Topic: খর বায়ু বয় বেগে_পথিক গুহ_KAL BOISAKHI

খর বায়ু বয় বেগে
পথিক গুহ

বৈকালের দিকটা হঠাৎ চারিদিক অন্ধকার করিয়া কালবৈশাখীর ঝড় উঠিল। ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছেন ওই বাক্যে। ‘অনেকক্ষণ হইতে মেঘ করিতেছিল, তবু ঝড়টা যেন খুব শীঘ্র আসিয়া পড়িল। অপুদের বাড়ীর সামনে বাঁশঝাড়ের বাঁশগুলো পাঁচিলের উপর হইতে ঝড়ের বেগে হটিয়া ওধারে পড়াতে বাড়ীটা যেন ফাঁকা ফাঁকা দেখাইতে লাগিল— ধূলা বাঁশপাতা, কাঁঠালপাতা, খড় চারিধার হইতে উড়িয়া তাহাদের উঠান ভরাইয়া ফেলিল। দুর্গা বাটীর বাহির হইয়া আম কুড়াইবার জন্য দৌড়িল— অপুও দিদির পিছু পিছু ছুটিল।’

kal boisakhi

কালবৈশাখীর ঝড়ে আম কুড়ানোর অভিজ্ঞতা কেমন? বিভূতিভূষণ লিখেছেন, ‘ধূলায় চারিদিক ভরিয়া গিয়াছে— বড় বড় গাছের ডাল ঝড়ে বাঁকিয়া গাছ নেড়া-নেড়া দেখাইতেছে। গাছেগাছে সোঁ সোঁ, বোঁ বোঁ শব্দে বাতাস বাধিতেছে— বাগানে শুক্‌না ডাল, কুটা, বাঁশের খোলা উড়িয়া পড়িতেছে— শুক্‌না বাঁশপাতা ছুঁচালো আগাটা উচুদিকে তুলিয়া ঘুরিতে ঘুরিতে আকাশে উঠিতেছে— কুক্‌শিমা গাছের শুঁয়ার মত পালকওয়ালা সাদা সাদা ফুল ঝড়ের মুখে কোথা হইতে অজস্র উড়িয়া আসিতেছে— বাতাসের শব্দে কান পাতা যায় না!... ঝড় ঘোর রবে বাড়িয়া চলিয়াছে। ঝড়ের শব্দে আম পড়ার শব্দ শুনিতে পাওয়া যায় না, যদি বা শোনা যায়, ঠিক কোন জায়গা বরাবর শব্দটা হইল— তাহা ধরিতে পারা যায় না। দুর্গা আট-নয়টা আম কুড়াইয়া ফেলিল, অপু এতক্ষণের ছুটোছুটিতে মোটে পাইল দুইটা।’

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: খর বায়ু বয় বেগে_পথিক গুহ_KAL BOISAKHI

উদ্দাম প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে ‘পথের পাঁচালী’র এই পর্বে অতঃপর অভিনীত এক করুণ নাটক। দারিদ্রের লাঞ্ছনা। পরের বাগানে আম কুড়াতে আসার জন্য অপু-দুর্গা ভর্ৎসিত। এবং উৎখাত হয়ে অন্য গাছের সন্ধানে। প্রকৃতি তত ক্ষণে করালরূপিনী। ‘দেখিতে দেখিতে চারিদিক ধোঁয়াকার করিয়া মুষলধারে বৃষ্টি নামিল... চারিধারে শুধু বৃষ্টিপতনের হুস্‌-স্‌-স্‌-স্‌ একটানা শব্দ, মাঝে মাঝে দমকা ঝড়ের সোঁ-ও-ও-ও, বোঁ-ও-ও-ও-ও রব, ডালপালার ঝাপটের শব্দ— মেঘের ডাকে কানে তালা ধরিয়া যায়... হঠাৎ ঝটিকাক্ষুব্ধ অন্ধকার আকাশের এ-প্রান্ত হইতে লকলকে আলো জিহ্বা মেলিয়া বিদ্রূপের বিকট অট্টহাস্যের রোল তুলিয়া এক লহমায় ও-প্রান্তের দিকে ছুটিয়া গেল। ক্বড়্‌-ক্বড়্‌-কড়াৎ!... ভৈরবী প্রকৃতির উন্মত্ততার মাঝখানে ধরা-পড়া দুই অসহায় বালক-বালিকার চোখ ঝলসাইয়া তীক্ষ্ণ নীল বিদ্যুৎ খেলিয়া গেল। অপু ভয়ে চোখ বুজিল।’

কালবৈশাখী এবং তার পরবর্তী বর্ষণ বিভূতিভূষণের কাহিনির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু তাতে অতিরিক্ত মাত্রা দিয়েছেন সত্যজিৎ তাঁর চলচ্চিত্রে। ‘অপুর পাঁচালি’-তে তাঁর স্বীকারোক্তি: ‘ছবির পক্ষে অপ্রয়োজনীয় বলে মূল বইয়ের একটানা অনেক বাগবিস্তার বর্জন করে ঘটনাগুলিকে আমি একটু অন্য ভাবে সাজিয়ে নিই, ফলে ছবির কাহিনিতে একটা নতুন বুনোট তৈরি হয়ে ওঠে।’ এই নতুনত্বের অন্যতম দুর্গার মৃত্যু। আবার সত্যজিৎ: ‘জংলা জায়গা, প্রবল ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, আর তারই মধ্যে আনন্দে আত্মহারা হয়ে নেচে বেড়াচ্ছে দুর্গা। ফলে নিউমোনিয়া হয়ে সে মারা যায়। কিন্তু, বৃষ্টিতে ভেজার ফলেই যে তার মৃত্যু ঘটল, মূল বইয়ে তা দেখানো হয়নি। ঝড়ের দৃশ্যের পরে-পরেই তার অসুস্থ হওয়া— এটা আমিই দেখাই। জঙ্গলে ঝড়বাদলের মধ্যে তার ওই আত্মহারা নাচ, দুর্গার মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ হিসাবে এটাকেই আমি তুলে ধরি। দুর্গার মৃত্যুর পরে আমার কাহিনিতে ধীরে-ধীরে উপসংহার টানি এবং দেখাই পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে হরিহর তাঁর পরিবার নিয়ে কাশীতে চলে যাচ্ছেন।’

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: খর বায়ু বয় বেগে_পথিক গুহ_KAL BOISAKHI

অবিশ্রাম বৃষ্টির মধ্যে দুর্গার নাচ যে মৃত্যুকে আবাহনের ইঙ্গিত, তা-ও অনের সমালোচক বলেছেন। আসলে ঝড়ের করাল রূপের মধ্যে একটি আসন্ন ধ্বংসের বীজ লক্ষ করেছিলেন তিনি। তাঁর চলচ্চিত্রের ভাষার পক্ষে হয়তো সেইটি ছিল স্বাভাবিক। অথচ, মোহিতলাল মজুমদার তাঁর ‘কালবৈশাখী’ কবিতায় সেই ভয়াল রূপেরই গভীরে সুপ্ত দেখেছেন সৃষ্টির অঙ্কুর। লিখেছেন,

নববর্ষের পুণ্য-বাসরে কাল-বৈশাখী আসে
হোক সে ভীষণ, ভয় ভুলে যাই অদ্ভুত উল্লাসে।

‘আকাশ ভাঙিয়া পড়ে বুঝি’, তবু কবির ‘প্রাণ ভরে আশ্বাসে’। কারণ,

চৈত্রের চিতা-ভস্ম উড়ায়ে জুড়াইয়া জ্বালা পৃথ্বীর
তৃণ-অঙ্কুরে সঞ্চারি রস, মধু ভরি বুকে মৃত্তির,
সে আসিছে আজ কাল-বৈশাখে—

আর, বৃষ্টির বন্দনাগানে লেখা ‘বর্ষামঙ্গল’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ আমাদের আশ্বাস দেন—

এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা,
গগন ভরিয়া এসেছে ভুবনভরসা—

ঝড় বাতাস কিংবা বাদল পৃথিবীর ভূগোলের এক বিচিত্র রসায়ন। বাতাসের কথা ধরা যাক, যা আমাদের সব চেয়ে কাছের, একেবারে গায়ে লেপটে থাকার জিনিস। এর প্রায় পুরোটা (শতকরা ৭৮ ভাগ) নাইট্রোজেন আর খানিকটা (২১ ভাগ) অক্সিজেন গ্যাসের অণু। বাকি অংশ জলীয় বাষ্প আর নামমাত্র দু’একটা মৌল। এক ঘন সেন্টিমিটার বাতাসে ও সবের অণুর সংখ্যা প্রায় ১০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০। অণুগুলো স্থির নয়। সব সময় ছুটোছুটি গুঁতোগুঁতিতে মত্ত। এ সবের ফলে যে ধাক্কা, তা-ই হল বাতাসের চাপ। সুতরাং, যেখানে যত বেশি অণু উপস্থিত, সেখানে বাতাসের চাপও তত বেশি। হাওয়া, আসলে, বেশি চাপের এলাকা থেকে কম চাপের এলাকার দিকে অণুদের দৌড়। আর, ঝড় সেই দৌড়ের তীব্র বেগ।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: খর বায়ু বয় বেগে_পথিক গুহ_KAL BOISAKHI

চাপ কম-বেশির মূলে প্রায়ই ভূমিকা থাকে তাপের। ধরা যাক, সূর্যের তাপে গরম হয়ে উঠল কোনও জায়গার বাতাস। তা হলে সে হবে হালকা। হালকা জিনিস ভেসে থাকতে চায়। মানে, ওপরে ওঠে। গরম বাতাস তাই বায়ুমণ্ডলে ওপরের দিকে জায়গা নেয়। ফলে, আগে সে যে জায়গা দখল করেছিল, সেখানে বাতাস কম। সেখানটায় বাতাসের চাপও কম। তখন, আশপাশের এলাকা, যেখানে বাতাস ঠাণ্ডা— ফলে ভারী, এবং বেশি চাপেও রয়েছে— সেখান থেকে ছোটে ওই কম চাপের এলাকার দিকে।

‘কালবৈশাখী তৈরি হওয়ার জন্য মোটামুটি ভাবে কতগুলো শর্ত পূরণ হওয়া চাই,’ আলিপুর আবহাওয়া অফিসে বসে ব্যাখ্যা করলেন বিজ্ঞানী গোকুলচন্দ্র দেবনাথ। ‘বায়ুমণ্ডলের নীচের দিকে যথেষ্ট জলীয় বাষ্পের জোগান প্রথমেই দরকার। এই হালকা জলীয় বাষ্প এর পর উপরে উঠে ঘনীভূত হয় ঠাণ্ডায়। তৈরি করে মেঘ। এই প্রক্রিয়া চালু থাকলে ঘটে আর একটা ব্যাপার। জল যে তাপ নিয়ে আগে বাষ্পে পরিণত হয়েছিল, যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে লীন তাপ, তা ঠাণ্ডায় মেঘে পরিণত হওয়ার সময় আবার উপরের বায়ুমণ্ডলকে ফেরত দেয়। ফলে, ওই বায়ুস্তর তখন গরম হয়। হয় হালকাও। ফলে, তা উঠতে চায় আরও উপরের দিকে। আকাশে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরির অনুকূল পরিবেশ এটা। বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হলেই কালবৈশাখী আসে না। তবে, কালবৈশাখী আসতে হলে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি অবশ্য দরকার।’

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: খর বায়ু বয় বেগে_পথিক গুহ_KAL BOISAKHI

গোকুলচন্দ্র জানালেন, পশ্চিমবাংলায় আছড়ে পড়া কালবৈশাখীদের জন্মের আঁতুড়ঘর প্রায় সব ক্ষেত্রেই ঝাড়খণ্ড বা তার সন্নিহিত এলাকা। কারণ, গ্রীষ্মকালে পূর্ব ভারতে ওই অঞ্চল সব চেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড গরম বাতাস এবং সেই সঙ্গে একটা ঘূর্ণাবর্ত না হলে কালবৈশাখী আসে না। পূর্ব ভারত আর বাংলাদেশে এর সময়কাল এপ্রিল-মে মাস। গ্রীষ্মের দাবদাহের কালে ঘন্টায় ৪৫ কিলোমিটারেরও বেশি বেগে ধাবমান বাতাস উত্তর-পশ্চিম থেকে ছুটে আসে দক্ষিণ-পূর্ব দিক লক্ষ্য করে। দক্ষিণ বঙ্গে এর আঘাত সাধারণত বিকেল চারটে থেকে রাত ন’টার মধ্যে। আর, উত্তরবঙ্গে মাঝরাত থেকে ভোরের আগে কোনও এক সময়। দুই বঙ্গে কেন এই তফাত? ‘হিল এফেক্ট’, মন্তব্য করলেন গোকুলচন্দ্র, ‘পাহাড় থাকায় উত্তরবঙ্গের ভূগোল যেহেতু আলাদা, সেহেতু তার জলবায়ুর হিসেব-নিকেশও একটু অন্য রকম। কালবৈশাখীর টাইম-টেবল তাই ওখানে ও রকম।’

কালবৈশাখী কেবল বৃষ্টিই আনে না, তার উদ্দাম ঝড় কখনও কখনও ঘটায় বিপুল ক্ষয়ক্ষতিও। এর পূর্বাভাস দিয়ে মানুষকে সাবধান করা যায় না কেন? ‘প্রশ্নটা জরুরি’, মন্তব্য করলেন গোকুলচন্দ্র, ‘তবে, আমরা, আবহাওয়াবিদেরা এ ব্যাপারে অসহায়।’ কেন? ‘ধরুন, আপনি বসে আছেন আমাদের অফিসে, ’ ব্যাখ্যা করলেন তিনি, ‘আর দেখলেন, হঠাৎ আলিপুর রোড থেকে কেউ তেড়ে আসছে আপনার দিকে। এত দ্রুত আঘাত হানবে সে যে, আপনি আত্মরক্ষার যথেষ্ট সময়ই পাবেন না। আততায়ীকে যদি আপনি দেখতে পান রেস কোর্সের পাশে, তবে আপনি সময় পাবেন আত্মরক্ষার। কালবৈশাখীর ব্যাপারটা ওই খুব কাছ থেকে ছুটে আসা ডাকাতের মতো ব্যাপার। এত অল্প ব্যাসের জায়গার মধ্যে তার সব কিছু যে, পূর্বাভাস দেওয়ার মতো সময় হাতে থাকে না আবহাওয়াবিদদের।’ গোকুলচন্দ্র জানালেন, কালবৈশাখীর পূর্বাভাস যাতে দেওয়া যায়, সে জন্য উদ্যোগী হচ্ছেন কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতের উত্তর- পূর্বাঞ্চলে গড়ে তোলা হবে ছোট ছোট অনেক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। যারা অল্প আয়তনের এলাকার মধ্যে নজর রাখবে বাতাসের গতিপ্রকৃতির ওপর। বিপদ বুঝলে তার সংকেত দিতে পারবে দ্রুত। এ কাজের জন্য হাতে নেওয়া হয়েছে এক নতুন প্রকল্প। ইণ্ডিয়ান মেটিওরোলজিকাল ডিপার্টমেন্ট-এর সঙ্গে এই উদ্যোগে শামিল হয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাটমস্ফিয়ারিক সায়েন্স বিভাগ এবং খড়্গপুরের আই আই টি।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: খর বায়ু বয় বেগে_পথিক গুহ_KAL BOISAKHI

কালবৈশাখীর পূর্বাভাসের ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বড় বিপদের কথা মাথায় রেখে। কোন বিপদ? ঘূর্ণিঝড়। বাতাসের বেগ খুব বেশি, ঘন্টায় ১২০-১২৫ কিলোমিটার হলে সমুদ্র-উপকূলবর্তী এলাকায় যা প্রায়ই ভয়ঙ্কর চেহারা নেয়। শুধু বাতাস নয়, বেগে ধাবমান জলের বেলাতেও ব্যাপারটা লক্ষ করা যায়। নদীতে স্রোতের বেগ বেশি হলে দেখা যায়, চলতে চলতে জল মাঝে মাঝে ঘূর্ণির মতো পাক খাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ও বাতাসের সমুদ্র, অর্থাৎ বায়ুমণ্ডলে ও রকমই একটা ক্রিয়া। কেবল অঞ্চল বিশেষের মানুষের ভাষায় তার আলাদা আলাদা নাম। ভারত মহাসাগরে যা সাইক্লোন, আটলান্টিক কিংবা পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে যা হারিকেন, তা-ই পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে টাইফুন। আবার, অষ্ট্রেলিয়ার মানুষেরা ওই একই জিনিসকে বলেন উইলি-উইলি।

নামে কিছু যায়-আসে না। বিজ্ঞানীরা চিন্তিত বিশেষ কতগুলো ব্যাপারে। এক, ঘূর্ণিঝড় ক্রমেই বেশি বিধ্বংসী চেহারা নিচ্ছে। দুই, তাদের সংখ্যাও বাড়ছে। গত ১৭ মার্চ ‘সায়েন্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকায় জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-র গবেষিকা ডঃ জুডিথ কারি ও তাঁর সহকর্মীদের এক সমীক্ষার রিপোর্ট। ১৯৭০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর সবক’টি সাগরে উদ্ভূত ঘূর্ণিঝড়ের রেকর্ড বিশ্লেষণ করেছেন ওঁরা। পঁয়ত্রিশ বছরের ঘূর্ণিঝড়ের হিসেব থেকে তাদের সংখ্যা ও শক্তিবৃদ্ধির ওই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হচ্ছে। এ সবের মূলে কারণ? গ্লোবাল ওয়ার্মিং। হ্যাঁ, জনপ্রিয় কল্পবিজ্ঞান কাহিনিকার মাইকেল ক্রাইটন তাঁর সাম্প্রতিকতম উপন্যাস ‘স্টেট অব ফিয়ার’-এ যতই গাল পাড়ুন পরিবেশবাদীদের, আবহাওয়ার তাপমান বেড়ে ওঠার উদ্বেগটা মোটেই হুজুগে চেঁচামেচি নয়, রীতিমত বাস্তব ঘটনা।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: খর বায়ু বয় বেগে_পথিক গুহ_KAL BOISAKHI

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা-র বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি জানিয়েছেন, ২০০৫ সাল ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে উষ্ণতম বছর। গবেষকেরা দেখেছেন, আবহাওয়ার উষ্ণতা যত বাড়ছে, সি-সারফেস টেম্পারেচার (এস এস টি), অর্থাৎ, সমুদ্রে জলের উপরিতলের তাপমাত্রা তত বেশি হচ্ছে। পঁয়ত্রিশ বছরে এস এস টি বেড়েছে এক ডিগ্রি ফারেনহাইট। ডঃ কারি ও তাঁর সহকর্মীদের অভিমত, ক্রমবর্ধমান এস এস টি পৃথিবী জুড়ে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি ও সংখ্যাবৃদ্ধির কারণ। তাঁদের অনুমান, এস এস টি ক্রমশ আরও বাড়বে। আর তার দরুন ঘূর্ণিঝড়ের বিপদও ভবিষ্যতে ঊর্ধ্বমুখী হবে।

কেন? সাগরের জল পৃথিবীতে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস শোষণের সব চেয়ে বড় ভাণ্ডার। কিন্তু, তাপমাত্রা বাড়লে সেই জলের ওই শোষণ-ক্ষমতা কমে। তাই এস এস টি যত বাড়বে, সমুদ্র তত কম কার্বন ডাইঅক্সাইড নিজের মধ্যে রাখবে। বায়ুমণ্ডলে বাড়বে ওই গ্যাসের পরিমাণ। সূর্যের থেকে যে তাপ পায় পৃথিবী, তার অনেকটাই সে আবার ফেরত পাঠায় মহাশূন্যে। এই কাজটাতে বাধা দেয় কার্বন ডাইঅক্সাইড। কিছুটা তাপ আটকে রাখে বায়ুমণ্ডলে। রাখে বলেই রাতের বেলায় সূর্য না থাকলেও পৃথিবীতে অন্ধকার এলাকা হিমঠাণ্ডা হয়ে যায় না। সেটা ভাল, কিন্তু বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ খুব বেড়ে যাওয়াও বড় বিপদ।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: খর বায়ু বয় বেগে_পথিক গুহ_KAL BOISAKHI

তখন সূর্য থেকে পাওয়া তাপের অনেকটা আটকে থাকে পৃথিবীতে। কার্বন ডাইঅক্সাইড, অতএব, গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর বড় সহায়ক। আর, এই ব্যাপারটা যেন এক দুষ্টচক্র। গ্লোবাল ওয়ার্মিং মানে এস এস টি বেড়ে যাওয়া। তার ফলে বায়ুমণ্ডলে বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইড। এবং বেশি গ্লোবাল ওয়ার্মিং। ঘূর্ণিঝড়, সুতরাং, আগামী দিনে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে বাধ্য।

দুঃখের ব্যাপার এটাই যে, ওই সর্বনাশের মূলে দায়ী মানুষই। কিংবা তার সভ্যতার প্রথাগত বিস্তার। তেল কয়লা আর কাঠ পুড়িয়ে আমরাই প্রতি দিন বায়ুমণ্ডলে উগরে দিচ্ছি টন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড। উন্নত দেশগুলো আবার এই অপরাধে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। আমেরিকা, যার জনসংখ্যা পৃথিবীর মোটের ৫ শতাংশও নয়, সে একাই বাতাসে ঢালছে ২৫ শতাংশ গ্যাস। এ ছাড়া পৃথিবী জুড়ে চলেছে জঙ্গল সাফ করে জনবসতি বাড়ানোর কাজ। অথচ, গাছ তার নিজের খাবার গ্লুকোজ উৎপাদন করতে গিয়ে বাতাস থেকে গ্রহণ করে কার্বন ডাইঅক্সাইড। আর, ছাড়ে অক্সিজেন। সুতরাং, বনাঞ্চল কমে যাওয়া মানে বাতাসে ওই গ্যাসের পরিমাণ ক্রমশ বেড়ে চলা।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: খর বায়ু বয় বেগে_পথিক গুহ_KAL BOISAKHI

মানুষের তৈরি বিপদের দরুণ ঘূর্ণিঝড়ের বাহুল্য আর ভয়াবহতা বৃদ্ধি যে নিশ্চিত, এটা ধরেই নিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাই এখন চেষ্টা চলেছে পরিত্রাণ লাভের। কী ভাবে? ঘূর্ণিঝড়কে নিয়ন্ত্রণে এনে। হ্যাঁ, অবিশ্বাস্য শোনালেও, এ রকম স্বপ্ন এখন দেখছেন কোনও কোনও গবেষক। ভাবছেন, যদি কোনও কৌশলে কমানো যায় ঘূর্ণির বেগ। অথবা, বদলানো যায় ঝড়ের গতিপথ। আমেরিকায় ম্যাসাচুসেটস-এর লেক্সিংটন-এ অ্যাটমস্ফোরিক অ্যাণ্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ-এর বিজ্ঞানী ডঃ রস হফম্যান গবেষণা করছেন এ সব নিয়ে।

ডঃ হফম্যান-এর চিন্তায় রয়েছে কেওস থিয়োরি। সেই তত্ত্ব, যা বলছে, অনেক কিছুর আচরণ আগাম অনুমান অসম্ভব। উদাহরণ— আবহাওয়া। রোদ ঝড় বৃষ্টির পিছনের বিজ্ঞানটা পণ্ডিতদের অজানা নয়। অথচ, সব জেনেও আবহাওয়াবিদেরা পাঁচ দিনের বেশি পরের পূর্বাভাস দিতে পারেন না। কেন?

বিজ্ঞানের পরিভাষায় ব্যাপারটাকে বলে ‘এক্সট্রিম সেনসিটিভিটি টু ইনিশিয়াল কণ্ডিশনস’। তিল থেকে তাল। কারণের এক চুল হেরফেরে কার্যে বিশাল ফারাক। জিনিসটা বোঝাতে বলা হয় ‘বাটারফ্লাই এফেক্ট’। প্রজাপতির গল্প। ধরা যাক, কলকাতায় ময়দানে ডানা ঝাপটাল এক প্রজাপতি। ফলে এখানে হাওয়ায় লাগল যে দোলা, তা একের পর এক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় নিউ ইয়র্ক শহরে তৈরি করল ঝড়-বৃষ্টি। বাস্তবে হয়তো এমনটা হয় না। কিন্তু, উদাহরণটা জব্বর। শুরুতে সামান্য হেরফেরের দরুন পরিণামে বিশাল ফারাক। আবহাওয়াবিদদের বক্তব্য, বিজ্ঞানটা জানা থাকলেও উৎসগুলো চুলচেরা ভাবে কখনও জানা যায় না বলেই নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া যায় না রোদ ঝড় বৃষ্টির।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: খর বায়ু বয় বেগে_পথিক গুহ_KAL BOISAKHI

কেওস থিয়োরির ওই প্রতিপাদ্যকেই কাজে লাগাতে চান ডঃ হফম্যান। কম্পিউটারে অঙ্ক কষে তিনি দেখেছেন, জলীয় বাষ্প, বৃষ্টি আর বাতাসের তাপমাত্রার পরিমাণ বদলাতে পারলে ঘূর্ণিঝড় হতে পারে দুর্বল। কিংবা পালটে যেতে পারে তার গতিপথ। তাই ঘূর্ণিঝড়ের জন্মকালে নানা রকম ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন ডঃ হফম্যান।

যেমন, মেঘ লক্ষ্য করে বিমান থেকে রাসায়নিক ছুড়ে দিয়ে বৃষ্টিপাত ঘটানো। ঝড়ের পথ বরাবর জাহাজ থেকে সমুদ্রের জলে তেল ছিটিয়ে তার বাষ্পীভবন কমানো। মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহে বসানো শক্তিশালী আয়নার সাহায্যে সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত করে বাতাসের উষ্ণতা বাড়ানো। আমেরিকান মেটিওরোলজিকাল সোসাইটি-র বুলেটিন-এ দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে ডঃ হফম্যান জানিয়েছেন, ওই সব উদ্যোগ নেওয়া হলে মানুষের নিয়ন্ত্রণে আসবে ঘূর্ণিঝড়।

অবশ্য, ভবিষ্যতে তার ফলে দেখা দিতে পারে অন্য বিপদ। কী? রাজনৈতিক। ডঃ হফম্যানের মন্তব্য: ‘নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে এক রাষ্ট্র যদি ঘূর্ণিঝড় পাঠিয়ে দেয় প্রতিবেশীর এলাকায়? ১৯৭০-এর দশকে রাষ্ট্রসংঘে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী আবহাওয়াকে যুদ্ধাস্ত্রে পরিণত করা যদিও নিষিদ্ধ, তবু সুযোগ থাকলে হয়তো লোভ সামলাবে না কোনও কোনও দেশ।’ মিথ্যে বলেননি তিনি। নিজেদের পিণ্ডি বুধোদের ঘাড়ে চাপাতে উধোরা যে সব সময়ই তৈরি!

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা ২৬ চৈত্র ১৪১২ রবিবার ৯ এপ্রিল ২০০৬

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up