Topic: আমাদের নদীমাতৃকতা-১
আমাদের নদীমাতৃকতা-১
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই কথাটা আমরা ছোটকাল থেকে বইয়ের পাতায় পড়ে পড়ে মুখস্ত করে ফেলেছি। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে জালের মতো ছড়িয়ে আছে, তাই বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে চিত্র খানিকটা ভিন্ন।
নদী মাতৃক বলতে যে ব্যাপারটা বোঝায় সেটা ছিল এক সময় ছিল হয়তো, কিন্তু এখন আর নেই। আমরা যতোদিন ধরে আধুনিক হতে শুরু করেছি, ততোদিন ধরে নদীর মাতৃকতা হারাতে বসেছে। আমার বাড়ির পাশ দিয়ে একটি খাল আছে, আজ থেকে ৪৫বছর আগেও এই খাল দিয়ে পাটের নৌকা যেত, গয়না নৌকা যেত। এই খালটি যুক্ত ছিল শীতলক্ষা নদীর সাথে। খাল দিয়ে নদীর পানি ঢুকে এলাকায় বন্যা হতো, তাই স্লুইসগেইট বানিয়ে খালে নদীর পানি ঢোকা বন্ধ করা হলো, সাথে সদাগরী নৌকা। এলাকার প্রধান ট্রান্সপোর্টেশান রুট হিসেবে খালটির মৃত্যু হলো। ছোটখাট নদী সাইজের খাল, আর তার পাশের বিশাল পাটের বাজার(যেখান থেকে পাট বোঝাই নৌকা সরাসরি নারায়নগঞ্জের আদমজী যেত) এখন লম্বা ফিতের মতো ধান ক্ষেত মধ্যে একটা চওড়া জলের ধারা, মধ্যে মধ্যে বাঁধ দিয়ে এপার ওপার যাবার পথ, আর বিশাল পাটের বাজার এখন সাপ্তাহিক হাট, যেখানে গোটা কয়েক মাটির ঘর আর খান পঞ্চাশেক খড়ের চালা ছাড়া কিছু নেই। একমাত্র বর্ষাকালে খালের পুরনো চেহারা খানিকটা দেখা যায়, কিন্তু বাজারের চেহারার কোন পরিবর্তন হয় না!
আজ থেকে ৫০ বৎসর আগেও আমাদের দেশের পরিবহন ব্যাবস্থা সড়ক নির্ভর ছিলনা, ছিল নদী নির্ভর। বাংলাদেশের দক্ষিনের জেলাগুলোতে যাদের বাস, তারা আমার কথাটা বুঝতে পারবেন, কিন্তু অন্যরা এখন কতোটুকু বুঝবে সন্দেহ। এখন লঞ্চে করে কোথাও যাবার কথা মনে হলেই মনে হয় চাঁদপুর, বরিশাল বা পটুয়াখালী যাবার কথা। অথচ আমাদের এক প্রজন্ম আগের মানুষেরাই সড়কপথে দূরপাল্লার ভ্রমন বা পণ্য আনা-নেয়া করার কথা চিন্তা করতো না। বড় ব্যাবসায়ী বা সওদাগরদের বড় মালবাহী নৌকা থাকতো, সেগুলোকে বলতো সওদাগরী নৌকা। বাড়ির বৌ-ঝিয়েরা বাপের বাড়ী নাইয়র যেতো নৌকায়, গয়না নৌকায়। চিলমারীর বন্দরের নাম এখন আর শোনা যায় না, কিন্তু বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী বন্দর বানিজ্যক কেন্দ্র ছিল রংপুরের চিলমারী বন্দর। গোয়ালন্দ ঘাটের কথা এখনো অনেকে ভোলেনি, দূরপাল্লার স্টীমার ছাড়তো এখান থেকে, আর এখন গোয়ালন্দে নদীই নেই। এমন আরো কতো শত বন্দর আর নদীর নাম বলা যাবে, যাদের এখন আর গুরুত্ব নেই।
এক সময় শহরের মানুষ নদীর ধারে বাড়ী বানাতো নদী মুখী করে, কারন নদী ছিল উপভোগ করার মতো জিনিস। এখন শহরের আশপাশের নদীর দিকে পেছন ফিরে দালান কোঠা হয়। থাকার জন্য বাড়ীও করে না কেউ। এখনো নদীর ধারে পুরোন গঞ্জের ঐতিয্য ধরে রেখে আড়ত, দোকান, বাজার হয়, কিন্তু নামেই গঞ্জ, পন্য পরিবহন হয় মূলত সড়কপথে। হাতে গোনা কয়েকটি নদী ছাড়া কোন নদী এখন আর আমাদের পন্য বা পাবলিক ট্রান্সপোর্টের রূট হিসেবে ব্যাবহ্রূত হয় না। সেই নদী গূলোর খবরও তাই কেউ রাখে না।
১০০ বছর আগেও ঢাকার বুড়ী গঙ্গা থেকে একটা খাল ছিল সোনারগাঁ পর্যন্ত বিস্তৃত, ঢাকা থেকে সোনারগাঁ পর্যন্ত প্রধান বানিজ্যিক প্যাসেজ ছিল সেটা। ঢাকা শহরের বিস্তৃতি আর সড়ক পরিবহন ব্যাবস্থার উন্নতির জোয়ারে সেই খালটি এখন আর নেই। তার খানিকটা অংশ এখন ধানমন্ডি লেক, খানিকটা অংশ বক্স কালভার্ট, যার ওপর দিয়ে এখন পান্থপথ, খানিকটা অংশ বেগুনবাড়ী খাল, হোটেল সোনারগাঁ’র পেছন দিয়ে, তার পর মগবাজারের পেছনের বিশাল জলাভুমি, এর পর রামপুরা বাড্ডা হয়ে এখন আর তার খোঁজ পাওয়া যায় না। এক সময়ের ঢকা সোনারগাঁ বানিজ্যিক মহাপ্যাসেজ এখন অস্তিত্বহীন স্মৃতি।
কদিন আগে টেলিভিশনের খবরে দেখলাম, টাঙ্গাইলের বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া খাল দখল হতে হতে এমন অবস্থা, সেটা এখন এঁদো নর্দমা, যার ধ্বংশের শেষ পাথর হলো পৌর কর্তৃপক্ষ সেটার ওপর বিপনি বিতান বানাচ্ছে। এই খাল দিয়ে এক সময় বড় বড় সদাগরী নৌকা চলতো, এখন সেটা পাঁচ ফিট চওড়া নর্দমা।
আরো একটা উদাহরন টানি... চট্টগ্রামের চকবাজারের কাছে একটি জায়গার নাম সুলুক বহর। এই নামেরও ইতিহাস আছে। এই সুলুক বহরেই ছিল ৮০০ বছরের প্রাচীন সমুদ্র বন্দর। এই জায়গা থেকে জাহাজের বহর সুলুক-মুলুকে রওনা হতো। সুলুকে যাবার বহর যেতো, তাই জায়গার নাম সুলুক বহর। সুলুক বহর থেকে খাল গিয়ে পড়েছে কর্ণফুলী নদীতে, আর নদী থেকে সমুদ্র, সেখান থেকে সুলুক। বন্দর বিলুপ্ত হয়েছে ২০০/৩০০ বছর হয়ে গেল, আর খালটা বোধ করি এখনো আছে, তবে দিয়ে কাগজের নৌকোও চলবে কিনা সন্দেহ।
যে কোন জিনিসেরই হোক না কেন, ব্যাবহার বন্ধ হয়ে গেলে ধ্বংশ হয়ে যাবেই। আউট আব সাইট, আউট অব মাইন্ড। আমাদের নদীগুলো ছিল আমাদের পথ, নৌকা ছিল বাহন, এখন নদীর জায়গা নিয়ে নিয়েছে সড়কপথ, নৌযানের জায়গা নিয়েছে গাড়ী। সড়ক পথে যাতায়াত এখন খুবই সহজ, তাহলে কেন আমরা নদী মাতৃক হয়ে থাকবো? নদী আর আমাদের মাতা নেই, আমাদের মা এখন সড়ক, আমরা এখন সড়ক মাতৃক।
(অনুমান করি, অদূর ভবিষ্যতে সবাই এখনকার গাড়ি সাইজের আকাশযান ব্যাবহার করবে, সবার বাড়ির বারান্দায় সেই ব্যো-যান নামার ব্যাবস্থা থাকবে, তখন হয়তো এখনকার মহা গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথের দূর্দশাও আমাদের নদীগুলোর মতোই হবে!!!)
মানুষ বোঝ না!
....হেলাল হাফিজ

