Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE
প্রমথনাথ ভট্টাচার্য
১৪, লোয়ার পোজন্ডং স্ট্রীট, রেঙ্গুন
১৭-৭-১৩
প্রমথ,
তোমার চিঠি পাইয়া বড় খুশী হইলাম। আগেকার পত্রে তোমার যেন একটা রাগের ভাবই আমার চোখে পড়িত, এবার দেখিতেছি সেটা গিয়াছে। তুমি শান্ত এবং প্রকৃতিস্থ হইয়াছ। আমি মনে করিয়াছিলাম, ভায়া আমার এবার ক্ষেপিয়া না গেলে বাঁচি। যা হোক ভালয় ভালয় সামলাইয়া গিয়াছ, তাহা বড় সুখের কথা। আজ সুরেনকে দেবদাস পাঠাইবার জন্য চিঠি লিখিয়া দিলাম। কিন্তু কোন কাজে আসিবে না ভাই! ঐ বইটা একেবারে মাতাল হইয়া বোতল বোতল খাইয়া লেখা। লেখাগুলো পর্যন্ত আঁকাবাঁকা। যা মনে আসিয়াছিল, তাই লিখিয়াছি।
আচ্ছা আশ্বিনের জন্য আমি একটা গল্প দিব, নিশ্চিন্ত থাক। তবে, হয়ত একটু বড় হইবে। ২০/২৫ পাতার কম নয়। তবে, এমন গল্প এ বৎসর আর বাহির হয় নাই তেমনি করিয়া লিখিব। পূজার সংখ্যায় আমার জন্য ২০/২৫ পাতা খালি রাখিয়ো। তবে, ট্র্যাজেডি লিখিব না। ট্র্যাজেডি ঢের লিখিয়াছি আর না। তা ছাড়া, ছেলে-ছোকরারা ট্র্যাজেডি লিখুক, আমাদের এ বয়সে ট্র্যাজেডি লেখা কালি কলমের অপব্যয়। আর ইংরিজির তর্জমা করা লিলি-টিলি আমার আসে না। খাঁটি দিশি জিনিস, একেবারে ইণ্ডিজেনাস্ গুডস্! চাই ত ব’লো। আর ইংরিজির ছাঁচে ঢালা তাও চাও ত লিখো। এ করম ইংরিজি ধরনের গল্প লিখতে পারি নে যে তা নয়, তবে লজ্জা করে।
যাক। সমালোচনা সম্বন্ধে যা লিখেছ ঠিক তাই। সমাজপতির স্পষ্টবাদিতার ভান ক’রে গালিগালাজ করা সত্যই ভাল নয়। তবে, তুমি যা বলছ গুণের কথাই বলব, দোষ, দেখাব না, এটাও ঠিক নয়। দোষ দেখাব, কিন্তু বন্ধুর মত, শিক্ষকের মত। যেন সে নিজের দোষা দেখতে পায়। তা না ক’রে ঐ রকমের সমালোচনা—‘অত্যন্ত কদর্য’! ‘কিছুই হয় নি।’ ‘পণ্ডশ্রম’ ‘কালি কলমের অপব্যবহার’ ইত্যাদিকে সমালোচনা বলে না। কোথায় দোষ করিয়াছে, কোথায় ভুল হইয়াছে, যদি যথার্থ বলিয়া দিয়া লেখকের উপকার করিতে পার ত কর, না হইলে ও রকম ওপর চালাকিতে কায হয় না, শুধু শত্রু বাড়ে। পুস্তকের সমালোচনা এমন করিয়া করা উচিত, যেন সেই সমালোচনাই একটা সাহিত্যিক প্রবন্ধ হয়। যেন সেইটাই একটা পড়বার জিনিস হয়।
তোমার চিঠিতে ফণির অসুখের অবস্থা শুনে ভয় পেয়ে গেছি। সুরেনও ঠিক ঐ কথাই লিখেছে। বস্তবিক ফণির অসুখে যদি ‘যমুনা’ বন্ধ হয়ে যায় ত বড় দুর্ঘটনা। আমি ঐ কাগজখানিকে বড় করিবার জন্য যে কত আশা করিয়া আছি তাহা আর কি বলিব। যদি তাহার চেঞ্জে যাওয়াই উচিত হয় ত তাই পরামর্শ দাও না কেন? দুই এক মাস ভাগলপুর কি মোজাফরপুরের মত জায়গায় গিয়ে থাকলে বোধ হয় দেহটা শুধরে যেতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে কাগজটা চালাবে কে ? তবে তুমি যদি একটা কিছু উপায় ক’রে দাও ত হতে পারে বোধ হয়। বেচারী একা, অথচ এটুকু কাগজের জন্য লোক রাখাও যায় না, সমস্তই একা করতে হয়, বড় মুস্কিল।
আমার চাকরির চেষ্টা কচ্চ শুনে খুশী হলাম। সাহিত্যচর্চা ক’রে পেট ভরে না ভাই। তাছাড়া, ধর যদি একমাস কিছু নাই লিখতে পারি, তা হ’লেই ত বিপদ। অত সংশয়ের পথে পা বাড়াতে ভাল বোধ হয় না। যাহোক মনে কচ্চি পূজোর পর দু—এক মাসের ছুটি নিয়ে তোমাদের সঙ্গে দেখা ক’রে আসব। সেই সময়ে মিত্তির মহাশয়ের সঙ্গেও দেখা করব। কিন্তু সেখানে চাকরি করতে আমি নারাজ। শুনি হাড়ভাঙা খাটুনি—মাইনে কম। কে ঐ কম মাইনের জন্য হাড়ভাঙা খাটবে আর তাতে সাহিত্যচর্চাও বন্ধ হবে। সে আমি পারব না।
ভাল কথা। এবার ‘সাহিত্যে’ ‘দাদা’ ব’লে একটা গল্প পড়েছ? কি ভীষণ লেখা। সবাই জানে অকৃতজ্ঞতা বাজারে আছে, তাই ব’লে কি ঐ রকম ক’রে লেখে ? ওতে কার কি উপকার হবে ? সমস্তটা পড়ে একটা বিতৃষ্ণার ভাবই আসে, মন উঁচু হয় না। ওকে সাহিত্য বলা যায় না—ঐ গল্পই আবার সাহিত্যে বার হ’ল। ওর চেয়ে তোমাদের আষাঢ়ের ঐ ‘দর্পচূর্ণ’ গল্পটি ঢের ভাল। মনের মধ্যে শেষে একটা আহ্লাদ হয়, আমি ঠিক ঐ রকমই আজকাল ভালবাসি।
তোমার ‘বায়োস্কোপ’ দু-বার পড়েছি। অনেক জিনিস যা জানতাম না জানা গেল। আর ঐ যে ছোট ছোট পাণ্ডুয়ার ইতিহাস প্রভৃতি ওগুলি সবচেয়ে ভাল। কত ছোটখাট দরকারী ঘরের কথা যে ওতে যায় তা’ বলে শেষ করা যায় না। ঐ রকম যেন প্রতিবারে থাকে।
আর না, মেল ক্লোজ হয় হয়—
ভাল আছি।
শরৎ।
প্রাণধনবাবু কি আমাকে মনে করেন ? হয়ত ভুলে গেছেন, না ? আমি তাঁকে কিন্তু প্রায়ই মনে করি। অতি অল্প দিনের আলাপে তাঁর উপর আমার একটা বোধ করি স্থায়ী আকর্ষণ হয়ে আছে। অবশ্য এ সব কথা তিনি যেন না শোনেন—হয়ত তা হ’লে কি মনে করবেন। তোমার বাড়ীর খবর লেখ না কেন ?—শ`
But one good friend is equal to a LIBRARY

