Topic: ভাষাসৈনিক মমতাজ বেগম_MARTYR OF BENGALY LANGUAGE_MAMTAZ BAGUM
ভাষাসৈনিক মমতাজ বেগমঃ
আজীবন বিপ্লবী এক নারীর ভুলে যাওয়া অধ্যায়
মূল লিখাটা অন্য একটি সাইট থেকে নেয়া, যৌবনযাত্রা ব্লগের ভাসিমবিডির লিখা... আমি মূল লিখাটা তুলে দিচ্ছি, আর ছবি আসিফ মহিউদ্দীনের সৌজন্যে, মানে সামু ব্লগের তার নিজস্ব লিখা থেকে নেয়া!
২০০৯ সালের কোন একদিন নিচের লেখাটা দিয়েছিলাম যৌবনযাত্রায়। ক্যাপশন ছিল " হারিয়ে যাওয়া"। কিছুদিন আগে আমি আবার লেখাটা পোস্ট করেছিলাম মমতাজ বেগমের ফিরে আসার খবর নিয়ে।
হারিয়ে যাওয়া
বিগত শতাব্দীর ৪০ দশকের কথা। অবিভক্ত বাংলার কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তী হলো ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার রাজপাট নামের এক অজপাড়াগাঁয়ের ১৯ বছরের এক অমিয়কান্তি যুবক মুসলিম যুবক। আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ তার উদ্দেশ্য। সেখানেই পরিচয় যুবকের "তার" সাথে।
সে কোলকাতা বিচারালয়ের এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু বিচারপতি পরিবারের একমাত্র কন্যা। অপরূপ মায়াময়ী চেহারার এই কন্যাটি সারাদিন মাতিয়ে রাখে বিচারপতির আবাসকে। বড় দুই ভাইয়ের চোখের আড়াল হলেই ভাইদুটি খুঁজে ফিরে তাকে বাড়ীর আঁনাচে কাঁনাচে। বড় আদরের কল্যানী বোনটি তাদের, হারিয়ে যেনো না যায়!
আমি আজ এই কন্যাটির হারিয়ে যাওয়ার কথা বলতে চাই।
মামা প্রমথনাথ বিশীর একান্ত আগ্রহে এন্ট্রান্স পাশ করার পরে তাকে ভর্তী করা হলো বেথুন কলেজে। ঘেরাটোপ দেয়া ফিটন গাড়ীতে চড়ে কলেজে যাওয়ার অনুমতি পেলো সে। তাতেই তার আনন্দ! ঘেরাটোপের ভেতর থেকেতো বাইরের পৃথিবীটা দেখা যাবে উঁকি দিয়ে। সেদিন হারিয়ে গেলো কল্যানী বোন কল্যানী রায়ের আড়ালে।
কল্যানী রায় নামের কন্যাটি ঘেরাটোপের ভেতর থেকেই পৃথিবীটা দেখতে দেখতে একদিন এসে গেলো কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্ত্বরে। পড়া-লেখাতো ভালো লাগেই, পাশাপাশি তার ভালো লেগে গেলো সেই অমিয়কান্তি যুবককেও। কিন্তু ভালো লাগলেই তো আর হবে না, সে যে মুসলমান! আর মুসলমান যুবককে ভালোবাসা? সেতো জন্ম-জন্মান্তরের অপরাধ! কিন্তু ভালোবাসা কি আর হিন্দু-মুসলমান বোঝে?
একদিন মুখোমুখি হলো সে যুবকের, পটলচেরা চোখ দুটি ছলছল, রক্তিম মুখে প্রকাশ করলো তার অন্তরের আঁকুতি "ভালোবাসি",সঁপে দিলো নিজ়েকে যুবকের বাহুডোরে। বিভ্রান্ত যুবকের মুখে কোন ভাষা নেই, মন তার নেচে নেচে বলে চলেছে "আমি পাইয়াছি, আমি ইহাকে পাইয়াছি"। ভালোবাসাকে পরিপূর্ণতা দিতে ভালোবাসতে বাসতে অনেকদিন পরে একদিন তারা হয়ে গেলো এক। কোলকাতা শহর কাঁপিয়ে হারিয়ে গেলো কল্যানী রায় মমতাজ বেগম এর মাঝে। সালটা ছিলো ১৯৪৬।
প্রচন্ড হুমকী আর দাঙ্গার ভয়ে বন্ধু-বান্ধবেরা একরাতে তাদের উঠিয়ে দিলো ট্রেনে। হাওড়া থেকে গোয়ালন্দ। দু'জনা বসে আছে দুজনার পানে চেয়ে। কত পথ, কত প্রান্তর পেরিয়ে গেলো তা তারা টের পেলো না। চোখে তখন তাদের একটাই স্বপ্ন, ঘর বাঁধার, জীবন নাটকের পরবর্তী দৃশ্যের পর্দা উন্মোচনের।
গোয়ালন্দ থেকে ইস্টিমারে করে তারা চলে এলো নারায়নগঞ্জ। যেখানে রয়েছে যুবকের বহু আকাংক্ষিত সরকারী চাকুরী, খাদ্য পরিদর্শকের। হলুদ রঙের একখানা একতলা বাসায় সংসার পেতে বসলো তারা। মধুর সেই দিন গুলোকে আরো মধুর করে একদিন তাদের সংসারে এসে গেলো পুতুলের মতো একটি কন্যা, আদর করে নামটি তার রাখা হলো "খুকু"। মাতৃত্বের মধুর ভূবনে হারিয়ে গেলো প্রেমিকা- বঁধু মমতাজ "মা" এর মাঝে।
নিজের খেলাঘরে পুতুল কন্যা খুকুকে নিয়ে খেলতে খেলতেই একদিন ডাক পেলো সে চাকুরীর। মর্গাণ গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে শুরু করলো তার নতুন জীবন। বাসায় আয়ার কাছে এক কন্যা রেখে এসে সে দ্বায়িত্ব নিলো তিনশত কন্যার। নিজের কন্যার পাশাপাশি যে মানুষ করতে হবে এই তিন শত কন্যাকে। দেখাতে হবে পথ, নিয়ে যেতে হবে আলোর বন্দরে। খুকুর মমতাময়ী মা হারিয়ে গেলো সেদিন দ্বায়িত্ববান "বড়আপা'র আড়ালে।
এলো ১৯৫২। চারিদিক উন্মাতাল। বাংলার মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে ভাষার টানে। ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়! ঢাকার পাশাপাশি নারায়নগঞ্জেও তখন ভাষার দাবীতে টানটান উত্তেজনা। মিছিলে মিছিলে সরগরম শহর। মমতাজ বেগমও সেই উত্তেজনার বাইরে থাকতে পারলেন না। ২১ শে ফেব্রুয়ারীর মিছিলে গুলিবর্ষনের প্রতিবাদে ২২শে ফেব্রুয়ারী স্কুলে এসে তার তিনশত কন্যা নিয়ে নেমে গেলেন মিছিলে পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। প্রতিবাদের চাদরে ঢাকা পড়লো নারায়নগঞ্জ।
কন্যাদের পাশাপাশি মায়েরা নেমে এলো মিছিলে। সে মিছিল রোঁখার ক্ষমতা রইলোনা কারো। নত মাথায় রাস্তা ছেড়ে দিলো খাকি উর্দিরা। চেয়ে চেয়ে দেখলো তাদের কন্যাদের, তাদের বাড়ীর কোনে লুকিয়ে থাকা কথা না বলা স্ত্রীদের। কি বলিষ্ঠ কন্ঠে আওয়াজ তুলছে শ্লোগানের!
তারপর প্রতিদিন মিছিল হয়, প্রতিদিন বাড়তে থাকে মিছিলের মানুষ। নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই কিছু একটা করতে হবে-এই মনোভাবে ২৭শে ফেব্রুয়ারী মুসলিমলীগ সরকার নিলো এক সিদ্ধান্ত। মমতাজ বেগমকে গ্রেফতার করতে হবে। বাঁধ দিতে হবে এই মিছিলের স্রোতে।নইলে যে চলছে না! ২৮ তারিখ। অন্ধকার থাকতেই গ্রেফতার করা হলো মমতাজ বেগমকে। ৪ বছরের ঘুমন্ত খুকুর কপালে একটা চুমু দিয়ে বের হয়ে গেল সে। হারিয়ে গেলো পুলিশের ভীড়ে সকলের মমতাজ আপা।
সে ভোরে বাতাস ছিলো উন্মাতাল! মানুষের কানে কানে বলে দিয়ে গেলো উন্মাতাল বাতাস সেই কথা, মমতাজ আপাকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। আলো ফোঁটার সময় বুঝি পায়নি সেদিন ভোর। তার আগেই হাজার হাজার মানুষ ঘিরে ফেলেছে নারায়নগঞ্জ থানা। সকাল নয়টা বাঁজতে বাঁজতে বন্ধ হয়ে গেছে রাস্তাঘাট মানুষের ভীড়ে। বন্ধ হয়ে গেছে স্কুল, বন্ধ হয়ে গেছে কলেজ, বন্ধ হয়ে গেছে বাড়ীর হেঁসেল। মমতাজ আপাকে ছাড়তে হবে, এই দাবীতে পথে নেমে এসেছে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা।
মহকুমা পুলিশ অফিসার মানুষের এই স্রোত দেখে ঘোষনা দিলো কোর্ট থেকে তাকে জামিনে ছেড়ে দেয়া হবে। উত্তেজনায় থরথর মানুষ মেনে নিলো সেই কথা। চারিদিক থেকে ঘিরে রেখে তারা নিয়ে এলো প্রিয় মমতাজ আপাকে কোর্ট চত্বরে। বার কাউন্সিলের সকল উকিল দাঁড়ালো সবার মামলা ফেলে রেখে, জামিনের জন্যে আবেদন করলো তারা।
উপেক্ষা হলো সকল আবেদন, জামিন হলো না তার। উপরের চাপে তাকে ঢাকার কারাগারে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দিলো আদালত। ক্ষোভে ফেঁটে পড়লো মানুষ। সারা শহর জুড়ে শুরু হলো মানুষের বিক্ষুব্ধ আলোড়ন। পুলিশের সাধ্য রইলোনা সেই আলোড়ন থামানোর। কোর্ট থেকে তাকে বের করতে পুলিশের চেষ্টাকে বার বার ঠেকিয়ে দিলো মানুষের ভালোবাসা।
চাঁষাড়া থেকে পাগলা পর্যন্ত ১৭০ টি গাছ কেটে রাস্তা বন্ধ করে দিলো জনতা। কিছুতেই নিতে দিবেনা তাদের আগুনের পাখিকে। একপর্যায়ে শুরু হলো পুলিশের নির্মম অত্যাচার। লাঠির আঘাতে আঘাতে রক্তাক্ত হলো হাজারো মানুষ, গ্রেফতার হলো ১২ বছরের বালক থেকে ৭২ বছরের বুড়ো। খান সাহেব ওসমান আলীর বাসায় হামলা করে তাকে গ্রেফতার করা হলো। ধরে নেয়া হলো শফি হোসেন, জামিল সহ সকল নেতাদের। ভরে গেলো থানা চত্বর গ্রেফতার করা মানুষের সারিতে। তবু যেনো মানুষ কমলো না রাস্তা থেকে। অবশেষে ডাকা হলো ই পি আর।
ঢাকা থেকে ট্রাকের পর ট্রাক বোঝাই হয়ে তারা এলো। সকাল এগারোটায় বের হয়ে পাগলা থেকে রাস্তার গাছ সরাতে সরাতে আর দুইপাশে সারি সারি সৈনিক দাঁড় করিয়ে রাখতে রাখতে তারা সন্ধ্যায় পৌঁছুলো নারায়নগঞ্জে। রাতের অন্ধকারে লোহার হেলমেট পড়ে সংগীন উঁচিয়ে তারা নিয়া গেলো তাকে। হারিয়ে গেলো মমতাজ আপা নারায়নগঞ্জ থেকে।
পরদিন সকালে মিছিলের মতো মানুষ এলো ঢাকা জেলে, নারায়নগঞ্জ থেকে বন্দী হয়ে।
দুইদিন পরে ৪ বছরের খুকুকে নিয়ে দেখা করতে এলো তার স্বামী। সরকারী চাকুরী করার কারণে তাকে বলা হয়েছে মমতাজ বেগমকে জানাতে, যদি সে বন্ডসই দেয় যে আর কোনদিন আন্দোলন করবে না, তাহলে তাকে মুক্তি দেওয়া হবে।
মমতাজ বেগম চুপচাপ শুনলেন তার কথা। খুকুকে একটু আদর করলেন, তারপর সেই পটলচেরা চোখদুটো তুলে ছলছল দৃষ্টিতে বললেন "আমি তা পারবো না, আমার জন্যে রক্তে নেয়েছে নারায়নগঞ্জ, আমি সেই রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবো না।"একরোঁখা স্বামী তার কথা শুনে বলে উঠলেন "তাহলে আমাদের হারাতে হবে"- চোখ তুলে আবার চাইলেন তিনি, খুকুকে একনজর দেখে নিয়ে বললেন " এ-ভার যদি সইতে না পারো, তাহলে ভুলে যাও আমাকে"- চলে গেলেন তিনি দেয়ালের ভিতরে ধীর পায়ে।
কয়েকদিন পরে পেলেন সেই চিঠিটি- তাকে ডিভোর্স দিয়েছে সেই মানুষটি যাকে ভালোবেসে তিনি ছেড়েছেন ঘর, ধর্ম আর দেশ। হারিয়ে গেলেন মমতাজ বেগম তার সোনার সংসার থেকে মানুষ আর ভাষাকে ভালোবেসে।
একদিন জেল থেকে ছাড়া পেলেন তিনি। ফিরে গেলেন না আর নারায়নগঞ্জে। কার কাছে ফিরবেন তিনি? মানুষের কাছে ফেরা যায়, কিন্তু তাকেতো পীড়া দেবে তার ঘর, যা তাকে করেছে পর। ঢাকায় রয়ে গেলেন তিনি। আনন্দময়ী গার্লস স্কুলে চাকুরী নিলেন। একসময়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায় চাকুরী চলে গেলো তার। প্রচন্ড অর্থকষ্টে থাকতে থাকতে একদিন তার আশ্রয় হল ঢাকা মেডিকেলে।
১৯৬৭ সালের কোন একদিন। ৩৭ বছরে হারিয়ে গেলেন মমতাজ বেগম সকল চাওয়া পাওয়ার বাইরে। । তার কন্যা খুকু তখন পশ্চিম পাকিস্তানে, স্বামীর সংসারে। তাকে কবর দেওয়া হলো আজিমপুর কবরস্থানে। কেউ জানলো না কোন কবরটি তার। হারিয়ে গেলেন মমতাজ বেগম কোন চিহ্ন না রেখেই।
একদিন একজনের পুরোনো কাগজ পত্র ঘাটতে ঘাটতে আমি পেলাম একটি মাইক্রোফিল্ম। বহু কষ্টে উদ্ধার করলাম সেটার লেখা। সেটা ছিলো তার ডেথ সার্টিফিকেট। হারিয়ে গেছে সেটা আমার কাছ থেকে ২৫ বছর আগে। আমি আজ মনে করতে পারিনা সেখানে দিনটা কত লেখা ছিলো। আমার কষ্ট হয়, সব হারানো মমতাজ বেগম হারিয়ে গেলো তার মৃত্যুদিবস থেকে শুধু আমার একটা ভুলের কারণে।

২১শে ফেব্রুয়ারী মিছিলে গুলি চালানোর কিছুক্ষন আগের ছবি

ভাষাসৈনিক মমতাজ বেগম
ফিরে আসা:
অবশেষে জানতে পারলাম, দীর্ঘ ৫৮ বছর পরে ফিরে এসেছেন হারিয়ে যাওয়া মমতাজ বেগম। নারায়নগঞ্জবাসী ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে তাদের আগুনের পাখিকে, তাদের বড় আপাকে। বিস্মৃতির অতল তলে হারিয়ে যেতে যেতে ফিরে এসেছেন মমতাজ বেগম নারায়নগঞ্জে। ৪ বছরের তাঁর সেই ছোট্ট খুকু আজ ৬২ বছরে এসে ফিরে পেয়েছে তাঁর মমতাময়ী মাকে নারায়নগঞ্জে। মর্গান গার্লস স্কুলের সামনের রাস্তাটার নাম এখন ,
'ভাষাসৈনিক মমতাজ বেগম সড়ক'।
আমি সালাম জানাই নারায়নগঞ্জবাসীকে শত কোটি সালাম।.
মানুষ বোঝ না!
....হেলাল হাফিজ

