Topic: কেন চেয়ে আছ

কেন চেয়ে আছ


pablo picasso
পাবলো পিকাসোর ছবি, অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা

পুরুষ যে প্রচণ্ড কর্ষণ করবে, তা প্রকৃতির অনাকাঙ্ক্ষিত তো নয়। বরং তাঁর উর্বরা হয়ে ওঠার, নিরন্তর শিহরিত থাকার শর্তও। কিন্তু সে প্রক্রিয়ার মধ্যে যদি ক্রমাগত চোয়ালে চোয়াল চেপে নিষ্ঠুর মার, উপর্যুপর, টানা, লাবণ্যহীন সমানুভূতিহীন আমোদপ্রহার, উদ্গত অশ্রুর তোয়াক্কা না করে উল্টেপাল্টে ভোগ, আবার ভোগ, শুধু ভোগ, ফের ভোগ— স্নিগ্ধ প্রশ্রয়কে নিঃশর্ত সমর্পণ ভেবে নিয়ে, প্রেমল আশ্রয়কে ভেবে নিয়ে প্রত্যাঘাতের সম্ভাবনাহীন অনন্ত জুলুমবাগিচা— আরও আরও স্বেচ্ছাচারী স্ব- সর্বস্ব ভোগই ফণা তোলে, সে অকথ্য ধর্ষণ বই আর কী। আমাদের জন্মদাত্রী, সহচরী, আমাদের মা-বোন-বউ-প্রেমিকা-ললিতে কলাবিধৌ পটীয়সী যে, বসুন্ধরা, পৃথিবী, ধরিত্রী, ধারয়িত্রী— তার সঙ্গে আমরা এ কাণ্ড করে চলেছি লাগাতার। নাগাড়ে। বার বার। অনুতাপহীন। ‘কিস্যু এসে যায় না’ ভঙ্গিতে। ‘বেশ করছি, করব’ অলজ্জ পেশিসহ।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: কেন চেয়ে আছ

সভ্যতার গোড়ায় তিনি নিজেই চেয়েছিলেন সঙ্গম। সন্দেহ নেই। ওই তো আমাদের পরম অজুহাত। আমরা সমূলে প্রোথিত করেছি অহং, তিনিও আক্রমণকে আকুল আশ্লেষে রঞ্জিত করে আলোকপুলকে আরও আকর্ষণ করেছেন আমাদের, স্বয়মাগতা যে ভাবে ওষ্ঠে দংশনদাগ প্রার্থনা করে। উজাড় করে দিয়েছেন সত্তা। রত্নগর্ভা তিনি, বীজপ্রসূ, ক্রোড়কান্তা, গন্ধবতী। কিন্তু আমরা বুঝলাম না সে অলৌকিক প্রেম। সে নিবিড় আকাশফুলিয়া অঙ্গসঙ্গ। তাঁর মৌনকে আমরা ভেবে নিলাম ছেদহীন সম্মতির ধ্রুব লক্ষণ, তাঁর দৃষ্টির ছলছল বিজলীকে ভাবলাম উত্তাপহীন আত্মবলি, অবিশ্বাস্য উৎসর্গের মূল্য না বুঝে তাঁকে করলাম আটপৌরে নিংড়ানির কল। যে ছিল স্পৃহাতুরা, আজ বালিশের তুলো কামড়ে পড়ে থাকে, আমরা নিজের ইচ্ছে তার ওপর পাথর পাথর চাপিয়ে দিয়ে বললাম, ‘তোমাকে মারব, সোনু? আলপিন ফুটিয়ে দেব, মোনু?’ সে প্রত্যেক বার মৃদু কণ্ঠে বলল, হ্যাঁ। ‘যদি তোমার ভাল লাগে, হ্যাঁ।’ আমরা সে স্বরের পরতে পরতে থাকা শতাবধি ‘না’ শুনতে না পেয়ে শুধু বাহ্যিক ‘হ্যাঁ’-র হ-টুকু ধরে, চন্দ্রবিন্দুটুকু আঁকড়ে, য-ফলাটুকু মুচড়ে, আ-কারটুকু ছেঁচড়ে, আমাদের ধর্ষকাম মিটিয়ে নিলাম তুমুল। যেমন হয়, তার পর থেকে ক্রমে নিয়ম হল উত্তরোত্তর চাবুক, এল মুখোশ, পুঙ্খ লাগানো তীব্র তীক্ষ্ণ শর, ছিপটি, মুষল, আলপনা তোলা শেকল, কাঁটা লাগানো দস্তানা। আর সে, যে একটি বার ঘুরে দাঁড়ালেই কেঁপে যাবে আমাদের আ-আলজিভ প্রাণ, এক বার চোখ তুললেই দগ্ধ হবে আমাদের আশিরনখ, এক বার অসহিষ্ণু অঙ্গ আন্দোলিত করলেই আমরা দৃপ্ত নষ্টামিসহ খসে পড়ব স্রেফ চ্যুত রোমের মতো, সে, চুপ করে থাকে, এক আধ বার আর না-পেরে ‘মা গো’ ককিয়ে ওঠা বাদ দিলে, সে বার বার বলে হ্যাঁ, আচ্ছা হ্যাঁ, প্রতিবেশীর কাছে সে যেচে কালশিটে লুকোয়, ফোনে বলে, ও আমায় মাথায় করে রেখেছে মা। ভাল আছি।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: কেন চেয়ে আছ

কেন? কেন এ আত্মঘাতী কূলপ্লাবী প্রেম? কেন উদ্যত নির্লজ্জ ভোজালি দেখে সে নিজেই এগিয়ে দেয় বারে বারে ননী তলপেট? আসলে মানিনী চায়, আমরা যাতে নিজেরা বুঝি। এক রাত্রের নিঃস্বপ্ন নিদ্রায় যেন সহসা প্রতিদ্বন্দ্বীর ভল্লের মতো সেঁধিয়ে যায় আমাদের ভিতরে এই বোধ, কী করছি। যদি সে আমাদের ছেড়ে যায়, তখুনি তো আমরা জড়। অর্থহীন। নিরালোক। নেতি। আমরা এ কথা বুঝি, আন্দাজ করি, বিশ্বাস করি না। বন্ধু যদি বলে, এ কী করছিস তুই! তোরই ভিতকে খুঁড়ে দিচ্ছিস, তোরই ডানার প্রতিটি দৈব পালক মুড়ে দিচ্ছিস, নিজ পুরুষত্ব সেলাই করে পাকিয়ে ঘিচিমিচি করে জুড়ে দিচ্ছিস, এ তো বন্ধ্যাত্বের দিকে চলেছিস! আমরা পাত্তা দিই না। বলি, চুপ। জ্ঞান দিস না। ওর আঙুল মুচড়ে, ওর ওষ্ঠ ছিঁড়ে, ওর স্তন কর্তন করে, ওর যোনি কদর্য নখলগ্ন করে আমার অভ্যাস। ওরও। ওতেই স্বস্তি।

তাই আমরা কী অনায়াসে গাছ কুপিয়ে কাটি, বায়ুস্তরে সেঁকো বিষ বাড়াই আমাদের কারখানার গাড়ির বাড়ির আরামের নিদান দিতে, পুকুর বুজিয়ে তার ফুসফুসে চাপ চাপ মাটি ফেলি, ভাবি ওঃ, আনন্দ। আমরা আমাদের মা-কে খাই। কামড়াই। গর্ভস্থ ভ্রূণ হয়ে আমরা নাড়িতে খরখরে শ্বদাঁত বসাই। নাভিতে ঢুকিয়ে গেঁথে দিই ময়লা পা। জানি না কি, এ শুধু কৃতঘ্নতা নয়, আত্মঘাত? অ-মানুষিকতা? অশুচি কাজ? এ মুহূর্তটুকু এ সি-র হাওয়া খাওয়ার জন্য, ফ্রিজের ঠাণ্ডা জল গলগল করে গলায় ঢালার জন্য, বহুতলে রইস আদমি সেজে নাচার জন্য আমরা পরবর্তী প্রজন্মের পর প্রজন্মকে করে তুলছি বিকলাঙ্গ বিষনীল বিনিদ্র? তারা আউআউ রক্তবমি করতে করতে মচকে মরবে? আমার বিকৃত চোখের হাওয়া লেগে আমার সন্ততির মুখ পেঁচিয়ে উঠবে দুঃস্বপ্নের মতো, আমার কলজের ছাইধোঁয়ায় হাঁ করে হেঁচকি তুলতে তুলতে সে কুঁকড়ে কেন্নোর মতো গুটিয়ে হাপর টেনে গ্যাঁজলা তুলবে?

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: কেন চেয়ে আছ

আমাদের এই অপুষ্পক শুখা হৃদয়, এই খসখসে লোভের আঙুল। আমাদের এই স্ব-হন্তারক অদূরদর্শী প্লেজার প্রিন্সিপ্‌ল। তবু তাঁর কী বিরতিরহিত প্রেম! কী গাঢ় অবগাহী! কী উথল ক্ষমা! হ্যাঁ অপার ক্ষমা। আবারও ক্ষমা। কিন্তু কত দিন? ক’কোটি বছর? শেষ আছে। সবের শেষ। শেষের সে দিন আঁধার গভীর, আর্তনাদ অসহ। আমরা কি এখনই সহসা আনমনে দেখব না তাঁর লতানে সজল চুল, তাঁর স্তনে জুঁইফুলের ঘ্রাণ কি আমাদের কাছে ভাসিত হয়ে উঠবে না রাতুল করতলের মতন? আমরা কি বুঝব না আমাদেরই ললিত সুচারু প্রেমে আবার বিছাবে নক্ষত্রবীথি, আবার আসবে লাবণ্যের বহতা প্রহর? নিরাময়, ত্রাণ? প্রতি প্রভাতে তিনি চোখ খুলে ভাবেন, আজ সেই দিন। ও বুঝবে। ওর আঙুলে আজ সেই জলছাপ ঘিরে নেবে আমাদের দিন। কিন্তু ফের রাত হয়। কর্কশ। অবসন্ন সন্ধ্যার মতো ধোঁয়াটে মন নিয়ে আমরা অঙ্কুশের ধার পরীক্ষা করি। বন্ধ করে দিই জানলা। পাল্লাগুলি পড়ে দুম দুম। বিছনা থেকে তুলে ওর মুখে গুঁজে দিই মোটা চাদর। মণিবন্ধ ধরে নিয়ে যাই আঘাতের ঘরে। সে চলে। টলে ও চলে। আর পারে না। চোখ চেপে বুজে ভাবে, সে তো চেয়েছিল, প্রাণপাত চেয়েছিল, দোঁহে মিলে রচে নিতে আলোঝর তিথি? আর পারে না। তার ব্যাকুল অধর শিথিল হয়ে আসে। তার পদতলে, হ্যাঁ, দেখা দিতে শুরু করেছে কাঁকর। তার চোখের কালোর ভেতরে, হ্যাঁ, দেওয়ালে বহু দিনের ছবি সরিয়ে নেওয়ার পর শূন্যতার মধ্যে আরও চৌকো শূন্যতার মতো, জল পুড়িয়ে নেমে আসে ভারী, কালো, খরখরে নুন। মরো।

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৩ রবিবার ৪ জুন ২০০৬

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up