Topic: গরমের আম-মজলিসে_সৌম্যেন্দু সামন্ত_FRUIT OF THE SUMMER, MANGO

গরমের আম-মজলিসে
সৌম্যেন্দু সামন্ত

আম মোটামুটি ভাবে গ্রীষ্মেরই ফল, সেহেতু এই ঋতুতেই ভোজনরসিকের আম-ভোজনের চর্চা ও সুযোগটা কিন্তু অনেক বেশি। অথচ সংখ্যায় অল্প হলেও ‘বারমেসে আম’-এর গাছও দেখতে পাওয়া যায় কোথাও কোথাও।

প্রাচীনকালে তো বটেই, পরবর্তিকালে বাংলার সুলতানরাও ‘ফলের রাজা আম’-এর অবিচ্ছিন্ন নেশায় অত্যন্ত আসক্ত হয়েছিলেন।

mango

আম কিন্তু বাংলার নিজস্ব ফল নয়। এর আদিনিবাস দক্ষিণ এশিয়াতে। আমাদের বাংলায় আম এসেছে পরবর্তী সময়ে অনেক আগন্তুক ফল ফুল বৃক্ষের মতোই। অবশ্য পুরাণের উল্লেখমতো, পবনপুত্র বীর হনুমানের দাক্ষিণ্যেই নাকি এই আম গাছ শ্রীলঙ্কা থেকে ভারতে এসে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে, সে ভাবেই এই বাংলার পথে-প্রান্তরেও...। তা যেভাবেই আসুক না কেন বা যখনই আসুক না কেন, বাঙালির খাদ্য তালিকায় আম যে এক পাকা আসন করে নিতে পেরেছে, সে-বিষয়ে সন্দেহ বা সংশয়ের এতটুকু অবকাশ নেই আজ। একটা কথা, আমের ফলন কিন্তু সেখানেই ভাল হয়, যেখানে বৃষ্টির পরিমাণ সাধারণ, যেখানে মাটিতে জল জমে না এবং বালির ভাগ অপেক্ষাকৃত কম।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: গরমের আম-মজলিসে_সৌম্যেন্দু সামন্ত_FRUIT OF THE SUMMER, MANGO

ভারতে আমের ইতিহাসটা এই রকম: খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ সালে সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলে আলেকজাণ্ডারেরই প্রথম চোখে পড়ে আমের বাগান। পরে ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে চিনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ আমের স্বাদ ও সুগন্ধের মজা পেয়ে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তারপর ভারত থেকে বিদেশে আম-রফতানির বিশেষ ভূমিকায় দেখা যায় ফরাসি, ইংরেজ ও পর্তুগিজদেরও। এ ভাবেও ভারত থেকে আম ছড়িয়ে পড়ে দেশে-বিদেশে। শুধু ভারত নয়, এখন ব্রাজিল, অষ্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো, মায়ানমার, মিশর, ফিলিপিন্স প্রভৃতি দেশেও আম উৎপন্ন হয়। তবে ভারতে যে-পরিমাণে সুস্বাদু ও ভাল জাতের রকমারি আম পাওয়া যায়, পৃথিবীর অন্য কোথাও তেমন সন্ধান মেলে না। আর ঠিক এ জন্যই ভারত থেকে ফি-বছর প্রচুর পরিমাণে আম বিদেশে রফতানি হয় এবং এর থেকে উপার্জন হয় বিদেশি মুদ্রাও। এ ব্যাপারে পশ্চিমবাংলার মালদার আমের সুখ্যাতি আবার বিশেষ রকমের।

এমনিতেই আমের হাজার পাঁচেক প্রজাতি রয়েছে! তাই অঙ্কের হিসাবেও এর দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে হাজার পাঁচেক নামও! আবার সেই সব নামের পেছনে রয়েছে নানান কিংবদন্তী, নানান প্রাসঙ্গিক ঘটনা, নানান দৃষ্টান্ত! ঐতিহাসিক আবুল ফজল বাদশা আকবরকে বাংলা মুলুকের যে বিশেষ জাতের আমটি খাইয়ে মোহিত করে দিয়েছিলেন, পরবর্তিকালে সেটাই নাকি আমজনতার কাছে ‘ফজলি আম’-এর স্বীকৃতি পেয়েছে। ইতিহাস বলে যে, সম্রাট আকবর বিহারের দ্বারভাঙা অঞ্চলে বিখ্যাত ‘লালবাগ’ বা এক লক্ষ আমগাছের বাগান তৈরি করেছিলেন। এ ছাড়া আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ বইয়েও সে-যুগের আম সম্পর্কে অনেক বিবরণ পাওয়া যায়।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: গরমের আম-মজলিসে_সৌম্যেন্দু সামন্ত_FRUIT OF THE SUMMER, MANGO

জনৈক গৌড় সুলতানের প্রিয় বেগমের স্মৃতি নাকি বহন করে চলেছে ‘বেগমফুলি’। ‘ল্যাংড়া’ আমের পেছনে রয়েছে নাকি কাশীর এক ‘ল্যাংড়া’ ফকিরের লোককাহিনি। এখানে জানিয়ে রাখি, সব রকম আমের মধ্যে ল্যাংড়া আমই কিন্তু শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত। অবশ্য ল্যাংড়া আমেরও নানা রকম জাত আছে। তবে বেনারসি ল্যাংড়া আমই কিন্তু সব চেয়ে উৎকৃষ্ট জাতের। ‘গোপাল’ নামে এক ধোপার তৈরি বিশেষ প্রজাতির আম থেকেই নাকি ‘গোপালের ধোপা’ আমের সৃষ্টি।

এখানে বোঝা গেল, শুধু রাজা-বাদশা বা সুলতানের নামের সঙ্গে মিলিয়ে কিংবা তাঁদের ইচ্ছে থেকেই নতুন আমের নামকরণ হয়নি। সাধারণ শ্রেণীর মানুষের নামও জড়িয়ে আছে অনেক আমের সঙ্গে।

mango

আমকে সংস্কৃততে বলে সহকার, চূত, কল্মবৃক্ষ, আম্র ইত্যাদি। বাংলার আম অবশ্য ‘আম্র’ কথাটি থেকেই পাওয়া। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই ফলেরই নাম ‘ম্যাঙ্গিফেরা ইণ্ডিকা’। আর ইংরেজি ‘ম্যাঙ্গো’ নামের উৎপত্তি তো তামিলের ‘ম্যাঙ্গাই’ থেকে। ওড়িশা, কর্নাটক, কেরল, অন্ধ্র প্রভৃতি অঞ্চলে এই আমই চিহ্নিত আম্ব, মাভু, মামিদি ইত্যাদি নামে।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: গরমের আম-মজলিসে_সৌম্যেন্দু সামন্ত_FRUIT OF THE SUMMER, MANGO

তোতাপুরি, হিমসাগর, বেনারসি, বোম্বাই, চৌসা, কিষাণভোগ, বালসার, রত্নগিরি, কেশরি, লক্ষ্মণভোগ, পেয়ারাফুলি, আলিবাগ, রানিপসন্দ, সফেদা, দসেরা, সিন্ধুরিয়া, জাহাঙ্গীর, আলফানসো, সিরাজদৌল্লা, জাফরান, গোলাপখাস—এ রকম আরও কত কত সব মজাদার নামের গর্ব ও গন্ধ নিয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে বাংলার ও বাঙালির ভীষণ আদরের আম।

প্রাচীন সাহিত্যে আমের পরিচিতি রসাল, রাজকীয়, মধুদূত, কোকিল বধূ ইত্যাদি নামে। এ দেশের সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, লোককথা—প্রায় সব কিছুতেই আমের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি আমরা টের পাই। শুধু রামায়ণ, মহাভারত বা বৈদিক গ্রন্থ ইত্যাদিতেই নয়, চিনা পর্যটক ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাঙ, ইবন বতুতার ভ্রমণ কাহিনিতেও আম জায়গা করে নিয়েছে স্বচ্ছন্দে ও সমমর্যাদায়।

এই আম কাঁচা অথবা পাকা—যাই হোক না কেন, আমাদের শরীরের পক্ষেও বিশেষ উপকারি। কাঁচা আমে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও জলীয় পদার্থ কেবলই নয়, লোহা ও অন্যান্য খনিজ পদার্থও যথেষ্ট থাকে। প্রচণ্ড গরমে কেউ অসুস্থ হলে তাকে কাঁচা আমের সরবৎ খাওয়ানো বা কাঁচা আমের প্রলেপ দেওয়া হয়। আর পাকা আমে থাকে আর একটু বেশি পরিমাণে প্রোটিন, জলীয় পদার্থ এবং যথেষ্ট পরিমাণে লোহা ও ক্যালসিয়াম। ভিটামিন ‘এ’ এবং ‘সি’ অনেক বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় আম থেকে।

আমের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে প্লীহা, বাত ও ক্ষয়রোগের উপশম হয়। আবার আমের আঁটির শাঁসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে বন্ধ হয় ‘উদ্গার’ বা ‘বমি’। আম থেকে তৈরি ‘আমচুর’ দারুণ উপকারি ছোটদের আমাশয় রোগে। সবার উপরে তো রয়েছেই বাঙালির এক মুখরোচক—‘আমসত্ত্ব’, আমের এক মহার্ঘ্য রূপ।

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৯ আষাঢ় ১৪০৯ রবিবার ১৪ জুলাই ২০০২

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up