্পনা তুলিতে যতখানি আসত, ততখানিই তিনি প্রাধান্য দিতেন লোকাচার ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে। মধ্যযুগে ইউরোপের বিশ্বাস ছিল সবুজ রং শুভ, কারণ বসন্তে সবুজ হয়ে যায় পৃথিবী, ফসল সবুজ, গাছ সবুজ। তাই সবুজই সব চেয়ে সুন্দর ও স্নিগ্ধ।

রাক্ষস-খোক্কস বা দত্যিদানোর ছবির বিষয়ে উমবের্তো বলছেন, প্লেটো ও তৎপরবর্তী সুদীর্ঘ সময় সুন্দর ও অসুন্দরের বিভাজন ছিল পরিষ্কার এবং এদের পাশাপাশি বসার অধিকার ছিল না। অসুন্দর বা কুৎসিতকে সৌন্দর্যের বিপরীতে রাখা হত। কিন্তু, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে অনেক। অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে কান্ট পর্যন্ত বিভিন্ন আলোচনা পর্যালোচনা করলে কুৎসিতের আদরণীয় হয়ে ওঠার ইতিহাস মিলবে। অসুন্দরের সৌন্দর্যবিহীনতাকে শিল্পের গুণে অসুন্দরের যাবতীয় চমৎকারিত্বে উপস্থাপিত করলে তা সুন্দর শিল্প হয়ে ওঠে। অনেক সময় অসুন্দরকে নিরন্তর তুলে ধরার প্রবণতা তৈরি হয়। মধ্যযুগের শিল্পে তার প্রমাণ মেলে। এই সময় শয়তানের চিত্র আঁকার প্রবল ঝোঁক জন্মেছিল। হেগেল এই প্রবণতার জন্য দায়ী করেছেন যিশুর মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাটিকে। এর ফলে যিশুর ধর্মগ্রহণকারীদের মধ্যে যন্ত্রণা, কষ্ট, মৃত্যু, অত্যাচার এবং নারকীয় পরিবেশ আঁকার প্রবণতা জন্মেছিল।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: রূপসায়রে ডুব_তিলোত্তমা মজুমদার _ON BEAUTY_UMBERTO ECO

বইয়ের সতেরোতম পর্বটি হল ‘দ্য বিউটি অব মিডিয়া’। এই পর্বে উমবের্তো প্রবেশ করেছেন আধুনিকতম সময়ে। খ্রিস্টপূর্ব ত্রিশ শতকের সেই নারীর থেকে ১৯৬০ সালে এসে থেমেছেন তিনি। কিন্তু এই পর্বে পৌঁছে তিনি স্পষ্টত দ্বিধাগ্রস্ত। কেননা তিনিও এই সময়ের। কোনও বিষয়কে যে-দূরত্ব থেকে দেখলে নিরপেক্ষ আলোচনা সম্ভব, এ কালের সঙ্গে তাঁর সে-দূরত্ব নেই। তিনি শুধু দেখেছেন সৌন্দর্যবোধ নতুন নতুন শিখায় জ্বলতে জ্বলতে বেরিয়ে আসছে। রেসিং কারের মডেলে আছে এই সৌন্দর্য, ঝলমলে ফ্যাশন পত্রিকায় ও টিভির চকচকে মডেলে আছে। আর মডেলের নির্দেশিত পোশাক, নেলপালিশ, ঠোঁটের রং, চুলের রং, হাঁটার ধরন, অন্তর্বাস, দাড়িগোঁফের দৈর্ঘ্য— সব মিলিয়ে গোটা জীবনটাই চলে যাচ্ছে, কনজিউমারিজমের বিপুল গর্ভে। আভাঁগার্দ ভাবনা এখন নতুন চ্যালেঞ্জের সামনাসামনি। নিও- পিথাগোরিক্যাল ভাবনা এসেছে শিল্পীর তুলিতে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছন্দ, অনুপাত, জ্যামিতিক সাযুজ্য— এর বাইরে তৈরি হয়েছে এক নতুনতম শিল্পের জগৎ। আমরা তার নাম জানি: অ্যাবষ্ট্র্যাক্ট আর্ট। অধিকাংশ দর্শকের চোখ সে শিল্পে রস পায় না। কিন্তু, সৌন্দর্যচর্চা থেমে থাকে না তার জন্য। এ কালের মানুষ সুন্দর সাঁতার কাটে, সুন্দর মোটরবাইক চালায়, সুন্দর সেক্স করে। মাদক সেবন করে দ্যাখে এক সুন্দর অসম্ভবের দুনিয়া। এ কালের চোখে সারা ক্ষণ লেগে থাকে ফিল্মের জাদুকর-জাদুকরী, সুন্দর হিরো আর হিরোইন। কোনটা সুন্দর, কোনটা নয়, এখন নির্ধারণ করে দেয় মিডিয়া। আমরা তাকে অনুসরণ করি মাত্র। তা হলে? মিডিয়া সত্যিই প্রকৃত সুন্দরকে চিহ্নিত করে, নাকি মিডিয়া যাকে চিহ্নিত করে, আমরা তাকেই গ্রহণ করি? নির্বিচার হয়ে থাকি সৌন্দর্য বিষয়ে?

অন বিউটি, উমবের্তো একো, সেকার অ্যাণ্ড ওয়ারবার্গ, লণ্ডন

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা ২২ ফাল্গুন ১৪১১ রবিবার ৬ মার্চ ২০০৫

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up