Topic: সন্ন্যাসী রাজা_A PRINCELY IMPOSTOR? HISTORY OF THE KUMAR OF BHAWAL
রাজকীয় প্রতারক
পার্থ চট্টোপাধ্যায়
২০ এপ্রিল, ভাওয়ালের রাজপরিবারের মেজকুমার দার্জিলিঙে পৌঁছলেন।
৬ মে, মেজকুমার অসুস্থ।
৭ মে, মেজকুমারের মৃত্যু।
১৮ মে, শ্মশানে সৎকার।
বারো বছর বাদে ঢাকায় সন্ন্যাসীর আবির্ভাব।
ঘটনাচক্র: মৃত্যু
ব্রিটিশ আমলের ঢাকা জেলা। জেলার সবচেয়ে বড় জমিদারি ঢাকার নবাব বাহাদুরের এস্টেট। তার পর ভাওয়াল এস্টেট। ভাওয়ালের জমিদার বাড়ি হল জয়দেবপুরে। যে আমলের কথা বলছি, তখনকার জয়দেবপুরকে গ্রামই বলা যায়। এখন অবশ্য জয়দেবপুর ঢাকার উত্তর দিকের শহরতলির অংশ হয়ে গিয়েছে প্রায়। জয়দেবপুর এখন বাংলাদেশের গাজিপুর জেলার সদর। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে জয়দেবপুর ছিল ভাওয়াল এস্টেটের কেন্দ্রস্থল— রাজবাড়ি, কাছাড়ি, হাইস্কুল, সবই ছিল জয়দেবপুরে। আগেই বলেছি, ভাওয়াল বেশ বড়সড় জমিদারি। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় সরকারের ট্রেজারিতে খাজনা জমা পড়ত বছরে সাড়ে ছ’লাখ টাকা।
১৯০৯ সালে, যখন এই কাহিনির সূত্রপাত, তখন এস্টেটের মালিক ভাওয়াল রাজপরিবারে তিন ভাই। বড়কুমারের বয়স সাতাশ, মেজর পঁচিশ আর ছোটর বাইশ। তিন কুমারই তখন বিবাহিত, তিন রানি রাজবাড়িতেই থাকেন। কুমারদের তিন বিবাহিতা বোনও সে সময়ে তাঁদের স্বামী আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে রাজবাড়িতেই ছিলেন।

মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী
১৯০৯ সালের ১৮ এপ্রিল মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ জয়দেবপুর থেকে ট্রেনে দার্জিলিং রওনা হয়ে সেখানে পৌঁছন ২০ এপ্রিল। সঙ্গে ছিলেন তাঁর পত্নী বিভাবতী, বিভাবতীর দাদা সত্যেন্দ্র আর একুশ জন পরিচারকের একটি দল। পারিবারিক চিকিৎসক আশুতোষ দাশগুপ্ত ছিলেন সেই দলে। দার্জিলিং যাত্রার কারণ ছিল রমেন্দ্রর স্বাস্থ্য। আসলে বছর তিনেক আগে ধরা পড়েছিল যে রমেন্দ্রর সিফিলিস রোগ হয়েছে। অবস্থা খারাপ হতে হতে শেষ পর্যন্ত হাতেপায়ে আলসারের মতো বড় বড় ঘা দেখা দেয়। গ্রীষ্মে পাহাড়ি দেশের ঠাণ্ডায় তিনি কিছুটা ভাল থাকবেন এই মনে করে দার্জিলিং ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ-কারণে তাঁর শ্যালক সত্যেন্দ্র কয়েক মাস আগেই দার্জিলিং এসে তাঁদের থাকার জন্য একটা বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন।
দলে বিভাবতী ছাড়া আর কোনও মহিলা ছিলেন না। ঘটনাটা কিছুটা আশ্চর্যের। ভাওয়াল রাজপরিবারের মতো রক্ষণশীল বাড়িতে বিভাবতীর মতো প্রায় সদ্য বিবাহিতা বধূ তাঁর স্বামীর সঙ্গে একা বিদেশভ্রমণে যাচ্ছেন, এ প্রায় অভাবনীয়। পরে যখন এই নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তখন জানা যায় যে, সত্যেন্দ্র বলেছিলেন, দার্জিলিংয়ের বাড়িটি ছোট, বেশি লোক নিয়ে যাওয়া যাবে না, তাই বিভাবতীর সঙ্গে পরিবারের আর কোনও মহিলা যাননি।
দার্জিলিং সফরের প্রথম কয়দিন নির্বিঘ্নেই কাটে। হঠাৎ ৬ মে মেজকুমার অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরদিন জয়দেবপুর রাজবাড়িতে টেলিগ্রাম আসে, তাতে মেজকুমারের দলের এক কর্মচারী লিখছেন যে, মেজকুমারের জ্বর হয়েছে। তার পরদিন সকালে আর একটা টেলিগ্রামে জানা যায় যে, তাঁর অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু, সন্ধের টেলিগ্রামে মারাত্মক খবর এল: ‘কুমার অত্যন্ত অসুস্থ। ঘন ঘন দাস্ত হচ্ছে। কাম শার্প’।
পরদিন ভোরে ছোটকুমার রবীন্দ্র দার্জিলিংয়ের ট্রেন ধরতে জয়দেবপুর স্টেশনে যাচ্ছেন, এমন সময়ে ডাকপিওন তাঁর গাড়ি থামিয়ে তাঁকে একটা টেলিগ্রাম দিল। তাতে লেখা, মেজকুমার মারা গিয়েছেন। তিন দিন পর দার্জিলিংয়ের যাত্রীরা জয়দেবপুর ফিরে এলেন, তাঁদের সঙ্গে সদ্যবিধবা বিভাবতী।
১৮ মে, মৃত্যুর এগারো দিন পর, মেজকুমারের শ্রাদ্ধশান্তি অনুষ্ঠিত হল স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে। তবু তাঁর মৃত্যু আর সৎকার নিয়ে নানা রকম কানাঘুষো শোনা যেতে লাগল। শরিফ খাঁ নামে এক আরদালি মেজকুমারের দলের সঙ্গে দার্জিলিং গিয়েছিলেন। তিনি নাকি অনেককে বলেন যে, মেজকুমার যখন অসুস্থ, তখন তাঁকে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে সরিয়ে আনতে হয়। শরিফ খাঁ বিছানা সরাতে সাহায্য করছিলেন, এমন সময় মেজকুমার হঠাৎ বমি করেন। সে বমি নাকি এমনই বিষাক্ত ছিল যে, কয়েক ফোঁটা শরিফ খাঁর জামায় পড়াতে জামা ফুটো হয়ে যায়। আর একটা গুজবও ছড়াতে শুরু করে যে, মেজকুমারের দেহ সৎকারের জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলেও সৎকার হয়নি।
ভাওয়াল রাজপরিবারের লোকেরা তখন এসব গুজবকে আদৌ আমল দিয়েছিলেন কি না, বলা শক্ত। মেজকুমারের আকস্মিক মৃত্যুতে জয়দেবপুরবাসী বিস্ময়ে আর শোকে রীতিমত হতবাক হয়ে গিয়েছিল, সেটাই বরং বেশি সত্য। তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয় কোনও রকম জাঁকজমক ছাড়াই, নেহাতই যেন নিয়মরক্ষার জন্য। রাজবাড়ির শ্রাদ্ধ বলতে যে আড়ম্বর বোঝায়, তার কিছুই করা হয়নি।
শ্রাদ্ধের ক’দিন পর থেকেই রানি বিভাবতীর দাদা সত্যেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ভাওয়াল এস্টেটের সম্পত্তিতে তাঁর বোনের অংশ সুরক্ষিত রাখার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। শোনা যায়, বিভাবতীকে একটা মাসোহারা দিয়ে সম্পত্তি থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছিল। তা শুনে সত্যেন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় ছুটলেন উকিলের পরামর্শ নিতে। প্রস্তাবটি অবশ্য বেশি দূর এগোয়নি। পরে শোনা যায়, শালাবাবু সত্যেন্দ্র বড় বেশি এস্টেটের ব্যাপারে নাক গলাচ্ছিলেন, তাই তাঁকে ঠেকাতেই এই প্রস্তাব তোলা হয়। সত্যেন্দ্র ঢাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে তাঁর স্ত্রী আর মাকে কলকাতা থেকে নিয়ে এলেন। জয়দেবপুর রাজবাড়ির লোকেরা নিশ্চয়ই বোনের ব্যাপারে তাঁর ঘন ঘন হস্তক্ষেপ ভাল চোখে দেখছিলেন না। সত্যেন্দ্র এবার বিভাবতীকে রাজবাড়ি ছেড়ে চলে আসার জন্য বোঝাতে লাগলেন। প্রথমে কিছু দিন বিভাবতী রাজি হননি। কিন্তু ক্রমে তিনি মত পাল্টাতে লাগলেন। ১৯০৯ সালের নভেম্বর মাসে তিনি আমমোক্তারনামা লিখে সত্যেন্দ্রকে তাঁর এজেন্ট নিযুক্ত করলেন। সেই সঙ্গে মেজকুমারের নামে যে তিরিশ হাজার টাকার জীবনবিমা এস্টেট থেকে করানো হয়েছিল, সেই টাকাও দাবি করলেন।
ভাওয়াল রাজবাড়ির ওপর হঠাৎ যেন বিপর্যয়ের কালো মেঘ ঘনিয়ে এল। ১৯১০ সালে সেপ্টেম্বর মাসে বড়কুমার রণেন্দ্রনারায়ণ মারা গেলেন। ক’ মাস বাদেই ১৯১১-র এপ্রিলে এস্টেটের ম্যানেজার নিডহ্যাম সাহেব কলকাতায় মেজরানি বিভাবতীকে জানালেন যে, তাঁর অংশের সম্পত্তি কোর্ট অব ওয়ার্ডস অধিগ্রহণ করছে। ব্রিটিশ আমলে কোর্ট অব ওয়ার্ডস ছিল একটি সরকারি দফতর যা মালিকহীন জমিদারির তত্ত্বাবধান করত। জমিদারির মালিক নাবালক হলে অথবা জমিদারি পরিচালনায় অক্ষম হলে সেসব এস্টেট কোর্ট অব ওয়ার্ডস-এর আওতায় চলে আসত। ওই বছর মে মাসে সরকার ছোটকুমার রবীন্দ্রনারায়ণকেও জমিদারি পরিচালনায় অনুপযুক্ত ঘোষণা করে তাঁর অংশটুকু কোর্ট অব ওয়ার্ডসকে দিয়ে দিল। এক বছর বাদে বড় রানি সরযূবালার অংশটিও সরকারের আওতায় চলে এলে গোটা জমিদারিটাই কোর্ট অব ওয়ার্ডস-এর অধীন হল। ১৯১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ছোটকুমারও অল্প কয়েক দিন রোগভোগের পর মারা গেলেন। হঠাৎ দেখা গেল, ঢাকার এক প্রধান জমিদারবাড়ি ভাওয়াল রাজপরিবারের সদস্য বলতে বাকি রয়েছেন কেবল তিন নিঃসন্তান বিধবা রানি যাঁদের কারও সম্পত্তিই আর তাঁদের দখলে নেই। স্বামীর মৃত্যুর অল্পদিন বাদে ছোটরানি আনন্দকুমারীও জয়দেবপুর রাজবাড়ি ছেড়ে ঢাকা চলে গেলেন। ছ’বছর বাদে তিনি এক দত্তকপুত্র নেন।
এদিকে রমেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যুর পর থেকে বেশ কয়েক বছর ধরে নানা রকম গুজব রটতে থাকে। আগেই শোনা গিয়েছিল যে, তাঁর দেহ নাকি ঠিকমত সৎকার হয়নি। এবার শোনা যেতে লাগল যে, তিনি নাকি জীবিত আছেন এবং সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করছেন। জয়দেবপুর রাজবাড়িতে অনেক সাধুসন্ন্যাসীর আনাগোনা ছিল। মেজকুমারের মারা যাওয়ার গল্প শুনে তেমন এক সন্ন্যাসী নাকি বলেন যে, তিনি এক বাঙালি উঁচুঘরের সন্তানকে একদল সাধুর সঙ্গে ঘুরতে দেখেছেন। সেই সাধুরা নাকি তাঁকে দার্জিলিংয়ে খুঁজে পায়। এসব গুজব শুনে ভাওয়াল রাজবাড়ি থেকে উত্তর ভারতে লোক পাঠানো হল এ ব্যাপারে ভাল করে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। কুমারদের এক বোন জ্যোতির্ময়ীদেবী খুব ধর্মপ্রাণ ছিলেন, মাঝে মাঝেই কাশী যেতেন। তিনি পরে জানান যে, কাশীতে সাধুসন্ন্যাসীদের কাছে খোঁজ নিয়ে তাঁর স্থির বিশ্বাস জন্মেছিল যে, মেজকুমার বেঁচে আছেন।
১৯১৭ সাল নাগাদ গুজবের স্রোত নিশ্চয় বেশ প্রবল হয়ে ওঠে, কারণ কুমারদের বৃদ্ধা ঠাকুরমা রানি সত্যভামা হঠাৎ বর্ধমানের মহারাজার কাছে চিঠি লিখে জানতে চাইলেন যে, তাঁর মেজ নাতির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন কি না। সত্যভামা লিখলেন যে, উত্তর আর পূর্ব-ভারতের নানা জায়গা থেকে ক্রমাগত খবর আসছে যে, ভাওয়ালের মেজ কুমারকে নাকি এক দল সাধুর সঙ্গে ঘুরতে দেখা গিয়েছে। রমেন্দ্রর মৃত্যুর সময় বর্ধমানের মহারাজা দার্জিলিংয়েই ছিলেন। তিনি কি এ বিষয়ে কিছু জানেন? উত্তরে মহারাজা বিজয়চাঁদ জানালেন যে, মেজকুমারের মৃত্যুর কথা তাঁর মনে আছে। দার্জিলিংয়ে থাকার সময় এক দিন তিনি খবর পান যে, ভাওয়ালের মেজকুমার মারা গিয়েছেন। শুনে তিনি সৎকারের কাজে ব্যবহারের জন্য গঙ্গাজল আর তুলসিপাতা লোক মারফত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এর বেশি তাঁর কিছু জানা নেই।
মেজকুমারকে নিয়ে রটনা কিন্তু চলতেই লাগল। মাঝেমাঝেই শোনা যেত যে, তাঁকে নাকি অমুক জায়গায় দেখা গিয়েছে সাধুসন্তদের দলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বহু কাল পর কলকাতা হাইকোর্টের জজ লজ সাহেব মন্তব্য করেছিলেন যে, এত সব রটনা জল্পনা থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে, ভাওয়ালের লোক মেজকুমারের জীবিত থাকার গল্পটা বিশ্বাস করতে খুবই উদগ্রীব ছিল। কেউ যদি হঠাৎ উদয় হয়ে বলত যে, আমি সেই রমেন্দ্রনারায়ণ, লোকে সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে মেনে নিত। কোনও চক্রান্তকারীর মাথায় জাল মেজকুমারকে খাড়া করার মতলব এসে থাকলে, সে এ সব রটনা থেকে অন্তত এটুকু বুঝেছিল যে, খানিকটা চেহারায় সাদৃশ্য আনতে পারলেই তার কার্যসিদ্ধি হতে পারে।
কে এই সন্ন্যাসী?
ঢাকা শহরে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর বাকল্যাণ্ড বাঁধ এক কালে অত্যন্ত মনোরম জায়গায় ছিল। সারি সারি গাছ, দু’পাশে বাগান, মাঝেমাঝে বসার জন্য বেঞ্চ। সাহেবসুবোরা মর্নিংওয়াকে আসতেন এখানে। আজ অবশ্য বাকল্যাণ্ড বাঁধ সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাওয়ার পথ, ঢাকার সব চেয়ে ঘিঞ্জি আর নোংরা রাস্তার মধ্যে একটা। দু’পাশে এখন বাজার, কাদা আর আবর্জনার উপর দিয়ে ক্রমাগত সাইকেল রিকশার স্রোত বয়ে চলেছে। নদী দেখা যায় না— রাস্তার ধারে বিরাট পাঁচিল তুলে দেওয়া হয়েছে, নদীর পাড়ে বেদখলকারীদের বসতি বসে যাবে এই ভয়ে। ঢাকার পুরনো অধিবাসীদের অনেকের কিন্তু বাকল্যাণ্ড বাঁধে বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতি মনে আছে।
১৯২১ সালের জানুয়ারি মাস নাগাদ বাকল্যাণ্ড বাঁধে এক সাধুর আবির্ভাব হয়। জটাধারী সন্ন্যাসীর সর্বাঙ্গে ছাই মাখা, পরনে কৌপীন। ব্যবসায়ী রূপলাল দাসের অট্টালিকা ঢাকা শহরের এক দ্রষ্টব্যস্থান। আজও হৃত জৌলুসের মলিন স্মৃতি বহন করে সংরক্ষিত ভবন হিসাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে রূপলাল হাউস। সেই রূপবাবুর বাড়ির সামনে আস্তানা গাড়লেন সন্ন্যাসী। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি দিনরাত সেখানে বসে থাকতেন। তাঁর চেহারার জন্যই সন্ন্যাসী অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। অনেকদিন পর আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময়ে একজন যেমন বলেন, ‘‘এমন সুন্দর গৌরবর্ণ, সম্ভ্রান্ত চেহারার জটাধারী সন্ন্যাসী ঢাকায় আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না।’’ প্রায়ই সাধুকে ঘিরে ছোটখাটো ভিড় জমে যেত। লোকে তাঁকে নানা প্রশ্ন করত— ‘কোত্থেকে এসেছ? তাবিজটাবিজ দাও নাকি?’ ইত্যাদি। সাধু বিশেষ উত্তর দিতেন না। দিলে উত্তর দিতেন হিন্দিতে। পরে শোনা যায়, সাধু নাকি বলতেন যে, তিনি পঞ্জাবের লোক, ছোটবেলায় ঘরবাড়ি ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়েছেন। বাংলার জল-হাওয়া তাঁর একেবারে পছন্দ হচ্ছে না। ওষুধ চাইলে তিনি মাদুলি তাবিজের বদলে তাঁর গায়ের ছাই এক চিমটে তুলে দিতেন।
এরই মধ্যে কোনও এক সময়ে গুজব চালু হয়ে যায় যে, ভাওয়ালের মেজকুমার সন্ন্যাসী হয়ে ঢাকায় ফিরে এসেছেন। হঠাৎ দেখা গেল, দূরদূরান্ত থেকে লোক সাধুকে দেখার জন্য বুড়িগঙ্গার ধারে রূপবাবুর বাড়ির সামনে ভিড় করতে শুরু করেছে। বেশির ভাগ সময়ে সন্ন্যাসী লোকের কথায় কোনও সাড়া দিতেন না। বেশি রকম উত্ত্যক্ত করলে তিনি হিন্দিতে বলতেন যে, তিনি সংসারত্যাগী, ঘরবাড়ি আত্মীয়স্বজন কিছু নেই। অনেকেই ‘যত সব বাজে গুজব’ বলে ফিরে চলে যেত। কেউ কেউ আবার বলত ‘লোকটা ঠগ’, যদিও সাধু নিজের পূর্বপরিচয় নিয়ে কোনও রকম দাবি করেননি। তবু সেই শীতকালের মরা রোদে বুড়িগঙ্গার পাড়ে সন্ন্যাসীকে ঘিরে থাকা ভিড়ের ভেতর থেকে গুঞ্জন শোনা যেতে লাগল, ‘হ্যাঁ, এই তো মেজকুমার! ভাওয়ালের মেজকুমার স্বয়ং!’ সাধুর ঢাকায় আসার প্রায় চার মাস বাদে ভাওয়াল রাজপরিবার থেকে প্রথম তাঁকে দেখতে যায় কুমারদের দিদি জ্যোতির্ময়ীর ছেলে বুদ্ধু।
জয়দেবপুরের পাশের গ্রাম কাশিমপুরের কয়েকজন ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে বুদ্ধু সন্ন্যাসীকে দেখে আসার পরও কিন্তু নিশ্চিত ভাবে কিছু বলতে পারল না। সন্ন্যাসীর সঙ্গে মেজকুমারের চেহারার মিল আছে ঠিকই। কিন্তু এই সাধুই যে তাঁর মেজমামা, মৃত্যুর দ্বার থেকে জীবন্ত ফিরে এসেছেন, এমন কথা বুদ্ধু জোর গলায় বলতে পারল না। কাশিমপুরের সঙ্গীরা তখন স্থির করলেন যে, সন্ন্যাসীকে একবার সশরীরে জয়দেবপুর নিয়ে আসতে হবে।
১৯২১ সালের ৫ এপ্রিল কাশিমপুরের অতুলপ্রসাদ রায়চৌধুরী সন্ন্যাসীকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে এলেন। অতুলবাবু মেজকুমারকে খুব ভাল রকম চিনতেন। ভাওয়াল আর কাশিমপুর, দুই জমিদার বাড়ির মধ্যে বিশেষ ঘনিষ্ঠতাও ছিল। পরে অবশ্য বলা হয় যে, সন্ন্যাসীকে আদৌ ভাওয়ালের মেজকুমার সন্দেহ করে কাশিমপুর নিয়ে যাওয়া হয়নি। নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কারণ, ওই বাড়ির কর্তা সারদাপ্রসাদের কোনও পুত্রসন্তান ছিল না, তাই সন্ন্যাসীকে দিয়ে পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করানোর চেষ্টা হচ্ছিল। সন্ন্যাসী অবশ্য সরাসরি বলে দেন যে, তিনি যজ্ঞটজ্ঞ কিছু জানেন না। তবু প্রায় দিন সাতেক সন্ন্যাসী কাশিমপুরে এক গাছতলায় আশ্রয় নেন। ১২ এপ্রিল বিকেলে সন্ন্যাসীকে হাতির পিঠে চড়িয়ে জয়দেবপুর নিয়ে আসা হয়।
সন্ধে ছটা নাগাদ হাতি সোজা এসে থামল রাজবাড়িতে। সন্ন্যাসী হাতির পিঠ থেকে নেমে ধীরে এগিয়ে গেলেন রাজবাড়ির অতিথিশালা মাধববাড়ির দিকে। সেখানে একটা কামিনী গাছের তলায় গিয়ে বসলেন। কুমারদের তিন বোনই ততদিন রাজবাড়ি ছেড়ে জয়দেবপুরে অন্যত্র বাড়ি করে চলে গেছেন। আশি বছরের বৃদ্ধা রানি সত্যভামাও তখন তাঁর এক নাতনির সঙ্গে ছিলেন। সেদিন সন্ধেবেলা সন্ন্যাসীকে চাক্ষুষ দেখতে আসেন রাজবাড়ির কিছু কর্মচারী আর দূরসম্পর্কের আত্মীয়। তাঁদের একজন— সত্যভামার ভাইপো রাধিকা গোস্বামী— পরে বলেছিলেন যে, তিনি বিশেষ করে কৌপীনধারী সাধুর হাত-পায়ের গড়ন লক্ষ করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ইনি মেজকুমার কি না, নিশ্চিত হতে পারেননি।
পরদিন সকালে ভাওয়াল স্টেটের সেক্রেটারি রায়সাহেব যোগেন্দ্রনাথ বাঁড়ুজ্যে আর তাঁর ছোট ভাই সাগর সন্ন্যাসীকে দেখতে এলেন। এঁরা এসে দেখেন সন্ন্যাসী রাজবিলাস নামে বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় বসে আছেন। সাগরবাবু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সন্ন্যাসীকে দেখতে লাগলেন। ‘আমরা ওঁর মুখোমুখি দাঁড়াতে উনি আমাদের দিকে তাকালেন। আমি ওঁর চোখের মণির রং দেখতে পেলাম। চোখ কটা। আমি ওঁর গড়নপেটন, ওঁর বসার, তাকাবার ভঙ্গি, ওঁর চেহারা, খুব ভাল করে লক্ষ করতে লাগলাম। ওঁকে মেজকুমার বলেই সন্দেহ হল। আমি যোগেনবাবুকে যা ভাবছিলাম তা বললাম। উনি বললেন, ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুতর। উনি বললেন হইচই কোরো না। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ওঁকে দেখা যাক। কিছুক্ষণ বাদে বুদ্ধু এসে জানাল যে, তাঁর মা সন্ন্যাসীকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে যেতে বলেছেন। জিজ্ঞাসা করাতে সন্ন্যাসী বললেন যে, তিনি দুপুরে সেখানে যাবেন।’’
সেদিন সন্ধেবেলা জ্যোতির্ময়ীদেবী প্রথম সন্ন্যাসীকে দেখলেন তাঁর বাড়িতে। সন্ন্যাসী কিছুক্ষণ আগেই টমটম চড়ে পৌঁছেছেন। জ্যোতির্ময়ী বারান্দায় বেরিয়ে দেখলেন সন্ন্যাসীকে আসন পেতে বসানো হয়েছে। তাঁকে ঘিরে বসে আছে পরিবারের লোকজন। সন্ন্যাসী মাথা নিচু করে আড়চোখে চারপাশ দেখছিলেন। ‘‘তাই দেখে আমার মেজর কথা মনে পড়ল। ও যেমন ভাবে লোকজনের দিকে তাকাত। আমার বেশ সন্দেহ হল। আমি ভাল করে লক্ষ করতে লাগলাম ওঁর চেহারা, মুখের আদল, চোখ, কান, ঠোঁট, গড়ন, হাত পা।’’ জ্যোতির্ময়ী সন্ন্যাসীকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তিনি কতদিন থাকবেন। সন্ন্যাসী জবাব দিলেন যে, পরদিনই তিনি নাঙ্গলবাঁধ যাবেন ব্রহ্মপুত্র স্নানে। জ্যোতির্ময়ী তাঁকে কিছু ফল আর ক্ষীর খেতে দিলেন। সন্ন্যাসী ক্ষীরটুকু খেলেন। তার পর চলে গেলেন। ‘‘আমি ওঁর চলনটা লক্ষ করলাম। ঠিক যেন মেজকুমারের মতো। ঠিক একই রকম লম্বা। তবে ওকে আরও মোটাসোটা লাগল। সামান্য মোটা।’’ সন্ন্যাসী চলে যাওয়ার পর সকলে তাঁকে নিয়ে আলোচনা করতে লাগল। ঠিক হল, পরদিন তাঁকে নিমন্ত্রণ করে খেতে বলা হবে। তখন দিনের আলোয় তাঁকে ভাল করে পরীক্ষা করে দেখা যাবে।
পরদিন সকালে সাধুকে রাজবিলাসের বারান্দায় পায়চারি করতে দেখা গেল। এই রাজবিলাস নামে বাড়িটিতেই রাজপরিবারের লোকেরা থাকতেন। সাধু মেজকুমারের ঘরের খড়খড়ি ফাঁক করে ভেতরে উঁকি মেরে দেখলেন। তার পর পাশের স্নানঘরে কল খুলে হাত মুখ ধুলেন। দুপুরে এস্টেটের ঘোড়া গাড়িতে তাঁকে আবার নিয়ে যাওয়া হল জ্যোতির্ময়ীদেবীর বাড়ি। এবার তিনি সোজা বৈঠকখানায় ঢুকে চেয়ার পেতে বসলেন। কুমারদের আর এক দিদি স্বর্গতা ইন্দুময়ীর স্বামী গোবিন্দ মুখুজ্যে সামনে চৌকিতে বসলেন আর সত্যভামা ও জ্যোতির্ময়ীদেবী বসলেন চেয়ারে। জ্যোতির্ময়ী পরে বলেছিলেন, ‘‘সন্ন্যাসী আমার ঠাকুরমাকে হিন্দিতে বললেন চৌকিতে উঠে বসতে। ঠাকুরমা উঠে চৌকির একধারে বসলেন। সন্ন্যাসী তাঁকে ধরে আরও আরাম করে বসতে সাহায্য করলেন। তার পর বললেন, ‘বুড়িকা বড়া দুখ হ্যায়।’’ ‘‘এর পর জ্যোতির্ময়ীর মেয়েদের দিকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন তাঁরা কে। ইন্দুময়ীর ছেলেদেরও পরিচয় নিলেন। ‘‘আমার বোনঝি কেনিকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইয়ে কৌন হ্যায়?’ আমি বললাম, আমার দিদির মেয়ে। বলতেই সন্ন্যাসী কেঁদে ফেললেন। গাল বেয়ে চোখের জল গড়াতে লাগল। কেনি তখন বিধবা।’’ ইন্দুময়ীর ছেলে টেবু অ্যালবাম এনে সন্ন্যাসীকে মেজকুমারের ছবি দেখাল। ছবি দেখে তিনি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। জ্যোতির্ময়ী সাধুকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তিনি তো সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী, তবে কাঁদছেন কেন? সন্ন্যাসী বললেন, ‘হ্যাম মায়াসে রোতা হ্যায়।’ জ্যোতির্ময়ী জিজ্ঞাসা করলেন ‘কীসের মায়া?’ সন্ন্যাসী কোনও উত্তর দিলেন না। এরপর জ্যোতির্ময়ী মেজকুমারের মৃত্যুর গল্প বলতে শুরু করলেন। বললেন সে দার্জিলিংয়ে মারা গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর মৃতদেহ সৎকার হয়েছিল কি না তা নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। জ্যোতির্ময়ীর কথা শেষ হওয়ার আগেই সন্ন্যাসী বলে উঠলেন, ‘‘না, না, তাঁর দেহ পোড়ানো হয়নি। তিনি জীবিত আছেন।’’ জ্যোতির্ময়ী সোজা সন্ন্যাসীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘আপনার মুখ অবিকল আমার ভাইয়ের মতো, যেন কেটে বসানো। আপনিই কি সে?’’ সন্ন্যাসী বললেন, ‘‘ না, আমি আপনার কেউ হই না।’’
যাই হোক, সন্ন্যাসী সেদিন জ্যোর্তিময়ীর বাড়িতে খেয়ে যেতে রাজি হলেন। ‘‘উনি খাচ্ছিলেন, আমি ওঁকে লক্ষ করছিলাম। দেখলাম প্রতিটি গ্রাস মুখে তোলার সময় ওঁর ডান হাতের তর্জনী কেমন বেরিয়ে থাকে। জিভটাও কেমন একটু বেরিয়ে আসে। ঠিক মেজর মতো। আমি ওঁর মুখের গড়ন, কণ্ঠার ওঠানামা, ভালভাবে লক্ষ করলাম। দেখলাম ওঁর চুল লালচে, চোখ কটা। ওঁর দাঁত দেখলাম অবিকল মেজকুমারের মতো— পরিপাটি সাদা, মুক্তোর মতো। ওঁর হাত আর আঙুলের নখগুলো লক্ষ করলাম, প্রতিটি নখ আলাদা করে দেখার চেষ্টা করলাম। হাতের তেলো দেখলাম। পা, পায়ের পাতা, পায়ের আঙুলগুলো। ছোট্ট থেকে অামরা একসঙ্গে থেকেছি, বড় হয়েছি। ওঁর সারা শরীর— হাত, পা, মুখ, এমনকী চোখের পাতাও, ছাইমাখা। চুল লম্বা, মুখে দাড়ি। মেজো যখন দার্জিলিং যায়, ওর দাড়ি ছিল না। কথা বলছিলেন অস্পষ্ট ভাবে। গলার স্বর একেবারে মেজকুমারের মতো।’’
জ্যোতির্ময়ীর সন্দেহ এবার তীব্র হতে লাগল যে, এই সন্ন্যাসী তাঁর ভাই। তিনি চাইছিলেন যে, সন্ন্যাসী আর ক’দিন জয়দেবপুরে থাকুন যাতে তাঁর শরীরের দাগগুলো পরীক্ষা করানো যায়। কিন্তু সন্ন্যাসী ঢাকা ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন, কিছুতেই থাকতে রাজি হলেন না।
এর পর প্রায় দিনসাতেক সন্ন্যাসী ঢাকায় ছিলেন না। জ্যোতির্ময়ীর নির্দেশে বুদ্ধু তাঁর খোঁজ করতে গিয়ে দেখা পেল না। শোনা গেল, তিনি চট্টগ্রাম জেলার চন্দ্রনাথ তীর্থদর্শন করতে গেছেন। ১৫ এপ্রিল নাগাদ তিনি আবার বাকল্যাণ্ড বাঁধে তাঁর পুরনো জায়গায় ফিরে এলেন। সেদিন বুদ্ধু সন্ন্যাসীকে ঢাকায় তাঁদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে জ্যোতির্ময়ী তাঁর ছোট বোন তড়িন্ময়ী (ডাক নাম মটর)-কে আসতে বলেছিলেন সন্ন্যাসীকে দেখার জন্য।
৩০ এপ্রিল সন্ন্যাসীকে আবার জয়দেব পুরে জ্যোতির্ময়ীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। এবার বহু আত্মীয়স্বজন লোকজন এসে হাজির হল সন্ন্যাসীকে দেখতে। সন্ন্যাসী নদীতে স্নান করতে যাবেন, জ্যোতির্ময়ী তাঁকে অনুরোধ করলেন তিনি যেন গায়ে ছাই না মাখেন। সন্ন্যাসী শুনলেন না, সেই ছাই মেখেই ফিরলেন। দুদিন এ ভাবে গেল। তৃতীয় দিন কিন্তু সন্ন্যাসী নদী থেকে স্নান সেরে ফিরলেন ছাই না মেখে। জ্যোতির্ময়ী পরে বলেন, ‘‘আমি ওঁর গায়ের রং দেখলাম। ঠিক যেন মেজকুমারের আগেকার গৌরবর্ণ চেহারা, ব্রহ্মচর্যের দরুন আরও উজ্জ্বল হয়েছে। স্নানের পর ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল যেন অবিকল রমেন্দ্র নিজে। লক্ষ করলাম, ওঁর চোখের পাতা গায়ের রঙের তুলনায় চাপা। ঘোড়াগাড়ির চাকার আঘাতের দাগটাও দেখতে পেলাম। পায়ের পাতা আর গোড়ালির ফাটা ফাটা শুকনো কড়া পড়ে যাওয়া অংশগুলোও দেখলাম। যে সব আত্মীয়ের নাম আগে বলেছি, আমার ঠাকুরমা আর অন্য সকলেই তাঁকে দেখে চিনতে পারলেন, আমারই মতো।’’
পর দিন ৪ মে ভোরে জ্যোতির্ময়ীর নির্দেশে বুদ্ধু সন্ন্যাসীর শরীরে কী কী দাগ আছে পরীক্ষা করতে চাইল। সন্ন্যাসী রাজি হলেন। জ্যোতির্ময়ী দেখতে চাইছিলেন যে, রমেন্দ্রর শরীরে জন্মদাগ আর অন্যান্য চিহ্নগুলো সন্ন্যাসীর দেহে আছে কি না। ‘‘কারণ বুঝতে পারছিলাম, ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুতর। শতকরা একশো ভাগ নিশ্চিন্ত হওয়া দরকার, যাতে পরে মনে কোনও প্রশ্ন না ওঠে।’’ সেদিন বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির বাইরে ভিড় জমতে শুরু করল। জ্যোতির্ময়ী ঠিক করলেন, সন্ন্যাসীকে সরাসরি জেরা করবেন। ‘‘আপনার চেহারা আর শরীরের চিহ্নগুলো অবিকল আমার মেজ ভাইয়ের মতো। নিশ্চয়ই আপনি সে। আপনার পরিচয় কী?’’ ‘‘না, না,’’ সন্ন্যাসী ঘাড় নাড়লেন, ‘‘আমি সে নই। কেন আমায় শুধু শুধু বিরক্ত করছেন?’’ জ্যোতির্ময়ী দৃঢ় ভাবে বললেন, ‘‘আপনাকে বলতেই হবে আপনি কে?’’
আত্মপরিচয়
জ্যোতির্ময়ী বুদ্ধুকে বললেন বাইরে গিয়ে সকলকে জানাতে হবে যে, মেজকুমারের শরীরের পুরনো চিহ্নগুলো সব সন্ন্যাসীর শরীরে পাওয়া গেছে। ততক্ষণে বাইরে কয়েক শো লোকের ভিড় জমেছে। বেশির ভাগই জমিদারের প্রজা। সকলেই সন্ন্যাসীর আসল পরিচয় জানতে চায়। জ্যোতির্ময়ী ততক্ষণে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছেন যে, এই সন্ন্যাসীই তাঁর ভাই। তিনি সন্ন্যাসীকে বললেন যে, সকলের সামনে তাঁর আসল পরিচয় না জানালে তিনি জলগ্রহণ করবেন না। ঠিক বারো বছর আগে তারিখ মেলালে প্রায় একই দিনে, তাঁর ভাইয়ের তথাকথিত মৃত্যু হয়েছিল দার্জিলিংয়ে।
সেদিন দুপুরে সন্ন্যাসী এসে দাঁড়ালেন প্রায় হাজার দুয়েক লোকের সামনে। ভিড়ের ভেতর থেকে প্রশ্ন এল, ‘‘আপনার নাম কী?’’
সন্ন্যাসী বললেন, ‘‘রমেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী।’’
‘‘আপনার পিতার নাম কী?’’
‘‘রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী।’’
‘‘আপনার মায়ের নাম?’’
‘‘রানি বিলাসমণি দেবী।’’
একজন বলে উঠল, ‘‘আরে, রাজারানির নাম তো সকলেই জানে। আপনার দাই-এর নাম বলুন।’’
সন্ন্যাসী জবাব দিলেন, ‘‘অলকা।’’
এই শুনে জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে জয়ধ্বনি দিতে লাগল। ‘‘জয়, মধ্যমকুমারের জয়।’’ মেয়েরা উলুধ্বনি দিতে লাগল। তুমুল হইচইয়ের মধ্যে সন্ন্যাসীর যেন মূর্চ্ছিত হয়ে পড়ার উপক্রম হল। জ্যোতির্ময়ী এবং বাড়ির অন্যান্য মহিলা চিকের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে সন্ন্যাসীকে পাখার বাতাস করে মাথায় গোলাপ জল ছিটোতে লাগলেন। কয়েক মিনিট বাদে তাঁকে ছোটবোন মটরের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। জনতা তাঁকে ছাড়তে চায় না, পিছু পিছু ধাওয়া করল। অনেক বোঝানোর পর তারা ক্ষান্ত হল।
পর দিন, ৫ মে ভাওয়াল এস্টেটের ম্যানেজার নিডহ্যাম জয়দেবপুর থেকে ঢাকার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট লিণ্ডসে-কে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে একটা গোপন রিপোর্ট পাঠালেন।
মাই ডিয়ার লিণ্ডসে,
এখানে একটা অত্যন্ত অদ্ভুত আর আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে চলেছে যা গোটা জমিদারিতে, এমনকী তার বাইরেও, সোরগোল ফেলে দিয়েছে।
প্রায় পাঁচ মাস আগে এক গৌরবর্ণ সন্ন্যাসী ঢাকায় এসে নদীর ধারে রূপবাবুর বাড়ির উল্টোদিকে আড্ডা গাড়ে। লোকে বলছে সে নাকি হরিদ্বার থেকে এসেছে। কিছু দিন পর তাঁকে কাশিমপুরের জমিদারবাবু সারদাপ্রসাদ রায়চৌধুরীর বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। ক’দিন সেখানে থাকার পর ঢাকা ফেরার পথে অন্যান্য সাধুসন্তের মতো তিনি দু-তিন দিন জয়দেবপুরের মাধববাড়িতে কাটান। ওই সময় তাঁকে শ্রীযুক্তা জ্যোতির্ময়ীদেবীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সন্ন্যাসীর সঙ্গে তাঁর মৃত মেজ ভাই (ভাওয়ালের কুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায়)-এর চেহারার মিল দেখে তিনি কান্নাকাটি শুরু করেন। এবং সাধুও কেঁদে ফেলেন। তাই দেখে বাড়ির লোকজনের মনে সন্দেহ জাগে। মেজকুমারের একটা ফটো দেখার পর সন্ন্যাসী অঝোরে কাঁদতে থাকেন। তাতে সকলের সন্দেহ আরও জোরদার হয়। বাড়ির সকলে তাঁকে তাঁর আসল পরিচয় জানানোর জন্য চাপ দিতে থাকে, কিন্তু সন্ন্যাসী কোনও জবাব না দিয়ে ঢাকা ফিরে যান। এরপর কিছু দিন সাধুর আর কোনও খোঁজখবর পাওয়া যায়নি।
এক সপ্তাহ আগের কাশিমপুরের জমিদারবাবু অতুলপ্রসাদ রায়চৌধুরী আবার সাধুকে জ্যোতির্ময়ীদেবীর বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেই যাবৎ সাধু সেখানেই আছেন। রোজ প্রায় শ’খানেক লোক জমছে সাধুকে দর্শন করতে। দেখার পর সকলেই মনে করছে ইনিই মৃত মেজকুমার। জমিদারির বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রজারা দলবেঁধে এসে সাধুকে দেখে গিয়ে খবর ছড়াচ্ছে যে, উনিই মেজকুমার। সাধুর উপস্থিতি গোটা এলাকায় ভয়ানক সোরগোল ফেলেছে।
গতকাল সন্ধ্যায় কয়েকশো প্রজার প্রশ্ন আর অনুনয়ের চাপে সাধু জানায় যে, তাঁর নাম রমেন্দ্র এন রায়, তাঁর পিতার নাম রাজেন্দ্র এন রায় আর তার দাইয়ের নাম অলকা। এর পর সাধু মুর্চ্ছিত হয়ে পড়ে এবং প্রজারা উলুধ্বনি আর জয়ধ্বনি দিতে থাকে। ওই সময়ে সমবেত জনতার মধ্যে সকলেই নিঃসন্দেহ ছিল যে, এই সন্ন্যাসী মেজকুমার ছাড়া আর কেউ নন। প্রজারা প্রতিজ্ঞা করে যে, এস্টেট তাঁকে মেনে না নিলেও তারা তাঁর পাশে থাকবে। ব্যাপার গুরুতর দেখে ইন্দুময়ী ও জ্যোতির্ময়ীদেবীর বাড়ির লোকেরা মোহিনীবাবু ও মিস্টার ব্যানার্জিকে সাধুর স্বীকারোক্তির কথা জানিয়ে দেন। ওঁরা দু’জন তখন জ্যোতির্ময়ীদেবীর বাড়ি গিয়ে ঘটনার তদন্ত করেন। কিন্তু সাধু ওদের সঙ্গে দেখা করেননি। আজ সকালে ওঁরা আবার সেখানে যান। সাধু জানিয়েছেন যে, তিনি বিকালে দেখা করবেন। পরিবারের লোকেরা সাধুকে বারে বারে বলেছেন যে, নিজেকে মেজকুমার বলে দাবি করে তিনি বিশাল দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিচ্ছেন। তাঁর আগের জীবনের ইতিহাস পুরোপুরি না জানিয়ে তিনি বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে পারবেন না। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাধুর ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা খুব প্রয়োজন। প্রতি দিন সকাল থেকে সাধুকে দেখার জন্য বহুলোকের ভিড় জমছে। উত্তেজনা এতই প্রবল যে, এখন থেকে ঠিক মতো ব্যবস্থা না নিলে শেষ পর্যন্ত বড় রকমের গোলযোগ দেখা দিতে পারে।
আপনার আদেশের অপেক্ষায় রইলাম।
ইতি— এফ.ডব্লিউ. নিডহ্যাম।
এই চিঠির কপি কলকাতায় মেজরানি বিভাবতী দেবী এবং অন্য দুই রানিকেও তাঁদের অবগতির জন্য পাঠানো হয়। চার দিন বাদে ৯ মে কলকাতার দি ইংলিশ ম্যান পত্রিকায় নিম্নোক্ত চিঠিটি প্রকাশিত হয়।
স্যার,
গত শনিবার আপনারা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস দ্বারা প্রেরিত ‘ঢাকায় চাঞ্চল্য’ নামে একটি সংবাদ ছেপেছিলেন। সংবাদের বক্তব্য ছিল যে, এক ব্যক্তি হঠাৎ এসে নিজেকে বারো বৎসর পূর্বে মৃত ভাওয়ালের মেজকুমার বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে।
দার্জিলিংয়ে তদানীন্তন সিভিল সার্জেন লে: কর্নেল ক্যালভার্ট স্বর্গত কুমারকে তাঁর শেষ অবস্থায় চিকিৎসা করেন। কুমারের ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন দার্জিলিংয়ের ডেপুটি কমিশনার মি. ক্রফোর্ড।
আমি নিজে স্বর্গীয় কুমারের মৃত্যুশয্যার পাশে উপস্থিত ছিলাম এবং তাঁর বহু আত্মীয়পরিজন ও বন্ধু যাঁরা তখন দার্জিলিংয়ে উপস্থিত ছিলেন কুমারের শেষকৃত্যে যোগদান করেন। মৃত কুমারের বিধবা পত্নী ভাওয়ালের রানি আমার নিজের বোন এবং তিনি এখনও জীবিত আছেন।
ইতি— এস এন ব্যানার্জি।
ইতিমধ্যে জয়দেবপুরে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন জ্যোতির্ময়ীদেবীর বাড়ির সামনে উপস্থিত হয়ে সন্ন্যাসীকে দেখার জন্য ভিড় জমাতে লাগল। সাধু তত দিনে সন্ন্যাসীর বেশ ছেড়ে সাধারণ জামাকাপড় পরতে শুরু করেছেন, যদিও তাঁর চুলদাড়ি তখনও আগের মতো লম্বা। প্রতি দিন বাড়ির সামনে চেয়ারে বসে তিনি লোকেদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন, পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতেন আর মাঝে মাঝেই নাকি অশ্রু বিসর্জন করতেন। জয়দেবপুর থানার দৈনিক রেজিস্টারে এ সব রিপোর্ট লেখা হয়েছিল।—
১০/৫/২১: দুপুর তিনটে। গত চব্বিশ ঘণ্টা কোনও বৃষ্টি হয়নি। জয়দেবপুর রাজবাড়ির সেই সাধু যিনি নিজেকে মেজকুমার বলছেন, তিনি এখনও এখানেই অবস্থান করছেন। দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য লোক আসছে তাঁকে দেখতে। বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের ধারণা যে ইনিই মেজকুমার।
১১/৫/২১: জয়দেবপুরে এক সন্ন্যাসী এসেছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু লোক আসা-যাওয়া করছে তাঁকে দেখার জন্য। পনেরো আনা লোক বলছে যে, উনিই মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী।
But one good friend is equal to a LIBRARY



