Topic: প্রথম পার্বতী_শান্তিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়_তারকবালা_MISS LIGHT

প্রথম পার্বতী

১ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৮। মুক্তি পেল নির্বাক ‘দেবদাস’। পার্বতীর
ভূমিকায় তারকবালা। সবাই তাঁকে একডাকে চিনত ‘মিস লাইট’ নামে।


শান্তিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

সিঁড়ি ভেঙে নির্জন তেতলায় উঠে প্রথমে যাঁর মুখোমুখি হলাম, তাঁর শূন্য সিঁথি, কাঁচা-পাকা অবিন্যস্ত চুল, পরনে হালকা হলদে ছোপের আটপৌরে থান। গোটা শরীর জুড়ে শোক ও দৈন্য। কিন্তু গায়ের রং কাঁচা সোনা। কারুণ্যের মধ্যেও আশ্চর্য সারল্য। চাহনিতে স্নিগ্ধ নম্রতা। মাথায় ঘোমটা। ইনি শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ ছায়াছবির ‘প্রথম পার্বতী’। আসল নাম তারকবালা। কিন্তু সে নাম বড় একটা কেউ জানত না। সেই সময় তাঁকে এক ডাকে সবাই চিনত ‘মিস লাইট’ বলে। এ নাম তাঁর পেশাদারি মঞ্চ থেকে পাওয়া। নামটি দিয়েছিলেন তাঁর নাট্যগুরু অপরেশ মুখোপাধ্যায়। কথিত আছে মিস লাইট মঞ্চে উঠলে ফুটলাইটের জোরাল আলোও ম্লান হয়ে যেত।

miss light_তারকবালা

সেই পার্বতী আজ থেকে কম করে পঁচিশ বছর আগে আমার সামনে যখন দাঁড়িয়ে তখন তেরো বছরের পুত্র এবং স্বামী বিখ্যাত অন্ধ গায়ক কৃষ্ণচন্দ্র দের শোকে প্রায় নির্বাক। তবু সেই শোকের পরিবেশের মধ্যে বার তিনেক হাঁটাহাঁটি করে শেষ পর্যন্ত প্রথম ‘দেবদাস’ ছবি তৈরির কথা জেনেছিলাম। প্রথমটা খুব কেঁদেছিলেন পাশের ঘরে কেষ্টবাবুর জন্য সযত্নে রক্ষিত পাতা বিছানার পাশে আমাকে বসিয়ে। এখানে তিনি বিশ্রাম করতেন, রেওয়াজ করতেন, গান শেখাতেন। পাশের দেয়ালে টাঙানো তাঁর প্রিয় তানপুরা। অন্য দেয়ালে দেবতাদের পটের সঙ্গে প্রয়াত পুত্র ও কেষ্টবাবুর ছবি। তাতে চন্দনের ফোঁটা। নিজের মাত্র একখানা ছবি। তাও তেরো-চোদ্দো বছর বয়সের। যখন তিনি নির্বাক ‘দেবদাস’-এ পার্বতীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। অসাধারণ সুন্দর স্নিগ্ধ মুখশ্রী। তিনি এক সময় যে সব নাটক ও ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তার প্রায় কোনও চিহ্নই ঘরে রাখেননি। ছবি, বই, হ্যাণ্ডবিল সব বিলিয়ে দিয়েছেন, নচেৎ নষ্ট করে ফেলেছেন। ‘‘আমি চাইনি আমার সন্তান সে সব দেখুক। নটীদের তখনও সামাজিক সম্মান ছিল না।’’

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: প্রথম পার্বতী_শান্তিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়_তারকবালা_MISS LIGHT

‘‘আমার তখন কত আর বয়স। তেরো কি চোদ্দো। তখনই স্টেজে আমার খুব নাম ডাক। সেই সময় একদিন নরেশ মিত্তির মশাই আমার অভিনয় দেখে আমাকে পছন্দ করে নগেন বোস মশাইয়ের মারফত ডেকে পাঠান। তিনি তখন শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ ফিল্ম করার তোড়জোড় করছিলেন। আমাকে পেয়েই তিনি বললেন, এত দিনে শরৎবাবুর আসল পার্বতীকে খুঁজে পেলুম।’’ সেই নির্বাক ‘দেবদাস’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯২৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ক্রাউন সিনেমা অর্থাৎ আজকের উত্তরায়। দেবদাসের ভূমিকায় পরবর্তিকালে বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার ফণী বর্মা, চুনিলাল: পরিচালক নরেশবাবু স্বয়ং, জমিদার ভুবন চৌধুরী: কনকনারায়ণ ভূপ, ধর্মদাস: তিনকড়ি চক্রবর্তী, মহেন্দ্র: সুশীল ঘোষ, দেবদাসের বড় ভাই: মণি ঘোষ এবং চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় পারুল। প্রমথেশ বড়ুয়ার বাংলা দেবদাস-এ যে ভূমিকায় চন্দ্রাবতী অনবদ্য অভিনয় করে নাম করেছিল, ওই ভূমিকায় অভিনয়ের কথা ছিল স্টেজের বিখ্যাত নীহারবালার। ওই ছবিতেই পরবর্তিকালের বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান ও চিত্র পরিচালক নীতীন বসু ক্যামেরাম্যান হিসাবে প্রথম কাজ করেন। শুটিং হয়েছিল লক্ষ্মীবিলাস তেলের মালিকদের সুঁড়োর বাগানবাড়ি, ভাওয়ালের বাগানবাড়ি ও বারুইপুরের জমিদার বাড়িতে। ছবির প্রডিউসার ছিলেন লক্ষ্মীবিলাস তেলের নগেন বোস, সতীশবাবুরা। কোম্পানির নাম ইস্টার্ন ফিল্ম সিণ্ডিকেট।

‘‘দেবদাস ছবিতে পার্বতীর ভূমিকায় আমার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে শরৎবাবু আমাকে প্রশংসা এবং আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, পার্বতীকে আমি যে ভাবে লেখায় ফুটিয়ে তুলেছি, সেটা তুমি আরও সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছ ছবিতে। নিজের হাতে সই করে একখানা বইও তিনি আমায় উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বইখানা কোথায় যে হারিয়ে ফেলেছি। সেটা যত্ন করে রাখিনি বলে আজও আমার অনুতাপ হয়। এই খেদ আমার জীবনে কখনও মিটবে না।’’

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: প্রথম পার্বতী_শান্তিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়_তারকবালা_MISS LIGHT

এই সাক্ষাৎকার ১৯৭৮ ডিসেম্বরের। শোকে, দুঃখে, জরায়, বাড়ি থেকে উৎখাত হয়ে, সে কালের আর এক বিখ্যাত মঞ্চশিল্পী রেণুবালা ‘সুখ’-এর দুই ছেলের হেফাজতে মারা গেছেন মিস লাইট, সে-ও অনেক দিন হল। তাঁর গাওয়া হীরেন বসুর লেখায় ও সুরে তামাম বাংলার মুখে মুখে ফেরা ‘শেফালি তোমার আঁচলখানি বিছাও শারদ প্রাতে’ গানের সঙ্গে তিনিও আজ বিস্মৃত।

বড়ুয়া সাহেবের টকির বাংলা দেবদাস-এর পার্বতী যমুনাদেবী এখন যদ্দূর জানি বয়সের আধিব্যাধি ছাড়া বৈভবের মধ্যেই বেঁচে আছেন। বড়ুয়া সাহেবের পরিচালিত বাংলায় ‘দেবদাস’ প্রমথেশ বড়ুয়া হলেও হিন্দি ‘দেবদাস’ কুন্দনলাল সায়গল, পার্বতী যমুনা, চুনিলাল এ শোর, চন্দ্রমুখী হয়েছিলেন রাজকুমারী। রূপলাবণ্যর জন্য তখন তাঁর খুব নামডাক ছিল। পরিচালক বড়ুয়া সাহেব রাজু নামে ছোট্ট একটি ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন হিন্দি ভার্সানে।

প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়া পরিচালিত এই শেষোক্ত হিন্দি ‘দেবদাস’ আসলে ডবল ভারশন ছবি। তখন এটাই রেওয়াজ ছিল। গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে কলকাতার ছবি দেখানো হত, তাই থেকে বাণিজ্য। হিন্দি ‘দেবদাস’ তখন প্রচণ্ড সাড়া ফেলে দিয়েছিল। বোধহয় ষাটের দশকে বোম্বাই মার্কা ‘দেবদাস’ যখন কলকাতায় রিলিজ করে, তখন পাশাপাশি এই ছবিটি পুনঃপ্রদর্শন করে তার বাণিজ্যে রীতিমত ধাক্কা দিয়েছিল। আসলে বাংলাকে চাপ দিয়ে ‘দেবদাস’কে মুম্বই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাণিজ্যের জন্য।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: প্রথম পার্বতী_শান্তিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়_তারকবালা_MISS LIGHT

ষাটের দশকের গোড়া থেকে বাংলা ছবিতে ‘রি-মেক’-এর রেওয়াজ চালু হয়। ‘দেবদাস’ও নতুন করে তৈরি হল দিলীপ রায়ের পরিচালনায় (মুক্তি পায় ২৩.৩.৭৯ তারিখে)। উত্তমের বহু কালের বাসনা ছিল তাঁর বাল্যে দেখা দেবদাস-এর ভূমিকায় অভিনয় করার। যে কোনও কারণেই হোক, হতে পারে উপন্যাসে উল্লিখিত দেবদাসের বয়সকালের কথা ভেবে, তিনি তৃতীয় বাংলা দেবদাস-এ দ্বিতীয় পছন্দ চুনিলালের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। দেবদাস সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, পার্বতী সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়, চন্দ্রমুখী হয়েছিলেন সুপ্রিয়াদেবী। এ ছবির বাণিজ্য হলেও পাবলিক নেয়নি। উত্তম-সৌমিত্রর নামে যা চলেছে। শুনেছি দক্ষিণী ভাষায়ও ‘দেবদাস’ তৈরি হয়েছে। তবে সে কোন দেবদাস কে জানে। বাণিজ্য নিশ্চয়ই হয়েছে। সেটা কাহিনির লাবণ্য ও চিরকালীন আবেদনের জন্য। শুধু দেবদাস কেন, এ আবেদনের জন্যই অন্যান্য শরৎকাহিনিও দীর্ঘকাল বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। লেখকের রয়ালটিকে ফাঁকি দিতে বারে বারেই তাঁর কাহিনির বিষয়বস্তু এবং ছক চুরি করা হয়েছে। শরৎচন্দ্রই বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে পোক্ত করে তুলেছিলেন একদা। এক শ্রেণীর প্রযোজক-পরিচালক এই টনিক দিয়েই ইণ্ডাষ্ট্রিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এবং সেটা করেছিলেন সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্যকে ভাঙিয়ে, মোটামুটি কাহিনিকে অবিকৃত রেখে। এই অবস্থায় এবং পরিবেশে ‘চিরকালীন শিওর শট’ বাণিজ্যিক কাহিনি ‘দেবদাস’ ফিরে এসেছে, সুখের কথা।

তারকাবালা_miss light

বড়ুয়া সাহেবের ‘দেবদাস’ দেখে উদাসী দেবদাস হয়ে গার্জেনের শাসন বা চড় হজম করেনি, তিরিশের দশকের মধ্যযাম থেকে সেই বয়সের খুব কম যুবাই ছিল। তখন ছেলে-ছোকরাদের বেগড়বাই দেখলেই দেবদাসের সঙ্গে তুলনা করা হত। মুম্বই-এর দিলীপকুমার, দেব আনন্দ, ধর্মেন্দ্র থেকে শাহরুখ খান পর্যন্ত সেই অর্থেই কেউই শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ নন। কলকাতার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও হতে পারেননি।

তবে বাণিজ্যের শক্তি কিংবা লীলায় মূল কাহিনীর মেজাজ আর চরিত্রচিত্রণের প্রতি নিষ্ঠা-টিষ্ঠা সব তো এখন আদর করে শিকেয় তুলে...। অতএব অন্ধকার ছবিঘরের পর্দায় আরও বার বার নব নব রূপে ‘দেবদাস’ চলছে চলুক। তাতে কার পিণ্ডি চটকাল কিংবা কোন উদোর পিণ্ডি কোন বুধোর ঘাড়ে গেল সে সব আর কে-ই বা ভাবে!

সৌজন্যেঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ২ কার্তিক ১৪০৯ শনিবার ১৯ অক্টোবর ২০০২

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up