Topic: ভাল থেকো কলকাতা_তসলিমা নসরিন_VALO THEKO KOLKATA_TASLIMA NASRIN

ভাল থেকো কলকাতা
তসলিমা নসরিন

কলকাতা বন্দর থেকে জাহাজটি হঠাৎ আকাশের দিকে উড়াল দিয়ে আমার মগ্নতা ভেঙে দিল। জানালার পাশে উদাস বসে আমাকে বিদেয় বলতে আসা বন্ধুদের কথা ভাবছিলাম তখন। মেঘ ফুঁড়ে জাহাজটির অমন আগুনের মতো আকাশের দিকে যেতে থাকা দেখে আমি যে এত আকাশে আকাশে কাটিয়েছি, জীবনের কত মাস বছর কাটিয়ে দিয়েছি আকাশেই, আমিও খুব ভয় পেয়ে গেলাম। ভয়টি বুকের সিন্দুকের গোপন তালা খুলে উঠে এসে চোখের সামনে কয়েকটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।

আমি যাচ্ছি কোথায়? কার কাছে যাচ্ছি? কেন যাচ্ছি? প্রশ্নগুলো কিন্তু দীর্ঘ এই দুঃসহ যাত্রায় আমার বই পড়া-গান শোনা-ঝিমোনো-ঘুমনো-জেগে ওঠা-চা খাওয়া-ভাবা-না ভাবার এক কিনারে ঠায় দাঁড়িয়েই রইল। প্রশ্নের উত্তরগুলো যত আমি নিজেকে বলি, তত দেখি উত্তরের ছুরি আমাকে চাক চাক করে কাটছে। আমি যাচ্ছি কোথাও, দূর দেশে, ভিন দেশে, শখে যাচ্ছি না, সুখে যাচ্ছি না, না গিয়ে কোনও উপায় নেই বলে যাচ্ছি। আমি যাচ্ছি, নিজের জন্য তো যাচ্ছিই না, অন্য কারও জন্যও যাচ্ছি না। যাচ্ছি, আমার মাটিতে আমার কোনও জায়গা নেই বলে, যাচ্ছি আমার ঘরে আমার কোনও ঘর নেই বলে। যাচ্ছি বনবাসে, দূরবাসে, পরবাসে, দুঃসাহসে।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: ভাল থেকো কলকাতা_তসলিমা নসরিন_VALO THEKO KOLKATA_TASLIMA NASRIN

দশ বছর আগে ঢাকা ছাড়তে হয়েছিল, নিজের প্রাণ বাঁচাবার জন্য ছিল সেই ছাড়া। তখন কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছির উত্তর ছিল যেখানেই যাচ্ছি বাঁচতে যাচ্ছি। বাঁচতে গিয়েছিলাম, কিন্তু একটি গভীর গোপন স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলাম যে, ফিরব এক দিন। সেই ফেরা, আজ এতগুলো বছর চলে গেল, আর হল না। আজও আমার জন্য ও-দেশের দুয়োরখানি সাঁটা। দেশটি এখন আমার কাছে বড় ধূসর ধূসর। আমি জানি না, কেউ আর মনে রেখেছে কি না যে আমি বলে একটি বস্তু একদা এক কালে ছিলাম ওখানে, ওখানেই আমার জন্ম ছিল, আমার সব ছিল, জীবন ছিল, আমার বড় হওয়া, বেড়ে ওঠা। আমি জানি না ও-দেশের কেউ আর মনে করে কি না আমি তাদের কেউ হই, কোনও কালে কেউ হতাম। জানি না কারও দূরতম ভাবনার মধ্যেও আছে কি না যে ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরুক। ও-দেশে তো কেউ নেই আমার আপন আর! মা ছিলেন, নেই। বাবা ছিলেন, নেই। মা আমার ঘরদোর গুছিয়ে রাখতেন কোনও এক দিন আমি দেশে ফিরব এই আশায়। এখন তো গুছিয়ে রাখার কেউ নেই। এখন আমার সেই সাজানো ঘরটি এলোমেলো হতে হতে, ঘরে ধুলো জমতে জমতে ঘরটি আদ্যন্ত অচেনা হয়ে গেছে। উইপোকা, ঘুনপোকা, মানুষপোকা আমার ফেলে আসা জিনিসগুলো খেতে খেতে কিছু আর অবশিষ্ট রাখেনি আমার জন্য। হা জিনিস! জিনিস দিয়ে কী হয়, বাড়িঘরে কী হয়, যদি ভালবাসা না থাকে? মা নেই, কিন্তু বাপ তো আছেন— যা কিছু ছিল, যারা ছিল সব কিছুকে, সবাইকে হারাতে হারাতে নিঃস্ব হয়ে শেষ সম্বল বাবাকে যখন আঁকড়ে ধরেছিলাম, তখনই তাঁর অসুখ করল। আমাকে খুব দেখতে চেয়েছিলেন বাবা। কিছুতেই তিনি কোথাও হারিয়ে যেতে চাইছিলেন না আমাকে একটি বার না দেখে, আমাকে আদর না করে, আমার হাতটি টেনে তাঁর বুকের কাছে নিয়ে সেই আগের মতো গল্প না করে। আমি পাগলের মতো একটি বার, অন্তত একটি বার বাবাকে দেখার জন্য কেঁদেছি। নাহ্‌, আমার কান্নায় কারও মন গলেনি। আমার জন্য দুয়োর খোলা হয়নি। আমাকে আমার দেশটিতে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। খালেদাও দেননি অনুমতি, হাসিনাও দেননি। আমি কি ও দেশের নাগরিক নই? আমি নাগরিক। কোনও আইনে কি তাঁরা আমাকে বাধা দিতে পারেন? না, পারেন না। আহা দেশ, প্রিয় দেশ! এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...

অন্নদাশঙ্কর রায় এক বার বলেছিলেন, বাংলাদেশ হল তসলিমার মা, আর পশ্চিমবঙ্গ মাসি। কলকাতার মানুষ আমাকে ভীষণ রকম ভালবাসছে দেখে তিনি কটাক্ষ করে নয়, বরং খুশিতে বলে উঠেছিলেন, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। আমি মা মাসি বুঝি না। যেখানে ভালবাসা পাই, সেখানেই আমি আমার মাকে পাই। মা এখন আমার কাছে আর রক্তমাংসের কোনও মানুষের শরীর নয়। মা আমার কাছে ভালবাসা। নিখুঁত, নিখাদ ভালবাসা। কলকাতাকে এখন আমার আর মাসি বলে মনে হয় না, মা বলে মনে হয়। স্বদেশ আমার কাছে কোনও মাটি নয়, গাছগাছালি নয়, নদী নয়। ভালবাসা ভরা একটি হৃদয়ই আমার কাছে নিরাপদ একটি স্বদেশ। যখন কেউ নেই, ভালবাসার কেউ নেই কোথাও, যখন দৈত্যের মতো দেখতে এক শূন্যতা আমাকে মুঠোর মধ্যে লুফে নিয়ে মৃত্যু মৃত্যু খেলছে, তখন নিজের সঙ্গে নিভৃতে যে ভাষায় কথা বলি, যে ভাষায় স্বপ্ন দেখি, সে ভাষাটিই আমার বড় আপন হয়ে আমাকে বাঁচায়। কী রকম যে অন্ধের মতো আঁকড়ে ধরি! মাতৃভাষাটিই আমার কাছে মাতৃভূমি হয়ে ওঠে।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: ভাল থেকো কলকাতা_তসলিমা নসরিন_VALO THEKO KOLKATA_TASLIMA NASRIN

কলকাতা ছেড়ে আমাকে অন্য কোথাও যেতে হয় কেন? এই প্রশ্নটি আমি উড়োজাহাজ থেকে বারবারই ছুঁড়ে দিয়েছি নীচে গঙ্গার দিকে, গঙ্গার উদার তীরের দিকে, যে তীরে কত শতাব্দী ধরে কত কেউ ঘর বানিয়েছে, কত দূর দূর দেশ থেকে কত রকমের, কত ভাষার, কত রঙের মানুষ এসে বাস করেছে। আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর কেউ দেয়নি। মিথ্যে বলা যাদের রক্তে, তারাও হয়তো বলতে লজ্জা পাবে যে আমি বাঁচার জন্য কলকাতা থেকে চলে যাচ্ছি। আমি তো বাঁচার জন্য কলকাতা থেকে কোথাও যাই না। বাঁচার জন্য আমি কলকাতায় ফিরি। প্রাণবায়ু নিতে ফিরি, ভালবাসা নিতে ফিরি। ভালবাসার উষ্ণ স্পর্শ যে জীবনে থাকে না, সে জীবন শুকিয়ে মরে যায়। বিদেশে কি আমি ভাল নেই? হ্যাঁ, ভাল আছি। ভাল থাকা বলতে যদি ভাল থাকা, ভাল খাওয়া, ভাল পরা বোঝায়, তবে আমি নিশ্চয়ই ভাল আছি। বিদেশ আমাকে পরম আদরে মাথায় তুলে রাখে, আবার পরম হেলায় মাচায় তুলে রাখে। কিন্তু আমি তো চাই ধুলোয় নামতে, ধুলোয় গা ডুবিয়ে গোল্লাছুট খেলতে। বিদেশ আমার গায়ে আঁচড় লাগতে দেয় না, কিন্তু কে বলেছে, আঁচড় লাগুক, আমি চাই না? আমি কি কাঁটায় গা ছিঁড়ে ছিঁড়ে এক কালে, যে করেই হোক, যেখানে যাওয়ার সেখানে গিয়ে আনন্দ পাইনি? কোথায় কী ছড়ে গেল, ঝরে গেল, তা কি কখনও কোনও বিষয় ছিল? কী লাভ নিস্তরঙ্গ নিস্পৃহ নিষ্প্রভ একটি নিরুদ্বেগ নিশ্চিন্ত জীবন নিয়ে উত্তরের পরিচ্ছন্ন পরিপাটি নির্বীজ নির্জীব দেশগুলোর গাঢ় অন্ধকারে বরফের মতো পড়ে থেকে! এ ভাবে বেঁচে কী লাভ হয়, কেবল নির্বোধের মতো বাঁচা ছাড়া? অন্য সংস্কৃতির খোলা জলে-তোলা জলে-ঘোলা জলে ডুবে-ভেসে ক্লান্ত হয়ে কূল ফিরে পেয়ে কেবল পুরনো জীবনের দিকে তৃষ্ণার্ত তাকিয়ে থাকা ছাড়া? আমি তো মানুষ, দক্ষিণের দেশের মানুষ, আমি তো উষ্ণতা চাই, টগবগ করে ফোটা চাই, আমি তো আগুন চাই। আমি তো স্ফুলিঙ্গ ছড়াতে চাই সহস্র বারুদ-শরীরে। বিদেশ যত ভালই হোক, যতই আদর আমাকে এই বিদেশ করুক, বিদেশ তো বিদেশই। এই এত বছর হয়ে গেল, এক মুহূর্তের জন্যও আমার এই বিদেশকে বিদেশ ছাড়া কিছু মনে হয়নি। বিদেশকে দেশ করে নিতে আর যারা পেরেছে, পেরেছে, আমি পারিনি। বুকের মধ্যে দিনমান একটি বাংলা পুষি বলেই পারিনি, বাংলার ঘোরে বেলা পার করি বলে পারিনি।


কত বছর হয়ে গেল নিজের কোনও দেশ নেই আমার, যে দেশে জন্মেছি, সে দেশ বলেই দিয়েছে যে, সে দেশ আমার নয়। যে দেশে আমি বাস করি, সে দেশ তো আমার নয়ই। আর, যে দেশকে আমি দেশ বলে ভাবি, যে বাংলায় আমি পৌঁছে পরম আহ্লাদে বলতে পারি, আমার পুব নেই তো কী হয়েছে, পশ্চিম তো আছে! সেই পশ্চিম যদি কথায় কাজে বুঝিয়ে দেয়, চোখে আঙুল দিয়ে নড়তে না চাওয়া টনকখানা নড়িয়ে দিয়ে বলে দেয় যে, তুমি বিদেশি, যদি কানের কাছে বিপদঘন্টির মতো বিচ্ছিরি একটি ঘন্টা বাজিয়ে আমাকে কাঁপিয়ে দিয়ে হঠাৎ এক দিন বলে বসে, অনেক হল, এ বার পথ মাপো, তল্পিতল্পা গুটিয়ে নির্বাসনে যাও, তবে যাব কোথায়? কলকাতা কি কখনও শুধিয়েছে, পাশে বসে, খুব আলতো করে পিঠে একটি হাত রেখে, মায়ের হাতের মতো হাত রেখে, এলোচুলগুলিকে মুখের ওপর থেকে সরিয়ে দিতে দিতে, ভালবেসে— কোথাও কি তোমার যেতে ইচ্ছে করে? কোথাও আমার যেতে ইচ্ছে করে না শুনে কলকাতা এখনও কেন বলে না, তুই কোথাও আর যাস নে। এই নে ঘরদুয়োর, এই নে উঠোন, তাজা একটি মাধবীলতার গাছ নে। থেকে যা। কোলে থেকে যা, বুকে থেকে যা।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: ভাল থেকো কলকাতা_তসলিমা নসরিন_VALO THEKO KOLKATA_TASLIMA NASRIN

এত যে মা ভাবি, তার পরও মা হতে গিয়েও কলকাতা মা হয় না। কেউ কেউ চোখ রাঙায় বলে হয় না। চোখ যে রাঙাতে পারে কেউ, দু’বছর আগেও জানা ছিল না। এখন দিন পাল্টে যাচ্ছে। বাতাসে এখন ভ্রূকুটি, ঘেন্না খলসে মাছের মতো সাঁতার কাটে। এখন আমার ধরনধারন অনেকের সয় না। দ্বিখণ্ডিত নামের দলিলটি দুম করে নিষিদ্ধ হয়ে গেল। বুদ্ধজীবীরা আমার ছায়া মাড়াচ্ছেন না। আমি নাকি কেউটের কেউটে। স্বচ্ছ করে কিছু বুঝে উঠবার আগে, দ্বিখণ্ডিতর শত খণ্ডে টুকরো হওয়ার কারণটি খুঁজে পাওয়ার আগেই দেখি আমি অনেকগুলো পুরনো বন্ধু হারিয়ে বসে আছি। কী অপরাধ আমার?

অপরাধ একটিই। বেয়াদবের মতো বই লিখেছি। রীতিনীতি না মেনে বই লিখেছি। এর পর তো মুখে চুনকালি প্রায় পড়ে পড়ে, জুতোর মালা গলায় কেউ পরায় বলে! বন্ধু হারানো, তার ওপর চুনকালি আর জুতোর অপমান হতাশার কোনও এক গা-জ্বলা-বীভৎসতার দিকে ধেয়ে যাচ্ছে আমাকে নিয়ে— আর তখনই আমাকে অবাক করে দিয়ে বৃষ্টির মতো ভালবাসা ঝরাচ্ছে কারা যেন, পুরনো বন্ধু হারানোর বেদনাগুলো টুপ টুপ করে আমার ভেজা গা থেকে জলের মতো ঝরে যাচ্ছে, কারা যেন ঝরিয়ে দিচ্ছে। আমার ঘরখানাকে নতুন বন্ধুত্বে ভরিয়ে দিচ্ছে, ঘরকে ঘর বলে মনে হয়নি আমার, মনে হয়েছে আস্ত একটি বাগান।

এ বারের কলকাতায় দেড় মাস যেন দেড় দিনে পার হয়ে গেল। বুঝেই উঠতে পারিনি দিন যাচ্ছে। গোপনে গোপনে দিন চলে গেছে। রাতে ঘুমোতাম না, সময় নষ্ট বলে মনে হত। কলকাতা ঘুমোত আর পাশে জেগে বসে কলকাতার নিষ্পাপ শিশুমুখটি দেখতাম। সূর্য ওঠা দেখতাম প্রতি দিন। কলকাতার আকাশকে, ওই আকাশে ওঠা সূর্যকেও বড় আপন মনে হত। প্রতি ভোরে বিরাটি থেকে আমাকে ফুল পাঠাতেন অনিল দত্ত। কৌতূহলে, কৃতজ্ঞতায় এক দিন যাই দেখতে তাঁকে, অনিল দত্তকে। কেন ফুল? তিনি ভালবাসেন আমার লেখা, তাই ফুল। বললেন যে, তিনি কোনারক দেখেছেন, অজন্তা ইলোরা দেখেছেন, কিন্তু কোনারক বা অজন্তা ইলোরার শিল্পীদের চোখে দেখেননি। কেবল শ্রদ্ধা জানিয়েছেন মনে মনে। আর, তার পর এখন রক্তমাংসের এক শিল্পীকে নাকি চোখের সামনে দেখছেন। আমাকেও তিনি শ্রদ্ধা জানালেন একই রকম করে। আশি পার হওয়া অনিল দত্ত। গভীর আবেগে আমাকে তিনি মন্দির বলে, ভগবান বলে ডেকে ওঠেন। উচ্ছ্বাস আছে তাঁর উচ্চারণে, উচ্ছ্বাসে উপচে ওঠে চোখে চোখের জল, আর তাঁর ওই উচ্ছ্বাস আমাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে রাখে লজ্জায়, আমাকে কুণ্ঠিত কুঞ্চিত করে ছোট একটি জড় বস্তু বানিয়ে বসিয়ে রাখে। আমি জানি তিনি যে মুকুট আমার মাথায় পরিয়ে দিয়েছেন, তা পাওয়ার সামান্যতম যোগ্য আমি নই। কিন্তু, আমি কী করে অস্বীকার করব যখন তিনি স্পর্শ করেন আমাকে গভীর মমতায়, সেই হাতটি, আমি তো অনুভব করি, আমার খুব আপন হাত। বাবার হাত কি? নাহ্‌ আমার বাবার হাতও এত আপন ছিল না আমার।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: ভাল থেকো কলকাতা_তসলিমা নসরিন_VALO THEKO KOLKATA_TASLIMA NASRIN

আমরা কেউ আমাদের আত্মীয় নির্বাচন করি না, নির্বাচন করি বন্ধু। আমাদের রুচি মনন, আমাদের বোধ বুদ্ধি দিয়ে বন্ধু নির্বাচন করি আমরা। রক্তের সম্পর্ক কখনও আমার কাছে তাই বন্ধুত্বের চেয়ে বড় নয়। বন্ধুরাই আমার সব চেয়ে বড় আত্মীয়। কলকাতায় তো আর সারা ক্ষণই সুখের স্রোতে ভাসিনি, দুঃখ এসে অনেক বারই দরজায় নাছোড়বান্দার মতো দাঁড়িয়ে থেকেছে। বন্ধুরাই তখন আমার নিষ্পন্দ বসে থাকা থেকে আমাকে টেনে তুলে আমাকে বুঝতে না দিয়ে বুজিয়ে দিয়েছে বুকের ভেতর জেগে উঠতে থাকা কষ্টের পুকুর। আকাশের মতো আগে যেমন ছিলেন, তেমনই ছিলেন শিবনারায়ণ রায়, অম্লান দত্ত, নিখিল সরকার। নতুন করে মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে প্রাণের গল্প হল। কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসী বলে দুজনে মিলে যেমন পারি কিছু কাজ করেছি। কাজের আনন্দ অন্য রকম। এই আনন্দ লাঙলবেড়িয়া গ্রামে পর্যন্ত এক দিন আমাদের নিয়ে চলে গেল। সুকুমারী ভট্টাচার্যর সঙ্গে আগেও হয়েছে, এ বারও গল্প হল। বেদ আর কোরানের মিলগুলো নিয়ে গল্প— কী করে পুরুষেরা এই সব রচনা করেছে, কী কারণে করেছে। আহা, যদি ওরাও বুঝতে পারত, নামাজ রোজায় পুজো আচ্চায় জীবন কালি করছে যে মেয়েরা! আকাশের মতো এক সময় ছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। তাঁর না-থাকাকে এ বার সয়নি আমার। তিনি আর আগের মতো আমার জন্য অপেক্ষা করে ছিলেন না তাঁর বালিগঞ্জের বাড়িটিতে! শেষ বার যখন তাঁকে দেখেছি, তাঁর জ্ঞান নেই বোঝার যে, আমি দাঁড়িয়ে আছি পাশে। আগের দিন তিনি নাকি বার বার আমার কথা বলেছেন, আমি তাঁকে দেখতে যাব বলে সারা দিন আমার অপেক্ষা করেছেন। কেন যাইনি সে দিন? ভুলগুলো শুধরে নিতে চাই। কিন্তু সে দিনটিকে শত চাইলেও আমি আর ফিরিয়ে আনতে পারি না। শরৎ ব্যানার্জি রোডে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই ঘরটিতে ঢুকতেই তাঁর বিকট না-থাকাটি ধারালো দাঁতে আমার বুকের মধ্যিখানে যেন কামড় বসালো। অমল হাসির মানুষটি নেই আর, তাঁর সেই চৌকিটিও নেই। নেই, নেই। কত কিছু যে নেই। তার পরও আমরা কী করে যে বেঁচে থাকি, কী করে যে এত নেই-এর মধ্যে, এত তুমুল আর্তনাদ বুকের ভেতর নিয়ে কী করে যে বাঁচি! মানুষের মতো, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, পাষাণ আর কিছু হয় না। আবার এই মানুষের হৃদয়েই তো ভেঙে চুরে ডাকতে পারে ভালবাসার বান। মানুষ বড় অদ্ভুত। মানুষ বড় সুন্দর।

কেবল তো আকাশ-আকাশ-মানুষ নিয়েই আমার জীবন নয়। আমি তো ধুলো মাটির মেয়ে, গাছে চড়া, ফুর্তি করা, সাঁতার কাটা দস্যি জাতের মেয়ে। অসাধারণ মানুষ নিয়ে আমি সত্যিই বেশি দিন চলতে পারি না। সাধারণের কাছে আমাকে ফিরতে হয়। ফিরতেই হয়। আমার কলকাতার জীবন বরাবরের মতোই সাধারণে উথলে উঠেছে। অসাধারণ কিছু পুরনো বন্ধু নাহয় হারিয়েছিই আমি, তাতে কী, আমার তো অগুনতি সাধারণ ছিল। সাধারণের ভিড়েই আমি স্বস্তি পেয়েছি, সুখ পেয়েছি। এ বারও আগের বারের মতোই বিশ্ব ছিল, গোপা ছিল, গভীর রাত্তিরে হই হই করে ঘুম ভাঙিয়ে যাদের আমি হরিনাভির বাগানে নিয়ে যেতে পারি চাঁদ দেখাতে। পাকের ঘরে-র ঝর্না ছিলেন, দু’বেলা তাঁর পাঠানো খাবার খেতে খেতে মনে হয়েছে নানির বাড়ির পিঁড়িতে বসে বুঝি জগতের শ্রেষ্ঠ খাবারগুলো খাচ্ছি। ঝর্নার হৃদয় থেকে যে স্নেহের ঝর্না ঝরেছে, তাতে দু’বেলাই স্নান করেছি আমি। কলকাতায় যত বারই যাই, নতুন নতুন বন্ধু গড়ে ওঠে। হৃদয়ের দুয়োর আমি খোলা রাখি নিশিদিন, যেন যে কেউ যখন খুশি টুপ করে ঢুকে যেতে পারে। কত কেউ যে ঢুকে গেছে। কত কেউ যে পরশ দিয়েছে প্রাণে।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: ভাল থেকো কলকাতা_তসলিমা নসরিন_VALO THEKO KOLKATA_TASLIMA NASRIN

সংগ্রাম ছায়ার মতো ছিল পাশে। ভাস্কর ছিল, শিল্পী ছিল। রেখাচিত্রমের অরুণ চক্রবর্তী তাঁর স্নিগ্ধ সুন্দর মোহন মধুর রূপটি নিয়ে এসে ঘর আলো করে দিত। অরুণ এক আশ্চর্য শিল্পী। কী নিখুঁত কাজ যে সে করতে জানে, না দেখলে বিশ্বাস হয় না। অরুণের বাড়িতে সামান্য ক্ষণের জন্য গিয়েও মনে হয়েছে বাড়ির সবাই কত আপন আমার। যেন যুগ যুগ ধরে তাদের আমি চিনি। আচ্ছা, মনে মনে বলি, তোদের এত চিনি কেন, তোরা কি আমার আগের জনমের কেউ ছিলি। আগের জনমে বিশ্বাস থাকলে ঠিক ঠিকই কিন্তু ভেবেই নিতাম। অরুণের মতো আরও এক ঝাঁক শিল্পীর সঙ্গে এ বার পরিচয় হল, সবাই মিলে এক দুপুরে গঙ্গা ঘুরে এলাম। গঙ্গাকে এত কাছ থেকে আগে কখনও দেখিনি। গঙ্গার গা থেকে কলকাতাকে দেখতে আরও বেশি রূপসী লাগে। আমার আনন্দে বিষাদে ছিল ওরা, কৃপা, কামাল, কৌশিক। ছিল সুশীল, রিংকি, স্বপ্না, স্বাতী। ছিল ওরা, যারা নাক-উঁচু সমাজে নামী নয়, দামি নয়। আমার কাছে কিন্তু হিরের মতো, মুক্তোর মতো।

জবা ছিল, জবার উষ্ণতা ছিল, রাখী ছিল, রাখীর অসম্ভব সুন্দর চোখদুটোর মায়া ছিল। হঠাৎ তুফান তুলে কোথাকার কোন পাচু এসে দুদিনেই একেবারে প্রেমিক হয়ে গেল। হোটেলের ঘরদোর পরিষ্কার করার ছেলে কিশোর সুভাষ ছুটে ছুটে আসত খবর নিতে, দিতে। পুলিশের লোক হয়েও শংকর মানস পুলিশের লোক ছিল না। যাদবপুর থেকে বিলাস আসত। ওর পরনের কাপড় জুতো কম-দামি ছিল বলে ওকে এক দিন হোটেলে ঢুকতে দেয়নি হোটেলের লোকেরা। আমার শত অনুরোধেও যখন কাজ হয়নি, আমি, হোটেলের সম্মানিত অতিথিটি, ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে বড় ফটকের বাইরে খোলা আকাশের তলে দাঁড়িয়ে থাকা আমার নমস্য প্রণম্য অতিথি বিলাস সরকারকে পুষ্পস্তবক দিয়ে বরণ করে সসম্মানে ভেতরে নিয়ে আসি। হোটেলের লোকেরা হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সম্ভব হলে বিলাসের জন্য আমি ওখানে রেড কার্পেট পেতে দিতাম। কী যে অন্ধ দুর্গন্ধ অহঙ্কারের কাদায় মানুষ তলিয়ে থাকে!

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: ভাল থেকো কলকাতা_তসলিমা নসরিন_VALO THEKO KOLKATA_TASLIMA NASRIN

আমার সত্যিই রাগ হয় কলকাতায় কোনও হোটেল-জীবন কাটাতে। কেউ কেউ নাকি দূর থেকে টিপ্পনী কাটে। আহা, যেন আমি শখে থাকি হোটেলে। যেন আমার ইচ্ছে করে হোটেলে থাকতে! যেন তোমরা কেউ বাড়িয়ে দিয়েছিলে তোমাদের দু’একটি চিলেকোঠা, আমি ঢঙ দেখিয়ে থাকিনি। যারা ধিক্কার দেয়, তারা চিরকালই দেবে। দামি হোটেলে থাকলেও দেবে, বস্তির ভাঙা ঘরে বাস করলেও দেবে।

কিছু নারীবাদী শুনেছি বাজারে বলে বেড়ান যে, আমার নাকি পুরুষের সঙ্গেই সব ওঠাবসা, পুরুষ দেখলেই ঢলে পড়ি, মেয়েদের সঙ্গে নাকি মোটেও মিশি না, মেয়েদের নাকি পুছি না। ভাই নারীবাদীগণ, আমি তো লিঙ্গ দেখিয়া বন্ধুত্ব করি না। যাহার সহিত আমার মনে মেলে, আদর্শে বিশ্বাসে মেলে, তাহার সহিত বন্ধুত্ব করি। তাহার সহিত কথা কহিয়া আমি প্রভূত আনন্দ লাভ করি। ওহে বান্ধবীগণ, আকারে আকৃতিতে লিঙ্গ যত বৃহৎই হউক না কেন, আমার নিকট লিঙ্গের মূল্য মস্তিষ্ক হইতে অধিক নহে। রে নারীবাদী, আমি অনেক পুরুষকে দেখিয়াছি, যাহারা তোদের তুলনায় অধিক নারীবাদী, আর অনেক নারীকে দেখিয়াছি, যাহারা পুরুষের তুলনায় অধিক পুরুষতান্ত্রিক।

উফ, আমার যে কী সৌভাগ্য, যে আমি বই পড়ে নারীবাদী হইনি। কী যে সৌভাগ্য যে মানুষকে ভালবাসতে গিয়ে আমার এই বাদ সেই বাদ নারীবাদ ঝাড়িবাদ মনুষ্যবাদে গিয়ে স্থির হয়েছে। তবু, কোনও বাদে প্রতিবাদে না গিয়ে চুপচাপ যদি ফুটপাথে শুয়ে থাকা ওই শিশুটির কান্না মুছে নিতে পারতাম, এক ফুঁয়ে যদি শিশুটিকে একটি ঘর দিতে পারতাম, মায়ের একটি কোল দিতে পারতাম! সোনাগাছিতে দাঁড়িয়ে থাকা বিষণ্ণ তরুণীটিকে যদি অন্ধকার থেকে তুলে এনে সারা কলকাতার আলোয় হই হই করে ঘুরে বেড়িয়ে নেচে গেয়ে ধাবায় খেয়ে ভোর হলে তাকে বাকি জীবনের জন্য একটি নিশ্চিত একটি শোভন সুন্দর অর্থোপার্জন দিতে পারতাম! ইস্টিশনের মোট বওয়া বালকটিকে, জুতো পালিশের বালিকাটিকে যদি বইখাতা দিয়ে ইশকুলে পাঠাতে পারতাম! কত কিছু যে পারতে ইচ্ছে করে আমার! কিন্তু, কী আর পারি করতে! কত আর পারি! কেবল স্বপ্ন দেখি, কেবল স্বপ্ন দেখে মরি।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: ভাল থেকো কলকাতা_তসলিমা নসরিন_VALO THEKO KOLKATA_TASLIMA NASRIN

স্বপ্ন দেখা আরও বন্ধুদের জড়ো করে ইচ্ছে হয় কিছু একটা কাণ্ড করি। কিন্তু কাণ্ড আমাকে করতে দেবে কেন লোকে! দুর্মুখেরা বলছে যে, আমাকে নাকি আর যেতেই দেওয়া হবে না কলকাতায়। আমার জন্য দুয়োর নাকি এ দেশেও বন্ধ হচ্ছে। পঁচিশ জন বুদ্ধিজীবীর ক্ষমতা তো অনেক, দুয়োর আঁটার ক্ষমতাও হয়তো আছে তাঁদের। কিন্তু পঁচিশ জন নিয়ে তো পশ্চিমবঙ্গ নয়!

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর বই নিষিদ্ধ করা, আর এ কারণে আশকারা পেয়ে রাস্তায় রাস্তায় কিছু লোকের আমার কুশপুতুল পোড়ানো আর সগৌরবে চুনকালির ফতোয়া দেওয়ায় যাদের সমর্থন ছিল, তাদের সংখ্যা যে খুব বেশি ছিল না, তা আমার দেখা হয়েছে। বইমেলায় আমি টের পেয়েছি তা। মেলার খোলা মাঠে দেখেছি ভালবাসার ঝোড়ো হাওয়া, দূর দূর থেকে মানুষ এসেছে, কেউ কেবল এক বার স্পর্শ করতে চেয়েছে, কেউ চোখের দেখাটি দেখতে এসেছে, কেউ কেবল বলতে এসেছে, আমরা তোমার সঙ্গে আছি, কেউ কাঁদিয়ে দিয়েছে বলে যে তোমার বই পড়ার জন্য আমি বাংলা শিখেছি। ওরা অনেক। ওরা অসংখ্য। আমার দিকে নেমে আসা ভালবাসার ঢলে আমি ভেসে গেছি, ডুবে গেছি, কূল হারিয়ে কূল পেয়েছি আর সন্দেহাতীত হয়েছি আমি বন্ধু হারিয়েছি ঠিক, কিন্তু যত হারিয়েছি তার চেয়ে অনেক বেশি আমি পেয়েছি। এ বারের কলকাতায় আমি অগুনতি মানুষ দেখেছি। সত্যিকারের মানুষ। কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্র আমার দেখা হয়েছে। দূর দূর শহর থেকে গ্রাম থেকে মানুষ এসেছে। অসম থেকে আসানসোল থেকে ত্রিপুরা থেকে বর্ধমান থেকে।

ডাক্তার শেখ মুজাফফর হুসেন এসেছেন চব্বিশ পরগনার এক গ্রাম থেকে। সেকুলার-মুখোশ পরা সাংবাদিক এবং লেখকদের আসল চরিত্র বুঝে বড় ক্ষুব্ধ তিনি। মুসলিম মৌলবাদীর উত্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন মুজাফফর হুসেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমাকে বলতে এসেছিলেন, মৌলবাদী সমাজে বাস করতে গিয়ে মনের সবুজ দিকগুলো ক্রমশ হারিয়ে গিয়েছে। আপনার লেখাগুলো এখন অক্সিজেনের কাজ করছে। মুজাফফর হুসেনের মতো অনেকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যাদের অজুহাত দিয়ে বই নিষিদ্ধের মতো একটি কাণ্ড করেছেন, সেই তারাই আমাকে বলেছে, বই নিষিদ্ধ হোক তারা চায় না, তারা শহিদুল, আকমল, বরকত, পারভেজ, সুলতানা, ফাতেমা, লতিফা— তারা দ্বিখণ্ডিত পড়েছে এবং মনে করছে না একটি বাক্যও ইসলাম সম্পর্কে আমি মিথ্যে লিখেছি। তারা একটি সুস্থ সুন্দর সমাজ চায়, পিছিয়ে থাকা সমাজের মধ্যে একটি জাগরণ চায়, একটি বিপ্লব চায়। তারা যে করেই হোক, সামনে এগোতে চায়, অন্ধত্ব তারা যে করেই হোক ঘোচাতে চায়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য না চাইলেও তারা চায়। এ বারের কলকাতায় আমার সব চেয়ে বড় প্রাপ্তি এই। শ্রদ্ধায় আমি মাথা নত করেছি এই উদ্দীপিত তারুণ্যের সামনে, এই সম্ভাবনার, এই আশার, এই বারুদের, এই পূর্বাভাসের সামনে।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: ভাল থেকো কলকাতা_তসলিমা নসরিন_VALO THEKO KOLKATA_TASLIMA NASRIN

মুখে বই নিষিদ্ধ হওয়া সমর্থন না করলেও অনেকে মৌন থেকেছে (মৌনতাই অবশ্য এক রকম সমর্থনের মতোই)। অনেকে কিটকিট করে হেসেছে দূর থেকে। তারা খুব ভয়ঙ্কর আমি জানি, তারা ওই মসজিদের ওই মুফতির চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। আমাকে যখন মৌলবাদীদের হিংস্র আক্রমণের শিকার হতে হয়েছিল বাংলাদেশে, তখন অনেকেই এমন কিটকিট করে হেসেছিল। আড়ালে হাততালি দিয়েছিল। আজকের এই হুমায়ুন আজাদও হেসেছিলেন। তাঁকে আজ ও দেশে চাপাতির আঘাত খেতে হয়। এই হুমায়ুন আজাদই ক’দিন আগে সমরেশ মজুমদারের সঙ্গে গলা মিলিয়ে দাঁতাল হেসে আমাকে বেশ্যা বলে গাল দিয়েছেন দ্বিখণ্ডিত বইটি লিখেছি বলে।

সে সময়ের কথা বলছি, ধর্মের সমালোচনা করেছিলাম বলে আমাকে হত্যা করার জন্য যখন দেশ জুড়ে তাণ্ডব চলেছে, তখন দেশের বরেণ্য শিল্পী সাহিত্যিক রাজনীতিকরা এক বাক্যে বলে দিয়েছিলেন যে, এ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাঁরা মাথা ঘামাননি, নাক গলাননি আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে। ঝামেলা আমি তৈরি করেছি, ঝামেলা আমাকেই মেটাতে হবে। সেই ১৯৯৪-এ অন্তত একশোটি মানুষ যদি মুখ ফুটে বলত যে, না এটা তসলিমার ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়, এ আমাদের সকলের ব্যাপার, সকলের বাক্‌স্বাধীনতার ব্যাপার, তবে আমাকে দেশ ছাড়তে হত না।

আমার ভাল লাগছে দেখে যে এত দিনে বাংলাদেশের মানুষ জেগেছে। আজ যখন এক পুরুষের ওপর আঘাত হানা হল, পুরুষটি যতই ননসেন্স কাজ করুক ননসেন্স লিখুক, পুরুষ তো, যতই তার নিন্দুক থাক না দেশে, সব কেমন এক তুড়িতে এককাট্টা দাঁড়িয়ে গেল! গোটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এখন বুনো ষাঁড়ের মতো ক্ষেপে উঠেছে পুরুষের অধিকার রক্ষা করতে— পুরুষের লেখার অধিকার, পুরুষের কথা বলার অধিকার, পুরুষের ফুঁসে ওঠার অধিকার তারা এখন চায়ই চায়। এখন তারা বাক্‌স্বাধীনতার দাবি করছে গলা ফাটিয়ে। চারদিকে হই-হুল্লোড় এখন, সভা-মিছিল, পত্রিকাগুলোয় উপচে পড়ছে প্রতিবাদের কলাম। দেশ গেল দেশ গেল রব, এত দিনে দেশের লোক বুঝতে পেরেছে যে মৌলবাদীরা মন্দ কিছু একটা করছে। তসলিমা নারী ছিল, এই ছিল সমস্যা। তসলিমার মুখে অমন সব কথা মানাত না, পুরুষরা বললে মানিয়ে যায়। আর, সত্য কথা হল, পুরুষের জন্য পুরুষরা বুক চিতিয়ে দাঁড়ালে মানায়, কোনও নারীর জন্য দাঁড়ালে কেমন মেনি মেনি লাগে, মাগী মাগী লাগে।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: ভাল থেকো কলকাতা_তসলিমা নসরিন_VALO THEKO KOLKATA_TASLIMA NASRIN

হুমায়ুন আজাদ আমার যত নিন্দাই করুন না কেন, তাঁর ওপর আক্রমণের তীব্র নিন্দা আমি করছি। এখন যে ভাবে মানুষ জেগেছে, যে ভাবে দাঁড়িয়ে গেছে, যে ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে হুমায়ুনের সমর্থনে, তাতে আশার একটি অঙ্কুরোদ্গম দেখি। যে কারণেই হোক না কেন, হোক, ও-দেশে লেখকের লেখার অধিকারের জন্য আন্দোলন হোক, ও-দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা হোক, হোক, পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা হোক।

এই তো সে দিন, একুশে ফেব্রুয়ারির আগের দিন, যে একুশ বাংলা ভাষার সব চেয়ে বড় সম্মানের দিন, সে দিন আমার সেইসব অন্ধকার বইটি বাংলাদেশ সরকার নিষিদ্ধ করে দিল। কেউ ওই বই পড়তে পারবে না, ছুঁতে পারবে না, ছাপাতে পারবে না, বিলি করতে পারবে না, বিক্রি করতে পারবে না, বই থেকে কোনও উদ্ধৃতি কোথাও দিতে পারবে না। একটি প্রাণী কি বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে ওখানে? না। করেনি। একটি প্রাণী কি অন্তত সামান্যও দুঃখ প্রকাশ করেছে একুশেতে বই নিষিদ্ধ হল বলে! না। করেনি। হ্যাঁ, এটিও আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার বটে। আর, একুশের মেলাতেই যখন এক পুরুষ-লেখকের ওপর হামলা হয়, তখন কিন্তু সেটা সেই পুরুষ লেখকের ব্যক্তিগত ব্যাপার থাকে না, তখন সেটা সমষ্টিগত হয়ে যায়। আমি নিশ্চিত, ওই আক্রমণ যদি আমার ওপর হত, আমাকে যদি চাপাতির আঘাতে খুন করার চেষ্টা হত বা ধরা যাক খুনই করা হত, ওটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারই থেকে যেত। মেয়েদের জন্য তো এই ব্যাপারগুলো ব্যক্তিগতই হয়। মেয়েরা নির্যাতিতা হলে, ধর্ষিতা হলে, খুন হলে যুক্তি তো দেওয়াই হয় যে মেয়েরাই ইন্ধন জুগিয়েছে হতে। লিখতে আসা মেয়েরা যদি একা বসে কড়া কড়া কথা লিখে ফেলে, আর যদি পুরুষের পুতুল হয়ে পুরুষের মদের আড্ডায় পুরুষের নাগালের মধ্যে পুরুষের বগলতলায় বসে পুরুষকে মজা না দেয়, তবে তো বেশ্যাই ওরা। একের পর এক ওর বই নিষিদ্ধ করা হয় ও দেশে, নিজের দেশটি থেকে তাড়া খেতে হয়, দেশটিতে ওকে ঢুকতে দেওয়া হয় না, নির্বাচিত কলাম লেখার অপরাধে এক আদালত আবার ওকে এক বছরের জেল দিয়ে রেখেছে, ওর ফাঁসি হয়, হোক, ওকে কেউ যদি খুন করতে চায়, খুন করুক— এ সব কিছুর যুক্তি আমরা দাঁড় করাতে পারি।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: ভাল থেকো কলকাতা_তসলিমা নসরিন_VALO THEKO KOLKATA_TASLIMA NASRIN

যুক্তিটি হল— ও যৌনতা নিয়ে লেখে, বড় বাড়াবাড়ি লেখা লেখে, ওর লেখা সাহিত্য পদবাচ্য নয়, ও লেখক নয়, ও আমাদের মতো গল্প উপন্যাস লিখতে জানে না। ব্যস। যুক্তি দেওয়া শেষ। নটে গাছটি মুড়োলো। এই যুক্তি পুবের পুরুষেরা যেমন দেন, পশ্চিমের পুরুষেরাও আজকাল দিচ্ছেন। সময় সময় পুরুষেরা তোতাপাখির মতো হয়ে যেতে পারেন, বিপদ দেখলেই অবশ্য হন। বিপদ কেন গো? আমি কি কারও পাকা ধানে মই দিচ্ছি না কি? না দিচ্ছি না। যে যাই বলুক, তার পরও আমি চাইছি, এমন অবস্থা আসুক ও দেশে, ধনধান্য পুষ্পভরা দেশটিতে, সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা দেশটিতে যেন মানুষ নিজের বাঁচার অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারে। মানুষের যেন কথা বলার অধিকার থাকে। যেন ভিন্ন মত থাকার অধিকার থাকে। কারও বই যেন পোড়ানো না হয়। আর কারও বই যেন নিষিদ্ধ করা না হয়। আমার মতো আর যেন কাউকে দেশ হারাতে না হয়। কাউকে যেন এমন ভয়াবহ রকম একা হয়ে যেতে না হয়। কাউকে যেন এত অনাথের মতো, এত এতিমের মতো পথে পথে ঘুরতে না হয়।

কেবল কি ওপার বাংলার জন্যই আমি শুভকামনাটি করব? এপার বাংলার জন্য বুঝি প্রয়োজন নেই! এপার বাংলা বুঝি খুব একেবারে গণতন্ত্রের পীঠস্থান হয়ে বসে আছে! বাক্‌স্বাধীনতা বুঝি মাগনা মেলে এ রাজ্যে? বুদ্ধবাবু জানেন, তিনি নিশ্চয়ই জানেন যে তিনি কেবল এ রাজ্যেই বইটি নিষিদ্ধ করেননি, গোটা ভারতেই নিষিদ্ধ করেছেন। এমনই আইন তিনি খাটিয়েছেন যে ভারতের কোথাও অন্য কোনও ভাষাতেও দ্বিখণ্ডিত প্রকাশ হতে পারবে না। এই একবিংশ শতাব্দীতে মধ্য যুগের বায়োস্কোপ দেখালেন বটে! দেখ দেখ শাসক দেখ, দেখ দেখ শক্তি দেখ।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: ভাল থেকো কলকাতা_তসলিমা নসরিন_VALO THEKO KOLKATA_TASLIMA NASRIN

তবু ভাল থাকুন তিনি। বুদ্ধদেব আপনি ভাল থাকুন। ভাল থাকুন কলকাতার পঁচিশ জন বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী। ভাল থাকুন শেখ মুজাফফর হুসেন। ভাল থেকো তোমরা, আমাকে যারা ভালবাসো। ভাল থেকো আমাকে যারা ঘৃণা করো। ভাল থেকো আমার পুরনো, ভাল থেকো নতুন। ভাল থেকো যারা মুখচেনা, এখনও যারা অচেনা। ভাল থেকো কলকাতা, রোদে বৃষ্টিতে ভাল থেকো। সকাল সন্ধে ভাল থেকো। সুখে অসুখে ভাল থেকো। গঙ্গা ভাল থেকো, বৃক্ষগুলো ভাল থেকো। আকাশ তুমি ভাল থেকো। আকাশ তুমি আলো দিও। হৃদয় তুমি আলো দিও। আমি তো অচ্ছ্যুৎ, অন্ত্য, অধমাধম, আমি তো নষ্ট, ভ্রষ্ট। অন্ধকারে মুখ গুঁজে পড়ে থেকে দিন গুনি দিন শেষের। দেশ ছেড়ে, তোমাকে ছেড়ে, আমার আপন ছেড়ে, কলকাতা ছেড়ে, মা ছেড়ে এই দূর পরবাসে আমার তো ভাল থাকার কোনও উপায় নেই। আমি ভাল নেই, তুমি ভাল থেকো কলকাতা। তোমার সঙ্গে কখনও আর দেখা হোক বা না হোক, ভাল থেকো। আমাকে ভাল বাসো কী না বাসো, ভাল থেকো। ভুলে যেতে ইচ্ছে করে যদি, ভুলে যেও, তবু ভাল থেকো। ঘৃণা করতে চাইলে কোরো, তবুও ভাল থেকো।

সংশোধন

গত ২৮ মার্চ সংখ্যায় ‘ভাল থেকো কলকাতা’ রচনায় কিছু ছাপার ভুল থেকে গেছে। ‘যাচ্ছি বনবাসে, দূরবাসে, পরবাসে, দুঃসাহসে’ বাক্যটিকে পড়তে হবে ‘...দূরবাসে, পরবাসে, দুঃসহবাসে’। ‘আমার ঘরখানাকে নতুন বন্ধুত্বে ভরিয়ে দিচ্ছে’ পড়তে হবে ‘...বন্ধুতে ভরিয়ে দিচ্ছে’।

সৌজন্যেঃ আনন্দবাজার পত্রিকাঃ ৭ চৈত্র ১৪১০ রবিবার ২১ মার্চ ২০০৪

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up