কলকাতা ছেড়ে আমাকে অন্য কোথাও যেতে হয় কেন? এই প্রশ্নটি আমি উড়োজাহাজ থেকে বারবারই ছুঁড়ে দিয়েছি নীচে গঙ্গার দিকে, গঙ্গার উদার তীরের দিকে, যে তীরে কত শতাব্দী ধরে কত কেউ ঘর বানিয়েছে, কত দূর দূর দেশ থেকে কত রকমের, কত ভাষার, কত রঙের মানুষ এসে বাস করেছে। আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর কেউ দেয়নি। মিথ্যে বলা যাদের রক্তে, তারাও হয়তো বলতে লজ্জা পাবে যে আমি বাঁচার জন্য কলকাতা থেকে চলে যাচ্ছি। আমি তো বাঁচার জন্য কলকাতা থেকে কোথাও যাই না। বাঁচার জন্য আমি কলকাতায় ফিরি। প্রাণবায়ু নিতে ফিরি, ভালবাসা নিতে ফিরি। ভালবাসার উষ্ণ স্পর্শ যে জীবনে থাকে না, সে জীবন শুকিয়ে মরে যায়। বিদেশে কি আমি ভাল নেই? হ্যাঁ, ভাল আছি। ভাল থাকা বলতে যদি ভাল থাকা, ভাল খাওয়া, ভাল পরা বোঝায়, তবে আমি নিশ্চয়ই ভাল আছি। বিদেশ আমাকে পরম আদরে মাথায় তুলে রাখে, আবার পরম হেলায় মাচায় তুলে রাখে। কিন্তু আমি তো চাই ধুলোয় নামতে, ধুলোয় গা ডুবিয়ে গোল্লাছুট খেলতে। বিদেশ আমার গায়ে আঁচড় লাগতে দেয় না, কিন্তু কে বলেছে, আঁচড় লাগুক, আমি চাই না? আমি কি কাঁটায় গা ছিঁড়ে ছিঁড়ে এক কালে, যে করেই হোক, যেখানে যাওয়ার সেখানে গিয়ে আনন্দ পাইনি? কোথায় কী ছড়ে গেল, ঝরে গেল, তা কি কখনও কোনও বিষয় ছিল? কী লাভ নিস্তরঙ্গ নিস্পৃহ নিষ্প্রভ একটি নিরুদ্বেগ নিশ্চিন্ত জীবন নিয়ে উত্তরের পরিচ্ছন্ন পরিপাটি নির্বীজ নির্জীব দেশগুলোর গাঢ় অন্ধকারে বরফের মতো পড়ে থেকে! এ ভাবে বেঁচে কী লাভ হয়, কেবল নির্বোধের মতো বাঁচা ছাড়া? অন্য সংস্কৃতির খোলা জলে-তোলা জলে-ঘোলা জলে ডুবে-ভেসে ক্লান্ত হয়ে কূল ফিরে পেয়ে কেবল পুরনো জীবনের দিকে তৃষ্ণার্ত তাকিয়ে থাকা ছাড়া? আমি তো মানুষ, দক্ষিণের দেশের মানুষ, আমি তো উষ্ণতা চাই, টগবগ করে ফোটা চাই, আমি তো আগুন চাই। আমি তো স্ফুলিঙ্গ ছড়াতে চাই সহস্র বারুদ-শরীরে। বিদেশ যত ভালই হোক, যতই আদর আমাকে এই বিদেশ করুক, বিদেশ তো বিদেশই। এই এত বছর হয়ে গেল, এক মুহূর্তের জন্যও আমার এই বিদেশকে বিদেশ ছাড়া কিছু মনে হয়নি। বিদেশকে দেশ করে নিতে আর যারা পেরেছে, পেরেছে, আমি পারিনি। বুকের মধ্যে দিনমান একটি বাংলা পুষি বলেই পারিনি, বাংলার ঘোরে বেলা পার করি বলে পারিনি।
কত বছর হয়ে গেল নিজের কোনও দেশ নেই আমার, যে দেশে জন্মেছি, সে দেশ বলেই দিয়েছে যে, সে দেশ আমার নয়। যে দেশে আমি বাস করি, সে দেশ তো আমার নয়ই। আর, যে দেশকে আমি দেশ বলে ভাবি, যে বাংলায় আমি পৌঁছে পরম আহ্লাদে বলতে পারি, আমার পুব নেই তো কী হয়েছে, পশ্চিম তো আছে! সেই পশ্চিম যদি কথায় কাজে বুঝিয়ে দেয়, চোখে আঙুল দিয়ে নড়তে না চাওয়া টনকখানা নড়িয়ে দিয়ে বলে দেয় যে, তুমি বিদেশি, যদি কানের কাছে বিপদঘন্টির মতো বিচ্ছিরি একটি ঘন্টা বাজিয়ে আমাকে কাঁপিয়ে দিয়ে হঠাৎ এক দিন বলে বসে, অনেক হল, এ বার পথ মাপো, তল্পিতল্পা গুটিয়ে নির্বাসনে যাও, তবে যাব কোথায়? কলকাতা কি কখনও শুধিয়েছে, পাশে বসে, খুব আলতো করে পিঠে একটি হাত রেখে, মায়ের হাতের মতো হাত রেখে, এলোচুলগুলিকে মুখের ওপর থেকে সরিয়ে দিতে দিতে, ভালবেসে— কোথাও কি তোমার যেতে ইচ্ছে করে? কোথাও আমার যেতে ইচ্ছে করে না শুনে কলকাতা এখনও কেন বলে না, তুই কোথাও আর যাস নে। এই নে ঘরদুয়োর, এই নে উঠোন, তাজা একটি মাধবীলতার গাছ নে। থেকে যা। কোলে থেকে যা, বুকে থেকে যা।
One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY