Topic: কলকাতার পায়রা রেস_চন্দন রুদ্র_PEGION RACE IN CALCUTTA
কলকাতার পায়রা রেস
চন্দন রুদ্র
দুরন্ত গতির মোটর রেসের কথা আমাদের অনেকেরই জানা। ঘোড়দৌড় বা ঘোড়া রেস এই কলকাতা শহরেরই একটি প্রাচীন খেলা। কিন্তু পায়রা রেসের কথা আমরা ক’জন জানি! অথচ ঘোড়া রেসের মতো পায়রা রেসও কলকাতা শহরের আর একটি প্রাচীন খেলা। ইলাহাবাদ থেকে কলকাতা, দিল্লি থেকে কলকাতা কিংবা গয়া বা হাজারিবাগ থেকে কলকাতা উড়ে এসে প্রতি বছরই রেস জিতে নিচ্ছে এই শহরের হোমার পায়রারা। আর ফি বছর শীতে এই পায়রা রেসকে ঘিরে মেতে উঠছেন কলকাতার কিছু মানুষ।

হোমার পায়রা
বহু বছর আগে হোমার পায়রাকে চিঠিপত্র আদান-প্রদানের কাজে ব্যবহার করা হত। ডাক-ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় তখন পায়রাই ছিল যোগাযোগ রক্ষার বড় হাতিয়ার। প্রথম কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হোমার পায়রাদের কৃতিত্বের কথা আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নাৎসি বাহিনীর ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে ডুবন্ত ব্রিটিশ সাবমেরিন থেকে সেনাদের রক্ষা করেছিল ব্রিটিশ উদ্ধারকারী জাহাজ। রেডিও সিস্টেম নষ্ট হয়ে যাওয়া সাবমেরিনটি থেকে একটি হোমার পায়রা বিপদের খবর-লেখা চিঠি পায়ে বেঁধে হেড কোয়ার্টারসে পৌঁছে দেওয়ার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে কলকাতায় রানি রাসমণির বাড়িতে বিদেশ থেকে আনা হোমার পায়রা ছিল। যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট সেগুলি বাজেয়াপ্ত করে নেয়। যুদ্ধের পর আবার কিছু পায়রা ফিরিয়ে দেয়। যতদূর জানা যায়, গত শতকের গোড়ার দিকে হোমার পায়রাদের নিয়ে কলকাতা শহরে শুরু হয়েছিল পায়রা রেস। রানি রাসমণির পরিবারের অবনী দাস, শৈলেন চৌধুরীরা বিদেশ থেকে রেসের জন্য হোমার পায়রা নিয়ে এসেছিলেন। পরে কলকাতার চিনেরাও বিদেশ থেকে হোমার পায়রা নিয়ে আসেন। পি এস লি, অনিল চৌধুরী, শৈলেন চৌধুরী, অবনী দাস প্রমুখের উদ্যোগেই কলকাতায় প্রথম হোমিং পিজিয়ন ক্লাব গড়ে ওঠে। এই মুহূর্তে কলকাতা শহরে দুটি রেসিং পিজিয়ন ক্লাব রয়েছে: বাঙালিদের ক্যালকাটা রেসিং পিজিয়ন অর্গানাইজেশন এবং চিনেদের ক্যালকাটা রেসিং পিজিয়ন ক্লাব। তবে নামেই চিনেদের ক্লাব। এই ক্লাবের অনেক সদস্যই এখন এ দেশি।
কেমন করে হয় এই পায়রা রেস! এই রেসের নিয়মকানুনই বা কেমন! উত্তর কলকাতার গোকুল বড়াল ষ্ট্রিটের ক্যালকাটা রেসিং পিজিয়ন অর্গানাইজেশনে বসে কথা হচ্ছিল এই ক্লাবেরই কর্তাব্যক্তি বাবুল নন্দী, সুজয় দত্ত, শুভঙ্কর মণ্ডলদের সঙ্গে। ওঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রতি মরসুমে ডিসেম্বর মাস থেকে শুরু করে মার্চ মাস পর্যন্ত চলে এই পায়রা রেস প্রতিযোগিতা। কলকাতায় সাধারণত, দু’ধরনের রেস হয়। স্বল্প দূরত্বের দৌড় এবং লম্বা দূরত্বের দৌড়। এক বছরের কম বয়সি পায়রাদের ‘ইয়ং বার্ড’ বলা হয়। এই পায়রাদের নিয়ে হয় প্রথমোক্ত দৌড়। এক বছরের বেশি বয়সের পায়রা দ্বিতীয় রেসে অংশ নেয়। আসানসোল (২০০ কিমি), হাজারিবাগ (৩৩৩ কিমি) গয়া (৪৫৮ কিমি) থেকে কলকাতা রেস হয় ইয়ং বার্ডদের নিয়ে। ইলাহাবাদ (৮১৪ কিমি), কানপুর (১০০৭ কিমি) এবং দিল্লি (১৪৩০ কিমি) থেকে কলকাতা রেসে ওল্ড বার্ডরা অংশ নেয়। এ ছাড়া ডেহ্রি-অন-শোন (৫৪৩ কিমি) এবং মোগলসরাই (৬৬১ কিমি) থেকেও দুটি রেস হয়।
পায়রা রেস শুরুর আগে প্রতি বছরই পায়রাদের বিশেষ ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করা হয়। কলকাতা থেকে পায়রা নিয়ে গিয়ে ডানকুনি, ব্যাণ্ডেল এবং বর্ধমান এই তিন জায়গা থেকে পায়রা ছাড়া হয়। পায়রারা নিজ নিজ ঘরে ফিরে আসে। প্রতিযোগিতা শুরুর আগে রেসাররা ক্লাবে পায়রা নিয়ে আসেন। পায়রাগুলিকে এক সঙ্গে বিশেষ বক্সে রেখে সিল করে দেওয়া হয়। তার আগে নির্দিষ্ট রেসিং শিটে প্রতিটি পায়রার নাম, পায়ের রিং নম্বর, গায়ের রং, পুরুষ না স্ত্রী পায়রা লিখে নেওয়া হয়। পায়রার জন্মের সাত দিনের মধ্যেই ক্লাব থেকে অ্যালুমিনিয়ামের ওপর প্ল্যাস্টিকের কোটিং করা নম্বরযুক্ত রিং পড়িয়ে দেওয়া হয়। দশ দিন বয়স হয়ে গেলে ওই রিং আর খোলা যায় না। রেসের পায়রাদের ফার্স্ট ফরোয়ার্ড, স্টপার, ডার্ক হর্স, মিগ-২১, ব্ল্যাক লেডি, হন্টিং ডগ, রেড আর্মি, লাকি থার্টিন এমন সব বিচিত্র নামে নামকরণ করা হয়। ট্রেনে বুকিং করে পায়রাদের রেসিং পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্টেশন মাস্টারের উপস্থিতিতে সিল কেটে ছাড়া হয় পায়রা এবং তৎক্ষণাৎ ক্লাবে ফোন করে পায়রা ছাড়ার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়। এ দিকে রেস শুরু হতেই স্টপ-ওয়াচ নিয়ে এক জন করে বিচারক রেসারদের ছাদে প্রতিটি প্রতিযোগী পায়রার ঘরের সামনে পৌঁছে অপেক্ষা করতে থাকেন। রেস শেষ করে পায়রা ছাদে নেমে নিজের ঘরের চৌকাঠে পা রাখলে তখনই বিচারক রেসিং শিটে পায়রাটির নাম, রিং নম্বর দেখে, পাশে সময় লিখে শিটটি ভাঁজ করে খামে ভরে মুখবন্ধ খামটি ক্লাবে জমা করে দেন। রেস শেষ হলে সন্ধ্যায় ক্লাবে সদস্যদের উপস্থিতিতে সব বন্ধ খাম খুলে সেরা সময় অনুযায়ী প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এই ভাবে দশম স্থান পর্যন্ত পায়রাকে বেছে নেওয়া হয়। প্রথম তিন সেরাকে চ্যালেঞ্জ কাপ ও সার্টিফিকেট দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।
রেসে নেমে কোনও পায়রা তিনটি রেস জিতলে তাকে চ্যাম্পিয়ন বার্ডের আখ্যা দেওয়া হয়। ১৯৯৪-৯৫ সালে এক দিনের মোগলসরাই, দু’দিনের ইলাহাবাদ এবং দশ দিনের দিল্লি রেস জিতে এই অ্যাওয়ার্ড পায় পি সি বিশ্বাসের পায়রা ‘ফার্স্ট ফরোয়ার্ড’। একই জায়গার রেসে কোনও পায়রা পর পর তিন বছর জিতলে সেই কাপটি চিরদিনের জন্য সে জিতে নেয়। পর পর তিন বছর গয়া রেস জিতে এমন কৃতিত্ব দেখিয়েছে বাগমারীর অনন্ত পালের পায়রা। অনন্তবাবুরই পায়রা ১৯৯২ সালে ইলাহাবাদ রেসে সকাল ছ’টা কুড়ি মিনিটে ছাড়া হলে বিকেল চারটে পঞ্চাশ মিনিটে রেকর্ড সময়ে কলকাতায় পৌঁছে যায়। ‘ফরেন কারেন্সি’ নামের একটি পায়রার দিল্লি থেকে ১৭ ঘণ্টায় কলকাতায় উড়ে আসার রেকর্ড আছে। ১৯৯৩ সালে মানিকতলার শুভঙ্কর মণ্ডলের পায়রা হাজারিবাগ থেকে চার ঘণ্টা এগারো মিনিটে কলকাতায় এসে রেকর্ড করে। কানপুর থেকে কলকাতা তিন দিনের রেস। কিন্তু ভুল করে কলকাতা থেকে পায়রাভর্তি বক্স দিল্লি পৌঁছে যায়। সেখান থেকে পায়রা এনে না-খাওয়া অবস্থায় তৃতীয় দিন পায়রা ছাড়া হলে সেই পায়রা ১০০৭ কিমি দূরত্ব রেকর্ড সময়ে অতিক্রম করে কলকাতায় আসে। যে দিন সকাল সাতটায় পায়রা ছাড়া হয় তার পরের দিন সকাল সাতটার মধ্যেই পায়রা ফিরে আসে। বারো ঘণ্টায় পায়রা রেস শেষ করে নিজের ঘরে ঢুকে যায়। এই কৃতিত্ব দেখিয়েছিল রবীন্দ্রনাথ গুনিনের পায়রা। এমন নজিরের কথাই শোনালেন দুই অভিজ্ঞ রেসার পি সি বিশ্বাস এবং অঞ্জনকুমার পাল।
কলকাতার পায়রা রেসে এক সঙ্গে সত্তর থেকে একশোটি পায়রা ছাড়া হয়। কেউ কেউ একাধিক পায়রা রেসে দেন। সাধারণ পায়রার তুলনায় হোমার পায়রার ডানার গঠন আলাদা। অনেকটাই চওড়া হয়। ওড়ার পদ্ধতিও আলাদা। সূর্যরশ্মিকে নির্দেশ করে এই পায়রারা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ওড়ে। মাথার ম্যাগনেটিক ফিল্ড ওদের দিক্ ঠিক করতে সাহায্য করে। সাধারণত, ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৮৫ কিমি বেগে এই পায়রারা উড়ে আসে। এর বেশি গতিবেগেও উড়ে আসার নজির আছে। রেস শুরু করে দিনের আলো থাকা পর্যন্ত পায়রাগুলি উড়ে চলে। রাতে কোথাও বিশ্রাম নেয়। দিনে বাজপাখি এবং রাতে পেঁচা রেসিং পায়রাদের বড় শত্রু। হাজারিবাগ জঙ্গল পার হওয়ার সময়ই বেশি বাজপাখিতে আক্রমণ করে। বাজের ছোবলে পা ভেঙে কিংবা গায়ে ক্ষত নিয়েও হোমার পায়রাদের ঘরে ফিরে রেস শেষ করতে দেখা গেছে। রেস করতে নেমে এক মাস পরেও অনেক পায়রা নিজের ঘরে ফিরে আসে। কোনও পায়রা আবার চির দিনের জন্য হারিয়েও যায়।
পায়রা রেস একটি প্রাচীন আন্তর্জাতিক স্পোর্টস। ইংল্যাণ্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যাণ্ড প্রভৃতি দেশে পায়রা রেস নিয়ে যথেষ্ট উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা যায়। ওই সব দেশে আছে একাধিক পায়রার রেসিং ক্লাব। ইংল্যাণ্ডে যেমন আছে রয়াল পিজিয়ন রেসিং অ্যাসোসিয়েশন। ইংল্যাণ্ডে নাকি বিশেষ ট্রেনে করে রেসিং পয়েন্টে পায়রা নিয়ে গিয়ে ছাড়া হয়। এক সঙ্গে কুড়ি-পঁচিশ হাজার পায়রার রেস হয়। অথচ পায়রার খাবার, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্যা, পায়রাকে রেসের উপযোগী করে তোলা, পরিবহণ খরচ ইত্যাদি বেড়ে চলায় নানা সমস্যায় ধুঁকছে কলকাতার পায়রা রেস। এর পর আছে ঘাড় বাঁকা বা নেক টার্ন নামক মহামারি রোগের ধাক্কা। তবুও শুধু নেশা আর ভালবাসার টানেই ওই কিছু মানুষ আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন কলকাতার পায়রা রেসকে।
সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা ২৬ পৌষ ১৪১০ রবিবার ১১ জানুয়ারি ২০০৪
But one good friend is equal to a LIBRARY

