Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

প্রমথনাথ ভট্টাচার্য

১৪, লোয়ার পোজন্ডং স্ট্রীট, রেঙ্গুন
১৭-৭-১৩


প্রমথ,    
   
তোমার চিঠি পাইয়া বড় খুশী হইলাম। আগেকার পত্রে তোমার যেন একটা রাগের ভাবই আমার চোখে পড়িত, এবার দেখিতেছি সেটা গিয়াছে। তুমি শান্ত এবং প্রকৃতিস্থ হইয়াছ। আমি মনে করিয়াছিলাম, ভায়া আমার এবার ক্ষেপিয়া না গেলে বাঁচি। যা হোক ভালয় ভালয় সামলাইয়া গিয়াছ, তাহা বড় সুখের কথা। আজ সুরেনকে দেবদাস পাঠাইবার জন্য চিঠি লিখিয়া দিলাম। কিন্তু কোন কাজে আসিবে না ভাই! ঐ বইটা একেবারে মাতাল হইয়া বোতল বোতল খাইয়া লেখা। লেখাগুলো পর্যন্ত আঁকাবাঁকা। যা মনে আসিয়াছিল, তাই লিখিয়াছি।
   
আচ্ছা আশ্বিনের জন্য আমি একটা গল্প দিব, নিশ্চিন্ত থাক। তবে, হয়ত একটু বড় হইবে। ২০/২৫ পাতার কম নয়। তবে, এমন গল্প এ বৎসর আর বাহির হয় নাই তেমনি করিয়া লিখিব। পূজার সংখ্যায় আমার জন্য ২০/২৫ পাতা খালি রাখিয়ো। তবে, ট্র্যাজেডি লিখিব না। ট্র্যাজেডি ঢের লিখিয়াছি আর না। তা ছাড়া, ছেলে-ছোকরারা ট্র্যাজেডি লিখুক, আমাদের এ বয়সে ট্র্যাজেডি লেখা কালি কলমের অপব্যয়। আর ইংরিজির তর্জমা করা লিলি-টিলি আমার আসে না। খাঁটি দিশি জিনিস, একেবারে ইণ্ডিজেনাস্ গুডস্! চাই ত ব’লো। আর ইংরিজির ছাঁচে ঢালা তাও চাও ত লিখো। এ করম ইংরিজি ধরনের গল্প লিখতে পারি নে যে তা  নয়, তবে লজ্জা করে।
   
যাক। সমালোচনা  সম্বন্ধে যা লিখেছ ঠিক তাই। সমাজপতির স্পষ্টবাদিতার ভান ক’রে গালিগালাজ করা সত্যই ভাল নয়। তবে, তুমি যা বলছ গুণের কথাই বলব, দোষ, দেখাব না, এটাও ঠিক নয়। দোষ দেখাব, কিন্তু বন্ধুর মত, শিক্ষকের মত। যেন সে নিজের দোষা দেখতে পায়। তা না ক’রে ঐ রকমের সমালোচনা—‘অত্যন্ত কদর্য’! ‘কিছুই হয় নি।’ ‘পণ্ডশ্রম’ ‘কালি কলমের অপব্যবহার’ ইত্যাদিকে সমালোচনা বলে না। কোথায় দোষ করিয়াছে, কোথায় ভুল হইয়াছে, যদি যথার্থ বলিয়া দিয়া লেখকের উপকার করিতে পার ত কর, না হইলে ও রকম ওপর চালাকিতে কায হয় না, শুধু শত্রু বাড়ে। পুস্তকের সমালোচনা এমন করিয়া করা উচিত, যেন সেই সমালোচনাই একটা সাহিত্যিক প্রবন্ধ হয়। যেন সেইটাই একটা পড়বার জিনিস হয়।
   
তোমার চিঠিতে ফণির অসুখের অবস্থা শুনে ভয় পেয়ে গেছি। সুরেনও ঠিক ঐ কথাই লিখেছে। বস্তবিক ফণির অসুখে যদি ‘যমুনা’ বন্ধ হয়ে যায় ত বড় দুর্ঘটনা। আমি ঐ কাগজখানিকে বড় করিবার জন্য যে কত আশা করিয়া আছি তাহা আর কি বলিব। যদি তাহার চেঞ্জে যাওয়াই উচিত হয় ত তাই পরামর্শ দাও না কেন? দুই এক মাস ভাগলপুর কি মোজাফরপুরের মত জায়গায় গিয়ে থাকলে বোধ হয় দেহটা শুধরে যেতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে কাগজটা চালাবে কে ? তবে তুমি যদি একটা কিছু উপায় ক’রে দাও ত হতে পারে বোধ হয়। বেচারী একা, অথচ এটুকু কাগজের জন্য লোক রাখাও যায় না, সমস্তই একা করতে হয়, বড় মুস্কিল।
   
আমার চাকরির চেষ্টা কচ্চ শুনে খুশী হলাম। সাহিত্যচর্চা ক’রে পেট ভরে না ভাই। তাছাড়া, ধর যদি একমাস কিছু নাই লিখতে পারি, তা হ’লেই ত বিপদ। অত সংশয়ের পথে পা বাড়াতে ভাল বোধ হয় না। যাহোক মনে কচ্চি পূজোর পর দু—এক মাসের ছুটি নিয়ে তোমাদের সঙ্গে দেখা ক’রে আসব। সেই সময়ে মিত্তির মহাশয়ের সঙ্গেও দেখা করব। কিন্তু সেখানে চাকরি করতে আমি নারাজ। শুনি হাড়ভাঙা খাটুনি—মাইনে কম। কে ঐ কম মাইনের জন্য হাড়ভাঙা খাটবে আর তাতে সাহিত্যচর্চাও বন্ধ হবে। সে আমি পারব না।
   
ভাল কথা। এবার ‘সাহিত্যে’ ‘দাদা’ ব’লে একটা গল্প পড়েছ? কি ভীষণ লেখা। সবাই জানে অকৃতজ্ঞতা বাজারে আছে, তাই ব’লে কি ঐ রকম ক’রে লেখে ? ওতে কার কি উপকার হবে ? সমস্তটা পড়ে একটা বিতৃষ্ণার ভাবই আসে, মন উঁচু হয় না। ওকে সাহিত্য বলা যায় না—ঐ গল্পই আবার সাহিত্যে বার হ’ল। ওর চেয়ে  তোমাদের আষাঢ়ের ঐ ‘দর্পচূর্ণ’ গল্পটি ঢের ভাল। মনের মধ্যে শেষে একটা আহ্লাদ হয়, আমি ঠিক ঐ রকমই আজকাল ভালবাসি।
   
তোমার ‘বায়োস্কোপ’ দু-বার পড়েছি। অনেক জিনিস যা জানতাম না জানা গেল। আর ঐ যে ছোট ছোট পাণ্ডুয়ার ইতিহাস প্রভৃতি ওগুলি সবচেয়ে ভাল। কত ছোটখাট দরকারী ঘরের কথা যে ওতে যায় তা’ বলে শেষ করা যায় না। ঐ রকম যেন প্রতিবারে থাকে।
   
আর না, মেল ক্লোজ হয় হয়—
   
ভাল আছি।    
শরৎ।
   
প্রাণধনবাবু কি আমাকে মনে করেন ? হয়ত ভুলে গেছেন, না ? আমি তাঁকে কিন্তু প্রায়ই মনে করি। অতি অল্প দিনের আলাপে তাঁর উপর আমার একটা বোধ করি স্থায়ী আকর্ষণ হয়ে আছে। অবশ্য এ সব কথা তিনি যেন না শোনেন—হয়ত তা হ’লে কি মনে করবেন। তোমার বাড়ীর খবর লেখ না কেন ?—শ`

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

প্রমথনাথ ভট্টাচার্য

১৪, লোয়ার পোজন্ডং স্ট্রীট, রেঙ্গুন
খামের ওপর ডাকমোহর, ২৫ জুলাই, ১৯১৩

প্রমথ,   
   
তোমাদের প্রেরিত ভারতবর্ষ ও তোমার পত্র উভয়ই পাইয়াছি। কাগজখানির জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। এবারকার কাগজের সম্মন্ধে যাহা বলিয়াছ তাহা সত্য। ‘বিন্দুর ছেলে’ তোমার ভাল লাগিয়াছে শুনিয়া খুব খুশী হইলাম। বোধ হয় ও মন্দ হয় নি, কেন না, অনেকেই ভাল বলিতেছেন। অনেকে ‘রামের সুমতির’ চেয়েও ভাল বলেন শুনিতেছি। প্রায় ‘পথনির্দেশে’র কাছাকাছি।
   
পূজার সংখ্যার জন্য আমার সাধ্যমত একটি গল্প লিখিয়া পাঠাইব—কিন্তু, প্রকাশ করিবার জন্য কাহাকেও অর্থাৎ সম্পাদক-যুগলকে খোশামোদ করিও না। আমার শপথ রইল। কেন না, তোমার ভাল লাগিলেই তাহা যে তাঁহাদের ভাল লাগিবেই অথচ প্রকাশের যোগ্য হইবে—সে কথা কোন মতেই জোর করিয়া বলা চলে না। কেন, তাহা পরে বলিব।
   
তোমাদের এবারের কাগজ পড়িয়া গোটা দুই প্রশ্ন মনে হইয়াছে তাহাই বলিতেছি।
   
১ম সূরজ কওর সম্মন্ধে। সূরজ কওর বেশ্যা এবং খুনে। হরি সিংকে এক স্থানে বলিতেছে—‘এই ত দরশ পরশ হইল!! আমি যে কায বলিয়াছি করিয়া আইস, তখন আমার অদেয় আর কিছুই থাকিবে না।’ অর্থাৎ সোজা বাঙ্গলায়, ‘কাজ ক’রে এলেই তোমার কাছে শোব’ ঠিক কি না ? কেন না ইতিপূর্বে, নির্জন ঘরে বেশ্যা সূরজ ‘হাসিয়া মুখে কাপড় দিয়াছে’ এবং ‘চোখে প্রেমের আহ্বান করিয়াছে’ এবং হরি সিং আঁচল ধরিয়া ওড়না টানাটানি করিয়াছে, কি প্রমথ, অস্বীকার করিবে, সমস্ত গল্পের ‘ড্রিফ্ট’টা কি? অনাবৃত রূপ সে শুধু জানিয়া শুনিয়া মঙ্গল সিংকেই দেখায় নাই—পাঠককেও দেখাইবার চেষ্টা করিয়াছে! তাহাতে ছবি দিয়া জিনিসটি বেশ ফুটিয়াছে! সাবাস!! ‘তবে দেখ! রূপ দেখ!’ অনেকেই তাহা দেখিতে পাইয়াছে।
   
২। ১৯৩ পাতা—‘অন্ধকার বৃন্দাবন’। চতুর্থ স্ট্যাঞ্জা—‘করে না দধি মন্থ গোপী নাচায়ে কটি চন্দ্রহার’। কটির চন্দ্রহার নাচিয়ে নাচিয়ে দধি মন্থ করলে, দেখতে পুরুষ মানুষের বোধ করি বেশ ভালই লাগে। চোখ বুজিয়া একবার উচ্চাঙ্গের ভাবটা উপলন্ধিধ করবার চেষ্টা করিও, সুখ পাবে। তাছাড়া গোপীর মধ্যে যশোদাও আছেন। উপানন্দের স্ত্রীটিও ‘দধি মন্থ’ করতেন, চন্দ্রহারও পরতেন। কৃষ্ণচন্দ্রকে কটি নাচিয়ে দেখাতে পাচ্ছেন না ব’লে তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন দেখছি! ভট্টিকাব্য না কোথায় এই কথা আছে না ? কিন্তু এ ভট্টির দিন নয়—ইংরাজের রাজত্ব। আমি সময়াভাবে সব কাগজটা পড়ি নি—পড়ে বলব।
   
এই কবিতাটির তৃতীয় স্ট্যাঞ্জা—‘যমুনা জল শিহরে, শুনি বাঁশীটি শ্যাম চন্দ্রমার।’ শ্যামচাঁদটি তখন কোথায় শুনি ? বোধ করি মথুরা থেকে ব্যাগপাইপ বাজাচ্ছিলেন, না হ’লে অত দূরে বৃন্দাবনের যমুনা-জল শিহরে কি ক’রে ? অত দূরে আর একটা জেলা থেকে বাঁশী বাজালে ? তবে, দেবতার কথা বলা যায় না, ওঁরা জাহাজের বাঁশীর মত ইচ্ছা করলে বাজাতে পারেন সম্ভব বটে!
   
৪র্থ স্ট্যাঞ্জা—‘যায় না চুরি নবনী ক্ষীর, বলিয়া ফেলে অশ্রুনীর—ক্রিয়া আছে ছত্রের কর্তাটি কি?
   
আর একটা কথা ভাই। ছেলে-ছোকরায় গল্প লিখলে ধরি নে। কোকিলেশ্বরের ‘ভারতবর্ষের অদ্বৈতবাদ’ বাপ রে! যা হোক্, ১৬ এবং ১৮ লাইনে লিখছেন, ‘দেবতাবর্গ’ দেবতৃ শব্দের ষষ্ঠি কি হয় পণ্ডিত মশাইকে জেনে ব’লে দেবে ভাই ? যদি দেবতাবর্গই হয়, ‘দেবতৃবর্গ না হয় (বাঙ্গলা ব’লে) তবে এবার থেকে যেন ‘পিতাকুল’ ‘মাতাকুল’ লেখেন। পিতৃকুল ইত্যাদি না লেখেন। কই বার কর দেখি এমনি লেখা, অক্ষয় মৈত্রের কিম্বা বিজয়বাবুর প্রবন্ধে ? তোমাদের কূটস্থ চৈতন্যস্বরূপ সম্পাদকের কি এটাও নজরে পড়ে না ? যদি নাই পড়ে, ত অত বেদ বেদান্ত নিয়ে নাড়াচাড়া ঠিক নয়।
   
দুটো একটা ভুলও আছে। যথা, ‘মাসিক সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ—বৈশাখ’ ২৯৪ পাতা। গল্প ও উপন্যাস—‘রামের সুমতি’—কিন্তু রামের সুমতি ফাল্গুন ও চৈত্রে বার হয়েছিল। অর্থাৎ গত বৎসরে। বৈশাখের ‘যমুনা’য় উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না—তাতে ‘পথনির্দেশ’ আর ‘নারীর মূল্য’ ছিল। নিশ্চয়ই কোনটা উল্লেখযোগ্য হ’তে পারে না, অবশ্য সে জন্য আমি দুঃখও করছি নে, কেন না তাঁর কথার মূল্য আমার কাছে অতি অল্পই। কিন্তু ভাবছি ‘অজ্ঞাতবাস’ ফকিরবাবুর বইয়ের মত আমার কোন একটা বই যদি থাকত, আর বিদ্যাভূষণ তার হতেন প্রকাশক—তা হ’লে নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য হ’ত। ‘রত্নদীপ’ নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য! কেন না, নায়ক রাখাল পরস্ত্রীর সতীত্ব হরণ করবার মানসে যাত্রা করেছেন এবং ‘মানসী’তে বার হচ্ছে। হায় রে দ্বিজুদার প্রতিষ্ঠিত ‘ভারতবর্ষ’!
   
‘সাহিত্য সমালোচনা’র মধ্যে পাঁচকড়ির ‘নববর্ষ’ ও উল্লেখযোগ্য। যার দুটো ছত্র ‘কনসিসটেন্ট’ নয়। ‘তারে জোর ক’রে শ্যামের বাঁশী’, আর ‘আমার মরণ হ’ল না’ আছে কি না! ‘নববর্ষ’ পড়ে দেখো—এমন এলোমেলো গাঁজাখুরি ‘জারগণ’ আর সম্প্রতি দেখছি কিনা মনে হয় না। আরো একটু মন দিয়ে ‘ভারতবর্ষ’ পড়ি, তার পরে আশ্বিন সংখ্যায় ‘সাহিত্যে’ একটি বিরাট সমালোচনা লিখব। সমাজপতিও কিছু লিখে দেবার জন্য ঘন ঘন রেজিস্টার্ড লেটার এবং টেলিগ্রাম পাঠাচ্ছেন, তাঁর কথাটাও রাখা হবে।
   
প্রমথ ভাই, দোকানদারী দেখতে দেখতে আর অসহ্য খোশামোদ ভণ্ডামি শুনতে শুনতে হাড় কালি হয়ে গেল। সব কাগজই কি এক সুরে বাঁধা ? যদি তাই হয়, প্রাতঃস্মরণীয় দ্বিজুদার নামটা ‘ভারতবর্ষ’ থেকে তুলে দাও—তার পরে এই রকম অবিচার এবং মানুষকে ‘মিসলিড’ ক’রো। নারীর মূল্য তাঁরও ভাল লেগেছিল—দঃখ হয় শেষটা তিনি পড়লেন না। এতে অনেক সত্য কথা আছে, তাইতেই এটা প্রবন্ধের যোগ্য নয়।
   
যাক। যথার্থ সুখও পেয়েছি। ‘প্রাক্তন’ গল্পটি যথার্থই উঁচু লেখা! আর জলধরবাবুর ‘দিনাজপুর’টিও মন্দ নয়। ‘ঘাটে’ ছবিটি বেশ। নোলকটা না থাকলে আরো ভাল হ’ত। ‘কানাকড়ি’ এখনও পড়ি নি। এই অবনীন্দ্র ঠাকুরের ওপর আমার ভয়ানক রাগ আছে—অনেকদিন থেকেই ইচ্ছা হয় খুব একচোট ঝাল ঝাড়ি—কিন্তু কোনদিন করি নি। ‘আর্ট পেণ্টিং’ আমিও নিজে করি। ‘অয়েল পেণ্টিং’ আমিও বুঝি—ও সম্মন্ধে নিতান্ত কম বইও পড়ি নি—কিন্তু যমুনা ছোটো কাগজ ওতে সুবিধে হবে না। তাছাড়া ‘অনিলা দেবী’ নাম নিয়ে সমালোচনা করতে আর ইচ্ছা করে না। আমাদের ফণীন্দ্র ভায়ার প্রুফ্ দেখার চোটে আমার লেখার ত ছত্রে ছত্রে ভুল বিরাজ কচ্ছেন—বিপক্ষ সেইগুলো তুলে ধরলেই ত গেছি! দেখা যাক কি হয়। যাই হোক তোমাকে না দেখিয়ে বা তোমার মত না নিয়ে কিছুতেই প্রকাশ করব না। তবে, আর একটা কথা ব’লে রাখি ভাই! তুমি মনে ক’রো না আমি সেই পুরাতন কথার শোধ তুলছি।
   
চরিত্রহীনের এখন বাজারে অত্যন্ত দুর্নাম, তা সত্বেও আমি সে জন্যে আজকের এই কথাগুলো লিখি নি। কথাগুলো যদি সত্য না হয়, ভালই, যদি সত্য হয়, ভবিষ্যতে সাবধান হ’লেই হবে। এই সূরজ কাত্তরটা আমাদের ক্লাব-এর সকলেই একবাক্যে নিন্দা করছে। অনেকে এমনও বলছে ও ‘প্রকাশ্য অনাবৃত ইমমরালিটি’। সত্যিও ওর ছত্রে ছত্রে এই ‘এক্সাইটিং’ ভাব ছাড়া আর কিছুমাত্র দ্বিতীয় উদ্দেশ্য নাই। যা হোক আমারও একটা নজির হয়ে রইল। চরিত্রহীন প্রকাশ করার সময় লোকের মুখ সহজেই বন্ধ করবার উপায়ও আমাকে ইতিমধ্যে খুঁজে রাখতে হবে। আমি বিদ্রূপ করলে কিরূপ করি তা জানই—এমনি করে প্রতি ছত্রে প্রতি পাতা তুলে ধরে ‘এক্সপোজ্’ করব। আমি অনেক নজির এর মধ্যেই জোগাড় করেছি। রবিবাবু প্রভৃতি সর্বত্র হ’তেই।
   
হাঁ, আর একটা কথা। সেই সাবিত্রীকে আর নিতান্ত মেসের ঝি রাখি নি। প্রথম থেকেই মানুষে তাকে যেন অশ্রদ্ধার চোখে না দেখে সে উপায় করেছি। বড় মন্দ হয় নি প্রমথ! আর ক্রমশঃ প্রকাশ্য নভেল ওরকম না হ’লে গ্রাহক জোটে না। লোকে নিন্দে হয়ত করবে—কিন্তু পড়বার জন্যেও উৎসুক হয়ে থাকবে। আমরা এক রকম আশা ক’রে আছি, ওতে যমুনার পশার বাড়বে। নইলে দেখছি ত ভাই, এই সব খবরের কাগজে ফেকাসে, রক্তহীন উপন্যস বেরিয়েই যাচ্ছে—কেউ পড়ে না। ঐ ‘ভারতী’র বাগদত্তা, পোষ্যপুত্র, দিদি—অরণ্যবাস—বারো আনা লোকেই পড়ে না, যদিও পড়ে নেহাৎ ব্যাগার খাটা গোছ। অথচ রত্নদীপ এর মধ্যেই অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে—অথচ সেটা বটতলার যোগ্য বই। এই ধর তোমাদের ‘মন্ত্রশক্তি’! ঐ পুরুত আর মন্দির আর ঐ সব ঘ্যানোর ঘ্যানোর কেউ পড়ে না—অপরের কথা কি বলব ভাই, আমি এখনো পড়ি নি। অথচ আমার এই ব্যবসা।
   
দেখ না লেখবার কায়দা, বঙ্কিমবাবু, রবিবাবুর। প্রথমেই একটা ‘সামথিং’! যাই হোক দেখাই যাবে। আমার ছেলেবেলার ‘চন্দ্রনাথ’টা কি জানি কেউ পড়েছে কি না!

ওটা আমার দেবার ইচ্ছেই ছিল না। ঐ ঘ্যানোর ঘ্যানোর ক্রমশঃ হ’লে লোকের ‘পেসেন্স’ থাকে না। তা যতই শেষে ভাল হোক্।                   

শরৎ
   
কেমন আছ, বাড়ীর খবর লেখ না কেন ?

মনে হয় প্রমথ, নিজের একটা কাগজ থাকত ত, বাক্যবাণে এই তথাকথিত পণ্ডিত গুলির চৈতন্য করিয়ে দিতাম। কতক বলে সমাজপতি, কিন্তু তার বলায় কোন ফল হয় না। কেন না তার অনেকটাই শুধু গ্লানি আর গালিগালাজ—প্রায় ফাঁকা আওয়াজ। তার আওয়াজ থাকে কামানের মত, কিন্তু ভেতরে একটা ছররাও থাকে না। তাই লোকে বড় গ্রাহ্যও করে না। কিন্তু আমি ‘জ্যাক্ অব্ অল্ ট্রেড’ কিনা—সঙ্গীত, চিত্র, দর্শন, কাব্য, নাটক, নভেল সব বিষয়েই এক ফোঁটা জানি, তার উপর নির্ভয় ক’রে মনের সাধে ‘য়ুদ্ধং দেহি’ ক’রে দিতাম।
   
হাঁ হাঁ—আমি উদাসীনও বটে, গৃহীও বটে। চোখ বেশ ক’রে খুলে রাখলেই দেখা যায়। দেখতে তুমিও পার, আমিও পারি, কিন্তু মনে রাখা চাই। আমি মনে ক’রে রাখি, তোমরা ভুলে মেরে দাও—এই প্রভেদ আর কিছু নয়।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

প্রমথনাথ ভট্টাচার্য

রেঙ্গুন , ৯-৮-১৩

প্রমথ,
   
তোমার চিঠি যেদিন পাইলাম তার পরদিন ‘ম্যানাস্ক্রিপ্ট’ পাইলাম। দেখিয়া শুনিয়া দিয়া পাঠাইতে গেলে, আমি হিসাব করিয়া দেখিলাম ২৩/২৪ শ্রাবণের আগে পোঁছিবে না। সেই জন্য ভাদ্রে কিছুতেই ছাপা হইবে না বুঝিয়া তাড়াতাড়ি করিয়া পাঠাইলাম না। এমন কোন অর্থ নাই যে পরের মাসে না বাহির হইলে আর উত্তর দেওয়া চলে না। ও আশ্বিনে ছাপাইলেই হইবে।
   
এ সম্মন্ধে কিছু বলিবারও আছে। প্রবন্ধ কিছু দীর্ঘ হইয়াছে এবং এমন সব কথা আছে যাহা ‘ঝগড়া’, ওটা উচিত কিনা সন্দেহ। আমি ঐ কথাগুলোই আর একটা কাগজে লিখিয়া আশ্বিনের জন্য ছাপাইব মনে করিয়াছি। তবে, আক্রমণ করিতেই হইবে এবং তাহা একটু ‘পোলাইট’ ধরণের—অনেকটা ‘কানকাটার’ মত করিয়া। আশা করি ইহাতে তুমি মনে কিছু করিবে না। যাহা ভাল হইবে, নিশ্চয় তোমার জন্য তাহাই করিব। তাছাড়া দেখ ‘গৃহস্থ’ কি বলে? দুঃখ এই যে আমি ওঁর ‘অরিজিনাল পেণ্টিং’ দেখি নি, তাহা হইলে এমন বলা বলিতাম যে, তিনি বুঝিতেন এ কোন চিত্র-ব্যবসায়ীর লেখা-যার তার নয়।
   
আমি তোমার জন্য গল্প লিখিতেছি অর্থাৎ দু-দিন লিখিয়াছি আর দু-দিন লিখব। ছবি দেবে কি হে ? দোহাই প্রমথ, আমার গল্পের ভেতরে ছবি দিও না-ওরে বাপ্ রে! সেই ‘কুলগাছ’ আর ব্যথিতে’র মৃত্যুশয্যা। আমি তাহ’লে লজ্জায় বাঁচব না। তাছাড়া আশা করি, ছবি আমার গল্পে না দিলেও লোকে পড়বে। ১ হপ্তা পরে পাঠাব। তুমি সমাজপতি সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছ, ফণী তার চেয়েও বেশী করিয়া লিখিতেছে—অথচ সমাজপতি মহাশয়ের কালকের রেজেস্ট্রি পত্র এই সঙ্গে পাঠালাম, পড়িলেই বুঝিবে কি মুস্কিলে পড়িয়াছি। কি যে করি ঠিক করিতে পারি না, অথচ, আমার হাতেও গল্প লেখা নাই, মগজেও আসিতেছে না। তার ওপর আফিসের কাজ এত বেশী এ মাসটায় পড়িয়াছে যে, রাত্রি সাতার পূর্বে বাড়ী ফিরিতে পারি না। তার পরে লেখাপড়া, বিশেষ, মাথার ভেতর থেকে কিছু বার করা প্রায় অসাধ্য! তবে আমার নাকি বড় শক্ত মাথা, তাই এত ঘা খেযেও কিছু কিছু ঠুকলে ঠাকলে বার হয়।
   
সকালে আজকাল আবার আরো বিপদ—লোকের অসুখ, আমাকে নিজেই বাজারে যেতে হয়। না গেলে ‘যিনি’ আছেন তিনি বলেন ‘খেতে পাবে না’। ইনি ত দিনরাত পূজো আচ্চা নিয়েই থাকেন, একটু আধটু লেখাপড়া জনেন বটে, কিন্তু কাজে আসে না। একদিন বলেছিলাম, আমি শুয়ে শুয়ে ব’লে যাই, তুমি লিখে যাও—স্বীকারও করেছিলেন, কিন্তু সুবিধা হ’ল না। ‘বরং’ লিখতে জিজ্ঞেস করেন, অনুস্বরের ঐ টানটা ফোঁটার ভেতর দিয়ে দেব, না বাহিরে দিয়ে দেব ? অর্থাৎ ৯ হবে না ১ হবে? কাজেই আমাকে সমস্ত নিজেই লিখতে হয়। রাত্রে একটু আফিমের ঘোরও ধরে উঠে, ব’সে লিখতে পারি নে। এ সব কারণেই লেখা এত কম হয়। তাই আর এক কায করেছি প্রমথ, আমি নিজে ত ‘যমুনা’ চালাতে পারি নে, তাই আমার সমস্ত শিষ্যগুলিকে লাগিয়ে দিয়েছি। নিরুপমা, বিভূতি, সুরেন, গিরীন এবং ভাগলপুরের আরো দুই একজন সাহিত্যিক লিখতে সুরু ক’রে দিয়েছেন। দেখা যাক যমুনার অদৃষ্ট কি সঞ্চয় হয়। তারা ত বলেছে তুমি গুরুদেব, তোমার কথার আমরা অবাধ্য হব না। এই যা আশা।
   
আর একটা কথা। সেদিন একটা চিঠি পেলাম (ভাবী সম্পাদক হইতে)। ‘অয়ন’ ব’লে একটা কাগজ ও ‘কর্মক্ষেত্র’ ব’লে আর একটা কাগজের জন্য তাঁরা বিশেষ লোভ দেখিয়ে পত্র দিয়েছেন—কিন্তু লোভ দেখালে কি হয় ? আমার পুঁজি কই ? আমি ত আর সত্যেন দত্ত নই যে, বললেই কবিতা লিখে ফেলব! শুনছি ‘অয়ন’ পত্রিকা আমার ‘কোরেল’ গল্পটা সুরেনের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে—তবে বেনামি ছাপবে এ সর্ত বুঝি তার সঙ্গে হয়েছে। সেটা নাকি ভাল গল্প। কি জানি, আমার ভাল মনেও নেই।
   
আচ্ছা, আজকাল হু-হু শব্দে এত মাসিক পত্রের আয়োজন হচ্ছে কেন? এ কি খুব লাভের ব্যবসা? একে ত খোশামোদ ক’রে ক’রে প্রাণ অস্থির, তার পরে ঐ যে লিখেছ, এতটুকু স্বাধীনতা নেই।
   
আমার গল্পগুলো বই ক’রে ছাপিয়ে কি হবে? কে কিনবে? কত গল্পের বই রয়েছে, আমার বই কি কেউ পড়বে? আমার নষ্ট করার মত টাকা নেই—ইচ্ছেও নেই। তাছাড়া হাঙ্গামা কত—অ্যাডভার্টাইজ কর, ক্যানভাস কর, লোকের ‘ওপিনিয়ন’ সংগ্রহ কর—ও সব আমি চাইও না, পারবও না। আমি একটু চুপচাপ থাকতে পেলে বাঁচি। অত হৈ-চৈ কে করবে? আমার ত সাধ্য নয়।
   
প্রমথ, একটা কথা তোমাকে গোপনে বলি। এতদিন এ কথাটা আমার মনে ওঠে নি। এত বড় বড় কাগজ বার হচ্ছে, আমাকে কেউ সাব-এডিটর কি কিছু একটা করে না? অনেক কায তাদের ক’রে দিতে পারব। একটা বড় গল্প একটা ধারাবাহিক ভাল উপন্যস, একটা প্রবন্ধ, একটা সমালোচনা এও আমি দিতে পারব। তাছাড়া ছবি ‘জাজ্’ করা, গানের স্বরলিপির দোষগুণ ধরা, বৈজ্ঞানিক আলোচনা, সাহিত্যিক আলোচনা, এও (আর কিছু ভাল না জুটলে) আমি ক’রে দেব। ১0 থেকে ৪/৫  পর্যন্ত খাটতে আমি খুব পারি, অবশ্য তাম্রলিপ্তি টিপ্তি পারব না। তার পরে এখন যেমন সকালে ও রাত্রে নিজের কাজ করি তখনও করব। দেখো ত যদি কেউ আমাকে নিতে স্বীকার করে। একজন ভাল এডিটর থাকলেই আমি কায চালিয়ে দেব। অন্ততঃ ছি-ছি কাগজ কোন মাসেই হ’তে দেব না, এ ‘অ্যাসিওরেন্স’ তুমি আমার হয়ে দিতে পার। এ চাকরি আমার খুব ভাল লাগবে, তবে যদি টিকসই হয়। এমন না হয় দু-দিন পরেই বলে, তোমাকে চাই নে যাও। এর মধ্যে যদি কোন কাগজ বার হবার কথাবার্তা হয়, আর তোমার চেনাশোনা থাকে তাহ’লে চেষ্টা দেখো—আমার বর্মা পোষাচ্ছে না। দেশ দেশ মন কচ্ছে।
   
সমাজপতির সম্মন্ধে কি পরামর্শ দাও? তোমার মত্ ছাড়া আমি কিছুই করব না। কিন্তু বিপদেও বড় পড়েছি তা বোধ করি বুঝতে পাচ্ছ। সমাজপতি সম্মন্ধে কি করা উচিত অতি সত্বর জবাব দিয়ো। আর চিঠি হারিয়ো না, আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো। কেন না, এক সময়ে যখন আমার নিন্দে সুরু করবে, তখন কাযে আসতে পারে। ‘ডকুমেণ্টারী এভিডেন্স’!
   
আজ রাত্রে কিছুই হ’ল না, কেবল চিঠিই লিখছি।

শরৎ

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

প্রমথনাথ ভট্টাচার্য

১৪, লোয়ার পোজন্ ডং স্ট্রীট,
রেঙ্গুন, ১৮-৮-১৩


প্রমথ, 
   
আজ তোমার পত্র পাইয়া অনেক কথা জানিলাম। ইতিমধ্যে আমার এক মহা বিপদ ঘটে গিয়েছিল। একটা দাঁত (কশের) প্রায় তিন চার বছর থেকেই নড়ে। ১০/১২ দিন পূর্বে হঠাৎ তাতে যন্ত্রণা সুরু হয়ে গেল। একটু একটু নড়ে কি না, তাই নাড়ালে একটু আরাম পাই। উনি পরামর্শ দিলেন, খুব ক’রে নড়াও, যদি ভিতরে বদ রক্ত থাকে ত বার হয়ে যাবে। তখন সেই ভাবে তাকে ঘণ্টাখানেক বেশ নড়ানো গেল, তখন রাত্রি প্রায় বারোটা। সকালবেলা উঠে দেখি আর হাঁ করতে পারি নে। তারপরে সে কি যন্ত্রণা। সে দিনরাত যে কি ক’রে গেল তা শুধু ভগবানই জানেন।
   
পরদিন ‘ডেন্টিস্ট’ এর কাছে গেলাম। তিনি বললেন, উপড়ে ফেলে দিতে হবে। উনিও সঙ্গে গিয়েছিলেন, বল্লেন, ওরে বাপ্ রে! একটি দাঁত তুল্লে সব কটি দাঁত দু-দিনে ঝু়র্ ঝুর্  ক’রে পড়ে যাবে এবং বেশ একটু ‘সায়েন্টিফিক’ ব্যাখ্যা ক’রে বুঝিয়ে দিলেন যে, দাঁতে দাতেঁ ঠেকে আছে—অসময়ে তুললেই আর রক্ষে থাকবে না। সাত পাঁচ ভেবে চলে আসা গেল, তারপর জ্বর। বুঝতেই পাচ্ছ কি কাণ্ড হচ্ছে। আর সহ্য হ’ল না, তার পরদিন তুলে এলাম।
   
সে য়া ‘ডেন্টিস্ট’! প্রথমে সে নড়া দাঁতের পাশে একটা ভাল দাঁত ধরে প্রায় আধ-ওপড়ানো গোছ ক’রে তুলেছিল। যত বলি, ওটা না, ওটা না সায়েব থামো থামো—সে ততই ব’লে সবুর কর আর একটু নি। তখন তার সাঁড়াশি হাত দিয়ে ঠেলে দিয়ে তবে দাঁতটা রক্ষা করি। তারপর নড়া দাঁত ওপড়ানো হ’ল। ওপড়ানো ত হ’ল—কিন্তু রক্ত থামে না।
   
‘ডেন্টিস্ট বললেন—বাবু, তোমার দাঁত খারাপ।
   
কথা শোন প্রমথ! তুই শালা তুলতে জানিস নে—রক্তপড়ার দোষ হ’ল আমার দাঁতের! যা হোক, এমনি ক’রে প্রায় ঘণ্টাখানেকের পর রক্ত বন্ধ ক’রে বাড়ী ফিরে এসে আবার জ্বর! আজো সেরে উঠতে পারি নি। ৮/১০ দিন লেখাপড়া, অফিস সমস্ত বন্ধ। না হ’লে তোমাদের লেখাখোগুলো শেষ হয়ে যেত। যা হোক, তাড়াতাড়ি ক’রে এইবার লিখে পাঠাব। ভেবো না।
   
আমার ঐ তিনটা গল্প বই ক’রে ছাপানো সম্বন্ধে আমার আপত্তি নেই, যদি না কিছু ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়। হাঁ বিক্রী হবে ব’লেই মনে হয়, কারণ এর মধ্যেই অনেকে জানতে পেরেছেন। তুমি যেমন করে ছাপতে বলবে তাই হবে—শুধু ছবি দেওয়া হবে না, এইটি আমার অনুরোধ। কপিরাইট বিক্রী করতে চাও কর, না করতে চাও ক’রো না—যা তোমার খুশী, আমি তোমার উপর সম্পূর্ণ ভার দিলাম। এ সম্বন্ধে আমাকে আর জিজ্ঞাসা করবার আবশ্যক নাই। তবে এই আশ্বিনে ভারতবর্ষে যে গল্পটা বার হবে, সেইটে নিয়ে চারটে একসঙ্গে ছাপলেই ভাল হয় বোধ হয়। কপিরাইট বিক্রী ক’রে যদি টাকা পাই ত এইচ্, স্পেনসার-এর বইগুলো কিনে ফেলি। যাহোক যা হয় ক’রো। আমার চাকরি ছাড়ার এত আবশ্যক নাই—ছুটি নিয়ে যাই—দেখি শুনি তার পরে যা হয় করা যাবে।
   
সমাজপতিকে চিঠির জবাব দিয়েছি। এই রকম লিখেছি যে, আপনি চতুর্দিকে অ্যাডভার্টাইজ করেন, তাতে প্রসিদ্ধ গল্পলেখক এবং চমৎকার গল্প-লেখক দীনেন্দ্রবাবু, প্রভাতবাবু, সরোজনাথ প্রভৃতির উল্লেখ করেন, কিন্তু আমার কিছুমাত্র উল্লেখ না থাকায় মনে করি আপনার মত প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক সমাজদার ও সমালোচক যখন আমার গল্পের কিছুমাত্র উল্লেখ করেন না, তখন নিশ্চয়ই আমার গল্প ভাল নয়। এই সঙ্কোচেই আমি আপনার প্রসিদ্ধ ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় লিখিতে ভয় পাই এবং ভবিষ্যতেও পাইব।
   
এখনো ত জবাব পাই নি। পেলে জানাব। বাস্তবিক লোক সহজ নয়। শুনলাম যমুনার বিনিময় বন্ধ ক’রে দিয়েছেন। যত আক্রোশ তাঁর যমুনার উপর। অথচ, তিনি যমুনাটি আগ্রহে পড়েন।
   
আজ আর না, রাত্রি দেড়টা, শুইগে।    

তোমার  শরৎ

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়

১৪ লোয়ার পোজনডং স্ট্রীট,
রেঙ্গুন, ২২ শে আগষ্ট, ১৩

প্রিয় উপীন,
   
অনেক দিন পরে তোমাকে চিঠি লিখিতে বসিয়াছি। তুমিও অনেক দিন আমাকে কোন সম্বাদ দাও নাই। নাই দাও, সেজন্য দুঃখ করিতেছি না বা অনুযোগ করিতেছি না। ২/৩ মাস পরে সম্ভবতঃ আবার আমাদের দেখাসাক্ষাৎ হইবে, তখন সে সব কথা হইতে পারিবে।
   
এ মাসের যমুনা পাইয়া তোমার ‘লক্ষ্মীলাভ’ পড়িলাম। এ সম্বন্ধে আমার মত তুমি বিশ্বাস করিবে কি না, তোমার কথাতেই প্রকাশ করিতেছি, ‘বাপের মুখে ছেলের সুখ্যাতি শুনে কায নাই—’। আমার যথার্থ মত, এমন মধুর গল্প অনেকদিন পড়ি নাই হয়ত তোমার ‘বেস্ট’ এটি। অনাবশ্যক আড়ম্বর নেই, লোকের দোষ দেখানো সংসারের দুঃখের দিকটা তুলিয়া ধরা ইত্যাদি কিছু নেই—শুধু একটি সুন্দর ফুলের মত নির্মল এবং পবিত্র! মধুর, অতি মধুর! এই আমি চাই। পড়িয়া যদি না আনন্দের আতিশয্যে চোখে জল আসে তবে আর সে গল্প কি? বড় ভালো হয়েচে উপীন, আমি আন্তরিক অভিপ্রায় প্রকাশ করিতেছি, যেন মাঝে মাঝে এমনি গল্প পড়তে পাই। অবশ্য আমাকে খুশী করা শক্ত, কিন্তু এমন পেলে আমি আর কিছু চাই না। আমার এত বড় সুখ্যাতিতে হয়ত তুমি একটু সঙ্কুচিত হবে এবং সবাই হয়ত আমার সঙ্গে একমতও হবে না, কিন্তু আমার চেয়ে ভাল সমঝদার এখনকার কালে এক রবিবাবু ছাড়া আর কেউ নেই। মনে কোরো না গর্ব করচি—কিন্তু আমার আত্মনির্ভরই বল, আর ‘প্রাইড’ই বল, এই আমার নিজের ধারণা। এমন গল্প অনেক দিন পড়ি নি। শুনেচি, তোমার আর একটি বড় এবং ভালো গল্প ভারতবর্ষে বেরিয়েচে। ভারতবর্ষ এখনো এসে পৌঁছে নি, বলিতে পারি না সেটি কেমন। কিন্তু যদি ভাবে মাধুর্যে এমনটি হয়ে থাকে, তা হ’লে সেও নিশ্চয় খুব ভাল গল্পই হয়েচে।
   
তা ছাড়া তোমাদের লেখার ‘স্টাইল’ টি বড় সুন্দর। আমি যদি এমনি সুন্দর ভাষা পেতাম, ভাষার ওপর এমনি অধিকার থাকত, তা হ’লে বোধ করি আমার গল্প আরো ভাল হ’ত। অবশ্য আমি নিজের সহিত তোমার তুলনা করচি না, তাতে তুমিও লজ্জা বোধ করবে, কিন্তু খুশী হ’লে আমি আর রেখে চেপে বলতে পারি নে। কেমন আছ আজকাল? আমি বড় ভাল নই—এই বর্ষাকালটা আমার বড় দুঃসময়। ১০/১২ দিন জ্বর হয়েছিল, দুদিন ভাল আছি। আমার ভালবাসা জেনো। ইতি—

শরৎ

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

প্রমথনাথ ভট্টাচার্য

১৪, লোয়ার পোজনডং, রেঙ্গুন
ডাকমোহর, ২ সেপ্টেম্বর, ১৯১৩

প্রমথনাথ,
   
আজ তোমার চিঠি পেলাম। কন্যর জন্ম হয়েছে শুনে বড় খুশী হলাম। এই দুটি বেঁচে থাক—আর আবশ্যক নাই।
   
জ্বর জ্বর হয়েই আছে। ডাক্তারের ওষুধ খাচ্ছি, পড়াশুনো একেবারে থামিয়েছি। কেন না, আমার এ বিষয়ে নেশার মত ঝোঁক ধরে। একবার সুরু করলে মোটেই ‘মডারেশন’ থাকে না, হয়ত রাত্রি ৩/৪ হয়ে যায়। হাঁ, নারীর মূল্য ও চন্দ্রনাথ দু-ই এইবারে শেষ হয়েছে। আমি তোমাকেও সময়ে গল্প পাঠাতে না পারার জন্য লজ্জায় তোমাকে চিঠি দিতেই পারছিলাম না। যা হোক শুনলাম প্রভাতবাবুর প্রভৃতির গল্প পেলে আর তাড়াতাড়ি নাই। তাছাড়া পূজার সংখ্যায় ওঁর গল্প দিয়ে আবার আমার গল্প দেবার স্থান সঙ্কুলানও হয়ত হ’ত না।
   
হাঁ, ঐসব গল্প বই ক’রে ছাপার জন্য কিছু কিছু সংশোধন ক’রে দিতে হবে, কেন না বিস্তর ছাপার ভুল ‘সেনটেন্স’ লোপ প্রভৃতি দোষ আছে।
   
ভাই প্রমথ, আজ তোমাকে একটা সত্য কথা বলি। আমার সন্দেহ হচ্ছে আমার আর বেশী দিন নাই। হয়ত বা এই বছরটাই শেষ বছর। যদি হঠাৎ সরি ভাই, মনে-টনে রেখো। তুমি ছাড়া আমার বোধ করি আর বন্ধুই নেই—কত যে তোমাকে ভালবাসি, তা একটু পূর্বেই বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভেবে দেখেছিলাম। যাক এ সব মেয়েলি দুঃখের কথা—যেতে হয় যাওয়া যাবে। তবে আর একবার যেন দেখা হয় এইটাই মনের শেষ সাধ। গেলে তোমার ওখানেই থাকব। মরি ত সদগতি হবে—বামুনের কাঁধে চড়ে, পরম মিত্রের মুখ দেখে, শেষ সেবা নিয়ে, নিমতলায় যাওয়া যাবে। কেমন? আমার কতটুকু ক্ষমতা ভাই, কিবা জানি, মাতৃভাষা আমার কাছে আর কি আশা করে? শুয়ে শুয়ে চিঠি লিখতে কষ্ট হচ্ছে—একটু জোর পেয়ে সব কথা ভাল ক’রে জবাব দেবো। প্রাণধনকে আমার কথা বলো।
   
আর এক়া কথা—‘বিন্দুর ছেলে’ গল্পটার অত্যন্ত সুনাম হয়েছে। অনেকের মত এইটাই ‘বেস্ট’। অনেকের মত ‘পথনির্দেশ’, অনেকের ‘রামের সুমতি’। ভাবি ‘ইক্যুয়ালি ইন্টেলিজেন্ট’ লোকদের মধ্যে এ রকম মতভেদ হয় কেন? এমন সংবাদও পেয়েছি যে ‘পথনির্দেশ’ ‘ইমমরাল’!!
   
ভাদ্রের যমুনায় দ্বিজুদার সম্মন্ধে একটি কবিতা বেরিয়েছে—ভারি সুন্দর! ভাদ্রের ভারতবর্ষ পাই নি। বোধ করি তাঁরা পাঠাতে ভুলেছেন, কিম্বা হয়ত অফিস-এর ঠিকানায় পাঠিয়েছেন, কেউ মেরে দিয়েছে। যাই হৌক সে কথা কাউকে জানাবার আবশ্যক নাই—তোমার কপিটা পাঠিয়ে দিয়ো, একবার পড়ে ফেরত পাঠাব।
   
দিদির সম্বাদ এখনও পেলাম না, সেজন্য ভেবে ভেবে আরো যেন শরীর খারাপ হয়ে উঠেছে। সেখানে টেলিগ্রাফ যায় না—চিঠির জবাব পাচ্ছি না। সমাজপতির সম্মন্ধে যা লিখেছ ঠিক সেই জবাবই পেয়েছি। আমিও বুঝেছি ব্যাপারটা কি! হ্যাণ্ডবিলও একখানা ফণি পাঠিয়েছিল—বাস্তবিক মিথ্যে কথা এমন নির্লজ্জভাবে বলেছেন যে, পড়ে তারও লজ্জা করতে থাকে। আমি তাঁকে কিছুতেই ‘লেখা’ পাঠাব না, কারণ তিনি তোমাদের শত্রু তার উপর সুবিধার লোক নন।

তোমার  শরৎ

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

ফণীন্দ্রনাথ পাল
১৪-৯-১৩

প্রিয়বরেষু,
   
....আমার সংবাদ যে আপনার মাতৃদেবী গ্রহণ করেন, আমার এ বহু সৌভাগ্যের কথা, আমি বেশ সুস্থ হইয়াছি তাঁহাকে জানাইবেন। আমার সংবাদ লইবার লোক সংসারে প্রায় নাই, সেই জন্য কেহ আমার ভাল মন্দ জানিতে চাহেন শুনিলে, কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ হইয়া উঠি। আমার মত হতভাগ্য সংসারে খুবই কম।....
   
উপকার করিতেছি, যশ মান স্বার্থ ত্যাগ করিতেছি ইত্যাদি বড় বড় ভাব আমার কোনও দিন নাই। কোনো দিন ছিল না আজও নাই, এ আর বেশি কথা কি ? যশের কাঙ্গাল হইলে সেই রকম হয়ত ইতিপূর্বেই চেষ্টা করিতাম, এতদিন এমত চুপ করিয়া থাকিতাম না।....
   
আরো একটা কথা এই যে, শতদ্বারী চণ্ডীপাঠক হইতে আমার লজ্জাও করে। একটা কাগজে নিয়মিত লিখি, এই যথেষ্ট। যে আমার লেখা পড়িতে ভালবাসে সে এই কাগজই পড়িবে, এই আমার ধারণা। তা ছাড়া হোমিওপ্যাথি ডোজে এতে একটু ওতে একটু, অশ্রদ্ধা ক’রে, যা—তা ক’রে, তর্জমা ক’রে পরের ভাব চুরি করে—এ সব ক্ষুদ্রতা আমার ছেলেবেলা থেকেই নেই। আর এত লিখিতে গেলে পড়াশুনা বন্ধ করিতে হয়, সেটা আমার মৃত্যু না হইলে আর পারিব না।....
   
আমার ছোট গল্পগুলা কেমন যেন বড় হইয়া পড়ে, এ ভারী অসুবিধার কথা। আরো এই যে আমি একটা উদ্দেশ্য লইয়াই গল্প লিখি, সেটা পরিস্ফুট না হওয়া পর্যন্ত ছাড়িতে পারি না। ‘বিন্দুর ছেলে’ আমি ভাবিয়াছিলাম আপনার পছন্দ হইবে না, হয়ত প্রকাশ করিতে ইতস্ততঃ করিবেন। তাই পাছে আমার খাতিরে অর্থাৎ চক্ষুলজ্জার খাতিরে নিজে ক্ষতি স্বীকার করিয়াও প্রকাশ করেন, এই আশঙ্কায় আপনাকে পূর্বেই সতর্ক করিয়া দিতেছিলাম। অর্থাৎ ‘সিনসিয়ার’ হওয়া চাই—যদি সত্যই আপনার ভাল লাগিয়া থাকে, ছাপাইয়া ভাল করিয়াছেন—তাতে পাঠক যাই বলুক।
   
‘নারীর মূল্য’ আগামী বারে শেষ করিয়া আর একটা সুরু করিব। নারীর মূল্যের বহু সুখ্যাতি হইয়াছে। আমি মনে করিয়াছি, ১৪টা মূল্য ঐ রকমের লিখিব। এবারে হয় প্রেমের মূল্য, না হয় ভগবানের মূল্য লিখিব। তার পরে ক্রমশঃ ধর্মের মূল্য, সমাজের মূল্য, আত্মার মূল্য, সত্যের মূল্য, মিথ্যার মূল্য, নেশার মূল্য, সাংখ্যের মূল্য ও বেদান্তের মূল্য লিখিব।....
   
চরিত্রহীন মাত্র ১৪/১৫ চ্যাপটার লেখা আছে, বাকি় অন্যন্য খাতায় বা ছেঁড়া কাগজে লেখা আছে, কপি করিতে হইবে। ইহার শেষ কয়েক চ্যাপটার যথার্থই গ্র্যাণ্ড করিব। লোকে যা ইচ্ছা বলুক, কিন্তু শেষে তাহাদের মত পরির্বতত হইবেই। আমি মিথ্যা বড়াই করা ভালবাসি না এবং নিজের ঠিক ওজন না বুঝিয়াও কথা বলি না। তাই বলিতেছি, শেষটা সত্যই ভালো হইবে বলিয়াই মনে করি। আর মরাল্ হোক ইমমরাল্ হৌক, লোকে যেন বলে, ‘হ্যাঁ, একটা লেখা বটে’। আর এতে আপনার বদনামের ভয় কি? বদনাম হয় ত আমার। তা ছাড়া কে বলিতেছে আমি গীতার টীকা করিতেছি? ‘চরিত্রহীন’ এর নাম—তখন পাঠককে ত পূর্বাহ্নেই আভাস দিয়াছি—এটা সুনীতিসঞ্চারিণী সভার জন্যও নয়, স্কুলপাঠ্যও নয়! টলস্টয়ের ‘রিসারেকসন্’ তাহারা একবার যদি পড়ে, তাহা হইলে চরিত্রহীন সম্মন্ধে কিছুই বলিবার থাকিবে না। তা ছাড়া ভাল বই, যাহা আর্ট হিসাবে—সাইকোলজি হিসাবে বড় বই, তাহাতে দুশ্চরিত্রের অবতারণা থাকিবেই থাকিবে। কৃষ্ণকান্তের উইলে নাই?....
   
টাকাই সব নয়, দেশের কাজ করা দরকার; পাঁচ জনকে যদি বাস্তবিক শিখাইতে পারা যায়, গোঁড়ামির অত্যাচার প্রভৃতির বিরুদ্ধে কথা বলা যায় তার চেয়ে আনন্দের বস্ত্ত আর কি আছে? আজ লোকে আমাদের মত ক্ষুদ্র লোকের কথা না শুনিতে পারে, কিন্তু একদিন শুনিবেই। ....একদিন এই সঙ্কল্প করিয়াই আমি সাহিত্য-সভা গড়িয়াছিলাম, আজ আমার সে সভাও নাই সে জোরও নাই।

শরৎ

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

প্রমথনাথ ভট্টাচার্য
৩0-৯-১৩

প্রমথ,
   
আজ তোমার চিঠি পেলাম। তোমার বাড়ীর খবর শুনে বড় চিন্তিত হয়ে থাকলাম, অতি শীঘ্র ভাল সম্মাদ দিয়ো। আপাততঃ একটু ভাল ক’রে ঘরের দিকে মন দাও, পরের কায দু-দিন পরে করলেও চলবে। বৌঠানের আবার কি হ’ল? বাহিরেই বা যাবে কেন? কলকাতায় থাকতে পেলেই ত লোক বেঁচে যায়—তুমি ছেড়ে যেতে চাও কেন?
   
না, আমি পূজার সময় যাব না। যেতাম শরীর ভাল থাকলে। অসুস্থ থাকা পর্যন্ত কারু কাছে কিছুতেই যাব না। ও আমার ভারী লজ্জা করে। সারলেই পালাব নিশ্চয়।
   
গল্পটা খানিক লিখেছিলাম—তোমরা এমনি নামের মহিমা যে সেটা একেবারেই কদাকার হয়ে উঠেছিল; শেষ না হ’লে কোনমতেই বলা চলে না ছাপার উপযুক্ত কি না! যদি দেখি ভাল হয় নি, তোমার নামে ছাপতে হবে। অঘ্রাণে ছাপা হ’লেই ভাল হয়—আমিও দু-দিন বিশ্রাম করি। অর্থাৎ পড়া লেখা যেমন বন্ধ করে আছি, তেমনই থাকি! তবু তোমাদের কিছু সত্যিই আটকায় না, কিন্তু যে বেচারার সত্যিই আটকাচ্ছে তার জন্যেই বিশেষ উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। লিখি নে বটে, কিন্তু ভাবতেও ছাড়ি নে। সেটা ভাল ভাবনা নয়, নিতান্তই দুর্ভাবনা। আমি ছাড়া সে বেচারার আর প্রায় কোন সম্বলই নেই। তবে বুড়িকে এক রকম পরওয়ানা জারি ক’রে দিয়েছি যে, যমুনাকে বিশেষ সাহায্য করতে হবে। সে আমার হুকুম কোন কারণেই অমান্য করতেই পারে না, সেই ভরসা। তা হ’লে কি হয়, সে বেচারাও প্রায় শয্যাগত।
   
আমার নারীর মূল্যও শেষ হ’ল; বিস্তর সুখ্যাতি ক’রে অনেক পরিচিত অপরিচিত লোকেরই এ সম্মন্ধে চিঠি পেলাম—কিন্তু ভাবছি লোকে আমার নাম জানলে কি ক’রে? হয় ফণির দ্বারা, না হয় তোমার দ্বারা এই অনিষ্ট ঘটেছে।
   
এবার কি সুরু করি বল ত? দশটা মূল্যের, বেশ্যার মূল্য আর নেশার মূল্য যা বোধ করি সবচেয়ে ‘ইন্টারেস্টিং’ হ’ত, তাইতেই বন্ধু বান্ধবের ভীষণ আপত্তি। তারা কিছুতেই রাজী নয় যে, আমি এ দুটো দিদির নাম দিয়ে লিখি। মনে করেছি ‘ইভলিউশন্ অব্ (আইডিয়া অব্) গড্’ কিম্বা ‘ইভলিউশন্ অব্ আইডিয়া অব্ সোল্’ সুরু করব। অবশ্য ঠিক নারীর মূল্যের ধরনেই। তুমি যা বল, তাই করব।
   
আমি তোমাকে অনেক অপদস্থ করেছি, আমার সব মনে আছে—একটু ভাল হই, তারপর দেখা যাবে যদি শোধ করতে পারি। আমার ব্যবহার তুমি যত ক্ষুণ্ণই হয়ে থাক না কেন, একদিন এটা যাতে ভুলতে পার, সে কথা আমি এক মুহূর্তের জন্যও ভুলি না। চিঠির জবাব একটু তাড়াতাড়ি দিয়ো। বড় ভাল নই।

তোমার শরৎ
   
পুনঃ—চন্দ্রনাথ তোমার ভাল লাগবে তাতে আশ্চর্যের বিষয় নাই, কেন না, ওটা আমার ভাল লাগে নি। একে ত ছেলেবেলার লেখায় স্বভাবতই অপূর্ণতা বেশী, তাতে মাঝে মাঝে উচ্ছ্বাস র’য়ে গেছে। এই উচ্ছ্বাস বস্তুটিতে আমার ভীষণ ভয়। যাই হৌক পাঁচজনের ভাল লাগলেই ভাল, তবে ভাষা খুবই সরল—বোধ করি আশ্চর্য সরল এবং ‘ডিরেক্ট’ এ অস্বীকার করা যায় না।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

ফণীন্দ্রনাথ পাল
রেঙ্গুন, ১0-১0-১৩

প্রিয়বরেষু,   
   
তোমার প্রেরিত ‘বড়দিদি’ পাইয়াছিলাম, মন্দ হয় নাই। তবে ও বাল্যকালের রচনা, ছাপানো না হইলেই বোধ করি ভাল হইত।
   
আজকাল মাসিক পত্রে যে সমস্ত ছোট গল্প বাহির হয়, তাহার পনেরো আনা সম্মন্ধে সমালোচনাই হয় না। সে সব গল্পও নয়, সাহিত্যও নয়—নিছক কালিকলমের অপব্যবহার এবং পাঠকের উপর অত্যাচার। এবার....এতগুলো গল্প বাহির হইয়াছে, অথচ একটাও ভাল নয়। অধিকাংশই অপাঠ্য। কোনটার মধ্যে বস্তু নাই, ভাব নাই—আছে শুধু কথার আড়ম্বর, ঘটনার সৃষ্টি আর জোরজবরদস্তির ‘প্যাথস্’; বুড়ো বেশ্যাকে সাজগোজ করিয়া যুবতী সাজিয়া লোক ভুলাইবার চেষ্টা করা দেখিলে, মনের মধ্যে যেমন একটা বিতৃষ্ণা, লজ্জা অথবা করুণা জাগে, এই সব লেখকদের এই সব গল্প লেখার চেষ্টা দেখিলে সত্যই আমার মনে এমনিধারা একটি ভাবের উদ্রেক হয়, তাহা আর যাই হোক, মোটেই ‘হেলদি’ নয়। ছোট গল্পের কি দুরবস্থা আজকাল।
   
দুই একটা কথা চরিত্রহীন সম্বন্ধে বলি। এ সম্বন্ধে লোকে কে কি বলে শুনিলেই আমাকে জানাইবে। এই বইখানার বিষয়ে এত লোকের এত রকম অভিপ্রায় যে, ঐ সম্বন্ধে একটা কিছু ধারণা করাও শক্ত। ইমমরাল ত লোকে বলিতেছেই—কিন্তু ইংরাজী সাহিত্যে যা—কিছু বাস্তবিক ভাল, তাতে এর চেয়ে ঢের বেশি ইমমরাল ঘটনার সাহায্য লওয়া হইয়াছে। যাই হোক, সাহিত্যিকদের মতামত আমাকে জানাইয়া দিবে।....   

শরৎ

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

প্রমথনাথ ভট্টাচার্য

১৪, লোয়ার পোজনডং স্ট্রীট,
রেঙ্গুন, ২২-১০-১৩


প্রমথ,   
   
তোমার চিঠি পেয়ে বিশেষ চিন্তিত হলাম। এখন অন্য সব আলোচনা আমার সত্যই ভাল লাগে না। তোমার বাড়ীর খবর একটু একটু ক’রে জানাবে। বৌঠান কেমন আছেন এবং কি রকম ব্যবস্থা করছ শীঘ্র লিখে চিন্তা দূর করবে। তোমার পিসীমা যখন ভাল হবেন, এবং অন্য খবর সব মঙ্গল ব’লে লিখতে পারবে, তখন আমিও আমার সম্বন্ধে আলোচনা করব, এখন নয়। হাওয়া বদলাবার ব্যবস্থা করতে বিলম্ব ক’রো না।
   
যা হোক দুটো কথা জানবার আছে। যমুনা সম্বন্ধে তুমি যা বলেছ—‘নোটেড’।
   
দ্বিতীয়, তোমার জন্যে যেটা লিখতে লিখতে ছেড়ে দিয়েছিলাম, সেটা শেষ হ’ল। নিতান্ত মন্দ হয়নিই ব’লে মনে হচ্ছে কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ মস্ত বড় হয়ে গেল—দুয়ের বার হয়ে গেছে। বিন্দুর ছেলের দেড়া বড় হয়েছে, কি উপায় করি? আবার তাড়াতাড়ি আর একটা লিখতে সুরু ক’রে দিয়েছি। তুমি যদি বল তোমার উত্তর পাওয়া মাত্র ঐ বড়টা রেজেস্ট্রি ক’রে পাঠাতে পারি। তোমাকেই পাঠাব, কেন না তোমার জন্যে লেখা—যা খুশী করতে পার।
   
‘মূল্য’ ‘টূল্য’ সুরু করেছি বটে, এগোচ্ছে না। কারণ শরীর সারলেও বেশী চাপ দিতে সাহস হয় না। না, ওগুলো ফাঁকিতে সারা যায় না।
   
তোমাদের ভারতবর্ষ যে রকম উন্নতি করছে বাস্তবিক বড় সুখের বিষয়। কিন্তু আমি ত সত্যই ভেবে পাই না এত উন্নতির হেতু কি? ইন্দ্রজাল তোমরা জানো বলতে পারি না। এক একবার ভাবি, দ্বিজুদা বেঁচে থাকলে না জানি কি রকম হ’ত?
   
তোমার নিজের যা লেখা আছে ছাপাও না কেন? আমি না পড়েই বলতে পারি, তা তোমাদের কাগজে শীর্ষস্থানে স্থান পেতে পারবে।
   
বিভূতির নভেলটা তোমরা ছাপালে ত খুব ভাল হয়। এমন গ্র্যাণ্ড বই আমি অনেক দিন পড়ি নি—তাই বা কেন, কোনদিন পড়ি নি। কিন্তু দোষও আছে—সেটা হচ্ছে এই যে ‘এ্যারেঞ্জমেণ্ট’এ গোলমাল আছে ব’লে মনে হচ্ছে—অর্থাৎ ‘চ্যাপ্টার’ আর ঘটনাগুলো একটু নাড়িয়ে চাড়িয়ে বসাতে হবে। বস্তু আর ভাব যা আছে তা যথার্থই অতি সুন্দর, যে—কোন কাগজের গৌরবের জিনিস হবে কিন্তু আমার ভয় হয়, ‘অ্যারেঞ্জমেণ্ট’ এর এই গোল থাকাতে অনেকেরই প্রথমটা পড়েই বিস্বাদ লাগবে। আর এগোতে চাইবে না—শেষ পর্যন্ত পড়বে না। আমি পুঁটুুর (বিভূতির) চিঠি পেলে তোমাকে অন্য কথা জানাব।           

শরৎ
   
আমার রামের সুমতি প্রভৃতির কপিটপি পরে হবে। তাড়াতাড়ি কি? সমস্তই আমার ঠিক করা আছে, পাঠালেই হয়।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

প্রমথনাথ ভট্টাচার্য
৩১-১০-১৩

প্রমথ,    
   
তোমার পত্রের আশায় আশায় থাকিয়া বিলম্ব হইয়া গেল। আজ এই মাত্র তোমার চিঠি পাইয়াছি। যেমন সময়ে পাইলাম, তখন আর রেজেস্ট্রি করিবার সময় ছিল না এবং ‘আনরেজিস্টার্ড’ পাঠাইতে সাহস হইল না বলিয়া আগামী মেলে পাঠাইতে হইবে। এ মেলে হইল না।
   
তোমার চিঠির জন্য অপেক্ষা করিতেছিলাম এই ভাবিয়া যে, এত বড়টা তোমাদের কাযে লাগিবে কি না। এখন দেখিতেছি ‘বিন্দুর ছেলে’র ডবল হইয়া গিয়াছে। আমার গল্পের একটা নেচারাল্ সমাপ্তি আছে, প্লট হিসাবে সেটা সম্পূর্ণ আপনা আপনি হয়, আমি গরজ বুঝিয়া ছোট কিম্বা বড় করিতে পারি না। এখানে আমার গুটিকতক সমঝদার সাহিত্যিক বন্ধু আছেন, তাদের মতে, আমার অপরাপর গল্পের চেয়ে—আর্ট প্রভৃতি হিসাবে, এবং লেখার হিসাবেও ‘ফার্ মোর এক্সেলেণ্ট’—তবে আমি নিজে ঠিক সে কথা বলিতে পারিব না, আমার নিজের লেখার সম্বন্ধে নিজে ঠিক ‘জাজ্’ নই। তোমরা ভাল বলিলেই এখন সার্থক হয়। একটু মন দিয়া বুঝিয়া দেখিবার চেষ্টা করিয়ো—তবে এটা অবশ্য বলিতে পারি, তোমাদের কাগজে এ পর্যন্ত যাহা বাহির হইয়াছে, তাহার চেয়ে কোনমতেই নিকৃষ্ট হইবে না। এখন তোমাদের রুচি। একে তুমি যেমন ইচ্ছা তেমনি প্রকাশ করিতে পার অর্থাৎ যা ভাল বুঝিবে তাই করিয়ো। আমার শুধু এই অনুরোধ যে ছবি দিতে পারিবে না। তাহাতে অনর্থক পয়সার শ্রাদ্ধ অথচ আমার মতে আবশ্যকীয় নয়। অন্ততঃ আমার গল্পে নয়। আশা করি আমার এই অনুরোধটা একবার রাখিবে। তাহাতে আমারও আহ্লাদ হইবে, তোমাদেরও পয়সা বাঁচিবে এবং গ্রাহকও খুশীই হইবে, অন্তত দুঃখিত হইবে না।

শরৎ
   
আগামী মেলে রেজিস্টার্ড তোমার ঘরের ঠিকানায় পাইবে।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়

১৪, লোয়ার পোজনডং স্ট্রীট, রেঙ্গুন
৭-১-১৪

প্রিয় মণিবাবু,
   
অনেক দিন হইয়া গেল আপনার চিঠির জবাব দিই নাই। এই ত্রুটির জন্য নিজেই লজ্জিত হইয়া আছি, ইহার উপর আপনি আর যেন কিছু মনে করিবেন না।
   
আপনার লেখার সমালোচনা শুনিয়া আপনি যে দঃখিত হন নাই, একথা আপনার নিজের মুখে শুনিয়া বড় স্বস্তি পাইলাম। মাঝে মাঝে ভাবিতাম, আমার নিজের ত এই বিদ্যা, অপরের দোষ দেখাই, হয়ত বা তিনি কি ভাবিয়াছেন। যাক—বড় সুখী হইয়াছি।
   
আমি তার পরেও আপনার বইটা আর একবার আগাগোড়া পড়িয়াছিলাম, সত্যই খুব ভাল লাগিয়াছে—এবার আরও যেন একটু বেশি করিয়া বুঝিয়াছি, কেন এ লেখা সকলের আমার মত ভাল লাগে না। যথার্থই আপনার লেখার টোনটা কবির মত।
   
এ্যাবষ্ট্রাক্ট ভাবের কবিতা যে—সব লোকের ভাল লাগে না একথা নিশ্চয় বলিতে পারি।
   
যে-সব কবিতায় বা ছোট গল্পে অনেক ফ্যাক্ট আছে, ঘটনা আছে ভাবটা নিতান্ত সাদাসিধা সাংসারিক, আমি দেখিয়াছি বেশি লোকেরই তা ভাল লাগে, তারা সেটা বোঝে ভাল, কেন না বোঝা সহজ। এইখানে আরো একটা কথা বলি। অনেক দিন পূর্বে বসুমতী কাগজে আপনার ‘বিন্দু’র সমালোচনা(?) করিয়া বলে, ‘হিন্দুর বিধবার রাত্রে আর এক বাড়ীতে যাওয়া কি রুচি, ইত্যাদি ইত্যাদি।’ (আমার এক বন্ধু এই সমালোচনার কথা আমাকে জানন—আমি নিজে ঠিক কথাগুলো দেখি নাই।) সেইটা শুনিয়া একবার আমার মনে হয় এই লোকটার স্পর্দ্ধার মত আমিও একটা কঠিন প্রতিবাদ করিয়া কোন কাগজে ছাপাইয়া দিই—আমার মনে হইয়াছিল বলিব এবং খুব কড়া করিয়াই বলিব, ‘লেখকের রুচি খুব ভাল, শুধু তুমি গোঁড়া এবং নির্বোধ তাই ইহাতে দোষ দেখিয়াছ’। বিন্দুর অপরাধটা যে কি আমি তাহা ত কোন মতেই ভাবিয়া পাইলাম না। সে বেচারা আর একটা নিতান্ত নিরুপায় হতভাগা সঙ্গীকে রাত্রিতে লুকাইয়া দেখিতে গিয়াছিল, যদি আবশ্যক হয় এক ফোঁটা মুখে জল দিবে কিম্বা এমনি একটা কিছু করিবে—এই ত। এইতেই মহাভারত, অশুদ্ধ হইয়া গেল। হয়ত বা মনে মনে একটু স্নেহও করিত—খেলার সঙ্গী—ইহা কি দোষের না রুচিবির্গহত? কারণ, সে বিধবা—অর্থাৎ হিন্দুর বিধবার সুমুখে কেউ যদি মরে, আর সে যদি একটা আঙ্গুল দিয়া স্পর্শ করিলেও সে বাঁচে, হিন্দু বিধবা তাও যেন না করে—যেহেতু সে বিধবা এবং যে লোকটা মরিতেছে সে পরপুরুষ! এই ইহাদের হিন্দু বিধবার আদর্শ!
   
মনে হয়, লোকগুলা এতটাই সঙ্কীর্ণ মন লইয়া পরের দোষ দেখাইবার স্পর্দ্ধা করে এবং দেখায় এবং লোকে সেই সমালোচনা পড়িয়া বলে, ‘ঠিক ত! ঠিক কথাই বলিয়াছে।
   
আমি ঠিক বলিতে পারি না সমালোচনা কিরূপ ছিল, যেমন আমার বন্ধুর কাছে শুনিয়াছি সেইমত বলিলাম। আপনি নিজে হয়ত এই সমালোচনা দেখিয়াছেন।
   
আবার কতকগুলো পাঠকে মনে করে, যেখানে সেখানে জপতপ আর সন্ন্যাসী আর হিন্দু ধর্মের বড় বড় কথা না থাকিলে সে গল্প বা উপন্যস কোন মতেই ভাল হইতে পারে না।
   
আপনি লিখুন দেখি কোন বিধবার বিবাহ হইয়াছে—আপনার আর রক্ষা থাকিবে না—মার্ মার্ শব্দ করিয়া সব ছুটিয়া আসিবে। আর এই লোকগুলা নিতান্ত বেহায়া গালিগালাজ করিতে বিশেষ পটু, সেইটাই ইহাদের জোর—অর্থাৎ এরা চীৎকার করিয়া এবং গায়ের  জোরে জিতিবার চেষ্টা করে এবং জিতিয়াও যায়।
   
দিন দিন আমাদের সাহিত্য যেন একেবারে একছাঁচে ঢালা গোছ হইয়া উঠিতেছে—প্রতি দিন সঙ্কীর্ণ হইতে সঙ্কীর্ণতর হইয়া উঠিতেছে। (তাই এক একবার আমার মনে হয় উচ্ছৃঙ্খল লেখা লিখিতে সুরু করিয়া দিব—কেবল রাগের উপরেই যা-তা লিখিয়া ফেলিব!) আমি কিছু দিন পূর্বে আমার দিদির নামে ‘নারীর মূল্য’ বলিয়া একটা প্রবন্ধ লিখি। আমার দিদি ব্যাপারটা আমাকে চিঠিতে লিখিয়া পাঠান, আমি সেইটাকে বড় করিয়া লিখি। এজন্য আত্মীয় বন্ধুবান্ধবেরা কত যে আমাকে চোখ রাঙাইয়াছেন তাহা লিখিয়া জানান যায় না। কেহ কেহ এমনও বলিয়াছিলেন, আমি ম্লেচ্ছভাবাপন্ন—ঠিক হিন্দু নই। অথচ, হিন্দুধর্মকে আমি এক তিলও কটাক্ষ করি নাই, ইহার গোঁড়ামিকে আক্রমণ করিয়াছিলাম মাত্র। কত লোকে কত সমালোচনা (ভয়ানক প্রতিবাদ) করিবেন বলিয়া ভয় দেখাইলেন, অথচ আজ পর্যন্ত কেহই কিছু করিলেন না। সেই সময়ে আমার এক মামা চিঠি লিখিলেন আমি মনে মনে ব্রাহ্ম বাহিরে হিন্দু। অথচ, আমার গলায় তুলসীর মালা আছে, সন্ধ্যা-আহ্নিক না করিয়া জলগ্রহণ করি না, যার তার হাতে জল পর্যন্ত খাই না। (কিছু মনে করিবেন না মণিবাবু, আপনার কাছে এ-সব বলা অন্যয়।) আমি যা’ তাই শুধু আপনাকে বলিলাম। এ-সব থাকা সত্ত্বেও তাঁরা আমাকে কত যে গালিগালাজ করিলেন এবং আমি ভড়ং করি বলিয়া শাসাইয়া দিলেন তাহা আর কত লিখিব। তার পরেই পীড়িত হইয়া পড়িলাম, না হইলে ইচ্ছা ছিল, ঐ রকম করিয়া ‘ঠাকুর দেবতার মূল্য’ এবং হিন্দু শাস্ত্রের মূল্য’ বলিয়া প্রবন্ধ সুরু করিব। যাক নিজের কথাতেই চিঠি পূর্ণ করিয়া দিলাম—কেমন আছেন? শরীর সারিল কি? নূতন কিছু লিখিলেন? হাঁ ভাল কথা, যা লিখিবেন শেষটায় অস্থির (ইমপেশেন্ট) হইয়া শেষ করিবেন না—এইখানে বোধ করি আপনার দোষ হয়।

আপনার

শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
   
একটা অনুরোধ, যাহাই এই চিঠিতে লিখিয়া থাকি না কেন দোষ লইবেন না—যদি বা কিছু অন্যয় বলিয়াও থাকি তাহা হইলেও।
   
পুঃ—আপনার ভাষায় দু-একটা তুচ্ছ খুঁত লইয়া প্রায়ই লোকজনকে হৈ চৈ করিতে দেখি। অবশ্য, আমি নিজে আপনার (ওই খুঁতগুলার) মত লিখি না, কিন্তু দোষও দেখি না। আপনি জানিয়া শুনিয়াই ঐ ভাষা এবং বানান লিখিতেছেন—বেশ করিয়াছেন। যাহা ভাল বলিয়া বুঝিতেছেন, শুধু পরের কথায় ছাড়িবেন না। আর যদি নিজে দেখেন ওগুলা বদলানো আবশ্যক, তখন বদলাইবেন।
   
মণিলাল বাবুর আদি নিবাস ঢাকা বিক্রমপুর। পিতার নাম অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়। ভারতীর একজন লেখক ছিলেন মণিলাল বাবু। সেই সময়ের তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক। ‘মনেমনে’, ‘জাপানী ফানুস’, ‘জলছবি’, ‘ভুতুড়ে কাণ্ড’, ‘কল্প কথা’, ‘আলপনা’, প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা হিসাবে তিনি বাংলা সাহিত্যে তাঁর নিজের আসন করে নিয়েছেন। তিনি বহুকাল ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। শরৎচন্দ্রের বাল্যবন্ধু সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় ছিলেন ‘ভারতী’র সহ-সম্পাদক তিনি শরৎচন্দ্রের সঙ্গে মণিলাল বাবুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ‘ভারতী’র অফিসে।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

হরিদাস চট্টোপাধ্যায়

৬৭/৯, লুইসস্ট্রীট, রেঙ্গুন
৩-১-১৫

প্রিয়বরেষু,
   
আসিবার সময় আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে নাই। সেদিন আপনার পিতাঠাকুর মহাশয়ের অসুখ হওয়ায় আপনি দোকানে আসিতে পারেন নাই। আমিও আর যাইতে পারি নাই।  তলপেটে একটা প্রবল ব্যথা হওয়ায় ৪/৫ দিন নড়িতে চড়িতে পারি নাই। পথে ভারি কষ্ট পাইতে হইয়াছিল। উপর্যুপরি দুই মেলে টিকিট না পাওয়ায়, আর অপেক্ষা করিতে না পারায় অবশেষে ডেকের টিকিট লইয়াই রওনা হই। অসম্ভব বেশি ভীড় প্রভৃতির জন্য এখানে আসিয়াই জ্বর হয়। ৬/৭ দিন পরে ভাল হই।
   
প্রমথ একজোড়া প্রকাণ্ড খাট তৈরি করিবার ফরমাস দিয়াছিল। তাহা তৈরি হইয়া গিয়াছে এবং খুব সম্ভব ৪/৫ দিনের মধ্যে আমার একটি বন্ধুর সঙ্গে কলিকাতায় পাঠাইতে পারিব। কিন্তু সে ত ছত্রপুরে গিয়াছে। তাই মনে করিতেছি, আপনাকে টেলিগ্রাফ করিলে যদি লোক পাঠাইয়া ‘জেটি’ হইতে খাট দুটি লইয়া যাইবার ব্যবস্থা করিয়া দিতে পারেন ত বড় ভাল হয়।
   
আমি আসিবার সময় তাড়াতাড়িতে একটি বইও আনিতে পারি নাই। একখানি ভারতবর্ষ আমার সঙ্গে নাই। ঐ দুটো গল্প (যে দুই সংখ্যার ভারতবর্ষে আছে), দয়া করিয়া যদি পাঠাইয়া দেন আমি একটু দেখিয়া শুনিয়া দিই।
   
আপনার কাছে আমি বহু বিষয়ে ঋণী। যদিও বলা বাহুল্য, তথাপি না বলিয়াও ত থাকিতে পারি না। নিজেদের কর্তব্যও আমরা সব সময়ে করি না। এও বোধ করি আমাদের অন্তর্নিহিত স্বভাব। অথচ বাহিরের সংসারে সমস্তই ন্যায্যমত না করিলে সংসারই অচল হইয়া পড়ে।
   
যাই হোক্ কলিকাতার হাঙ্গামা হইতে দূরে আসিতে পারিয়া যেন হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিয়াছি। দেখি যদি নূতন কিছু করিতে পারি।
   
আপনার বাড়ীর সম্বাদ জানাইবেন। বিশেষ করিয়া আপনার পিতাঠাকুর মহাশয় কেমন আছেন ইহাই শুনিবার জন্য উৎসুক হইয়া আছি।
   
আমি নিজে ভাল আছি। আমার ভালবাসা জানিবেন। ইতি—

আপনার শরৎ

হরিদাস চট্টোপাধ্যায় ছিলেন গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়’এর জ্যেষ্ঠ পুত্র। গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজন বিখ্যাত পুস্তক ব্যবসায়ী। হরিদাস বাবু যখন মেট্রোপলিন ইনস্টিটিউসনে (বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ) এফ. এ. পড়েন সেই সময় প্রমথনাথ ভট্টাচার্য’র (এঁর পরিচয় আগে দেওয়া আছে) সঙ্গে পরিচিত হন। ক্রমে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা হয়। এই সময় কলকাতায় ইভিনিং ক্লাব নামে এক বিখ্যাত ক্লাব ছিল। এই ক্লাবের সভাপতি ছিলেন কবি নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায। প্রমথ বাবু একদিন ক্লাবে এক সভায় একটি মাসিক পত্রিকা বার করার প্রস্তাব রাখেন। কাগজ চালানো তৎকালীন যুগে যথেষ্ট ব্যয়সাধ্য কাজ ছিল। হরিদাস বাবুকে কাগজ বার করার অনুরোধ জানান হল। তিনি বললেন, দ্বিজেন্দ্রলাল যদি সম্পাদক হন তবে পত্রিকা বার করার কথা তিনি তাঁর পিতাকে বলতে পারেন। শেষে দ্বিজেন্দ্রলাল রাজি হলেন হরিদাস বাবু হলেন সম্পাদক। পত্রিকা প্রকাশ পেল গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স থেকে। নাম ‘ভারতবর্ষ,’ শরৎচন্দ্র এই পত্রিকায় লিখতেন।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

হরিদাস চট্টোপাধ্যায়

৬৭/৯, লুইস্ স্ট্রীট, রেঙ্গুন
২৭-১-১৫

প্রিয়বরেষু,
   
আপনার পত্র এবং ভারতবর্ষগুলি যথাসময়ে পাইয়াছি। শীঘ্রই ফেরৎ পাঠাইব।
   
টাকার কথা যাহা লিখিয়াছেন, তাহাতে শতকরা ৯৯ জন লোকই খুশী হয় এবং আশীর্বাদ করে। অবশ্য আমি আশীর্বাদ করিতেছি না, তবে আন্তরিক শুভাকাঙ্খা করিতেছি।
   
আপনার পিতাঠাকুর মহাশয় যদি কিছুও ‘ইমপ্রুভ্’ করিয়া থাকেন, যখন চিঠি লিখিবেন তাহা জানাইবেন। কারণ, উনি বাঁচিয়া থাকা পর্যন্ত আপনার কোন অমঙ্গল হইবে না।
   
উপীনবাবুর চিঠি ত পাই নাই। বোধ করি শেষকালে মত বদলাইয়াছেন।
   
আমি বেশ ভাল আছি এবং যা পারি র্নিববাদে লিখিবার অবকাশ পাইতেছি। মেল ক্লোজ্ করিবার সময় হইয়া আসিল। ইতি—

আপনার  শরৎ

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

প্রমথনাথ ভট্টাচার্য

৫৪, ৩৬, স্ট্রীট, রেঙ্গুন,
খামের ওপর ডাকমোহর,
২৫ ফেব্রুয়ারী, ১৯১৫

প্রমথ,
   
তোমার পত্র পাইয়া জানিলাম তাহারা সবাই ভাল আছে। তোমার আবার জ্বর হইতেছে শুনিয়া বড় উদ্বিগ্ন হইলাম। ব্যাপার কি, ম্যালেরিয়া নাকি? বোধ হয় তাই। তা যদি হয় বিশেষ সতর্কতা আবশ্যক।
   
খাট দু ভাল হয় নাই, তাহা আমিও বুঝিয়াছিলাম—নেহাৎ জাবাড়েগোছের হইয়াছে—মিস্ত্রীর অসুখ না হইলে আর একটু চলনসই হইলেও পারিত। যা হোক কতক কাজে লাগাইতে পারিয়াছ শুনিয়া সুখী হইলাম। মাপ দিতে ভুল করিয়াছিলে, তাই আবার বেঞ্চি করিয়া গচ্ছা লাগিল—সেটা নেহাৎ তোমারই দোষ।
   
খাটের দাম ২৩+১, পেতলের স্ক্রু। আর বাঁধবার দড়ি, কিছু কুলীর খরচ। সেটা ‘কন্টিজণ্ট এক্সপেন্স’। এই ২৪ টাকার বাকী ২০ টাকা দেবার জন্য তোমার যেন আহার নিদ্রা বন্ধ হইয়াছে। প্রতি পত্রেই সেই কথা। এ জানিয়া রাখ বিশ টাকা না পাইলেও আমার দুঃখ অসহ্য হইয়া উঠিবে না, পাইলেও বিশেষ দুঃখ দূর হইবে না। আমার অভাব উহাতে বাড়েও না কমেও না। দিলে ভাল হয় দাও, না দিলে ভাল হয় দিও না। আমি আর বকাবকি করিতে পারি না। কি একটা তুচ্ছ কথা কতবার উল্লেখ করিবে? তুমি ত আমাকে ঢের জিনিস দিয়াছ, আমি ত অম্লানমুখে লইয়াছি—কখনও টাকা দিবার জন্য মনের মধ্যে সঙ্কোচ বোধ করি নাই। যেমন করিয়া দিলে তোমার ভাল বোধ হয়, তাই দিয়ো। চোরবাগানেই দিয়ো।
   
এঁকে ত এবার পাঠানই চাই। আমারও চলে না—তাঁর ত প্রায় আহার নিদ্রা বন্ধ হইয়াছে। এই চিঠি পাইবা মাত্র একখানা টিকিট রিজার্ভ করিবার জন্য ‘বি.আই.এস্.এন্’কে ইন্টিমেশন দিয়ো। তাহারাই বলিয়া দিবে কোন্ জাহাজে বার্থপাওয়া যাইবে। তারপর যেদিন হোক্ টাকা লইয়া টিকিট লইয়া আসিযো। তাঁর ৪৫ + ভেলুর ৪ = ৪৯।
   
তোমার শরীর অসুস্থ, তোমাকে কোন উপরোধ করিতেই লজ্জা করিতেছে। কিন্তু আমার একটি বন্ধুর ৪/৫ মার্চ নাগাদ ফিরিবার কথা আছে। খুব সম্ভব তিনি ছেলেমেয়ে পরিবার লইয়া আসিবার পথে চোরবাগানের সন্ধান লইয়া আসিবে—সে হইলে অনেক আসান, না হইলে হয়ত তোমাকেই বড় কষ্ট পাইতে হইবে। জিনিসপত্র গুছাইয়া বাঁধিয়া জাহাজে তুলি়য়া দিতে হইবে। যে সব জিনিসের আবশ্যক নাই (কারণ আমি ১ বৎসরের মধ্যেই আবার ফিরিয়া যাইব) তাহা তোমার ওখানে থাকিলেই সুবিধা। তবে বইগুলো কোনমতে প্যাক করিয়া নষ্ট না হয় এরূপে আনা চাই। রঙের বাক্স, আরও একটা ছোট বইয়ের বাক্স আনিবার আবশ্যক নাই। বড় সিন্দুকটাও দরকার নাই। কি কি আনা চাই তা’ সেই ভাল জানে।
   
আর একটা কথা। ৪/৫ জোড়া গায়ে গাঁথা বঁড়শি`—বড় সাইজের ২/৩ জোড়া, মাঝারি সাইজের ২/৩ জোড়া এবং কিছু ছিপ-বাঁধা কড়া হাতে ভাঙ্গা মুগার সুতা ভাই, নিশ্চয় দিয়ো। ওঁর কাছে টাকা চাহিয়া লইয়ো। আর ঘড়িটা যদি চলে তবে, না হ’লে নয়। অচল ঘড়ি আমার বইয়ের আলমারিতেও একটা আছে। মাঝে মাঝে চলে, মাঝে মাঝে থামে। তাতে আবশ্যক নাই।
   
যা হোক ফার্স্ট অ্যাভেলেবল টিকিট রিজার্ভ করিবার চেষ্টা করিবে। আর এ বিষয়ে কিছু লিখিতে চাই না—তুমি আমার চেয়ে কম বোঝো না।
   
হরিদাস ভায়াকে বলিবে আমি একটা গল্প লিখিয়াও শেষ করিতে পারিতেছি না। এইবার শেষ করিয়া পাঠাইব। এ মাসে যাবে না বোধ করি, কারণ সময় নেই।
   
এরা না এলে লিখতেই পারি না। মেসে হয় না—সব লোকেই দেখতে চায়, উঁকি মারে—এই সব উৎপাত। আমি যে অবস্থায় অনেক লিখিয়াছলাম—ঠিক সেই অবস্থায় না পড়লে আর কিছুই হয়ে উঠছে না—দেখছি!
   
হরি ভায়ার পিতাঠাকুর মশায় আছেন কেমন? বোধ করি এ  যাত্রা রক্ষা পাইলেন।....
   
হরিদাসের কথা আমি প্রায়ই মনে করি। সত্যই ‘এ গুড্ ম্যান’ যথার্থ এই উপাধিটা আজকাল কেন, সব কালেই পাওয়া শক্ত। আমার মনের বিশ্বস্ ‘হি ডিজার্ভস রেসপেক্ট অ্যাণ্ড অ্যাফেকশন’—না? তোমার কথাই সত্য। 

শরৎ
   
ভাল কথা, আজকাল ভারতবর্ষ আগের চেয়ে ঢের ভাল হচ্ছে, না? আমার মতও এই, আজকাল অনেক বন্ধুবান্ধবেরও মত দেখছি এই। যারা মোটেই সুখ্যাতি করত না বরং নিন্দা করত, তারাও এখন বলে—মন্দ না—আমাদের দেশের তুলনায় এই এর চেয়ে আর ভাল হয় না। বুঝেছ? এইবার আর ভারতবর্ষের মার নাই—টিকিয়া গেল।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

হরিদাস চট্টোপাধ্যায়

৫৪, ৩৬ নং স্ট্রীট, রেঙ্গুন,
২২-৯-১৫

প্রিয়বরেষু,
   
‘পল্লী-সমাজে’র এইরূপ শেষ করিয়া পাঠাইলাম। সেদিন যেমন করিয়া সম্পূর্ণ করিয়া পাঠাইতে ছিলাম, সেটা ভাল বোধ না হওয়ায় ‘কনক্লুশান’টা অন্যরূপ হইল। ইতিমধ্যে আপনার চিঠি পাইলাম এ মাসে সমস্ত ছাপিবার, সেইজন্য ধীরে সুস্থে পাঠাইতেছি।
   
অবশ্য আমি নিজেই জানি ‘সরস’ বলিতে যা বুঝায়, এ গল্প ধার দিয়াও যায় না—নিতান্তই কটমটে পদার্থ খাড়া হইয়াছে—তা হোক্, দুই একটা ইন্টারেস্টিং গল্পও ভাল। প্রবন্ধও ত অনেকে পড়ে।
   
আপনার দেওয়া ৫০ টাকা পাইয়া সত্যই অতিশয় বিস্মিত হইলাম। যাই হোক বহু ধন্যবাদ।
   
সেই তিনটা গল্প এক করে একটা বই করার পারমিশান্ বহুকাল পূর্বেই দেওয়া আছে। আপনি ছাপিতে দেবেন। পল্লী-সমাজ বই করা যদি আবশ্যক মনে করেন, ভারতবর্ষে শেষ হইয়া গেলেই সেটা ছাপিতে দিতে পারেন। অর্থাৎ আমার পারমিশান রহিলই। যদি আপনি ভাল মনে করেন (বই প্রকাশ করিলে আপনার ক্ষতি না হয়), তাহা হইলে সেও আর একটা বই হইতে পারে।....
   
আমার ডান হাতটায় এত ব্যথা যে, লেখা ভারি শক্ত। কিছুতেই আরাম হইতেছে না, ডম্বল ভাঁজিতে গিয়া এ এক কাণ্ড ঘটিল।
   
প্রমথর ‘ট্যাঙ্ক অ্যাংলিং’ বেশ হইয়াছে। সে ভারি খুশী, বাস্তবিক হবার কথাই ত।
   
এবারের ভারতবর্ষ আজও পেলাম না। আপনাদের আফিস হইতেই ভুল হইল কিম্বা এখানেই চুরি গেল। আজ পোস্ট আফিসে একবার খোঁজ করিয়া দেখিব। কারণ ও আফিসের ভুল হওয়া সম্ভব নয়—এখানে চুরি যাওয়ই সম্ভব।
   
অপরাপর সম্বাদ অমনি এক রকম। আপনাদের কুশল মাঝে মাঝে লিখিবেন।

আপনাদের শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

হরিদাস চট্টোপাধ্যায়

৫৪, ৩৬ নং স্ট্রীট,
৫-১০-১৫

প্রিয়বরেষু,
   
আপনার পত্র পাইলাম। এই গল্পটা বেশ হওয়ার কোন আশা আমার ছিল না। কারণ প্রথম হইতেই ঠিক করিয়া বসিয়াছিলাম এ সকল বস্তু প্রবন্ধ হইলেও হইতে পারিত। আসলে এ ধরণের লেখাকে ঠিক গল্প বলাও সকলের মত না হইতে পারে। যাক, যদি দু’একজনের ভাল বোধ হয়, সেও আমি আহ্লাদের কথা মনে করিব। আপনি যেমন ইচ্ছা তেমন করিয়া ছাপিবেন। আপনার নিজের জিনিস হইলে যা করিতেন ঠিক তাই। এতে ভাল না হয় সেও আমার কপাল, ভাল হয় সেও আমার কপাল।....
   
হাতটা কিছুতেই ভাল হইতেছে না। মধ্যে ডান পা’টাও আগাগোড়া ফুলিয়া ফাঁপিয়া জয়ঢাক হইয়া উঠিয়াছিল, সেটা এখন কমিয়াছে এই যা। প্রতি মাসেই কিছু না কিছু একটা ছোট হোক্ বড় হোক্ প্রবন্ধ হোক্ ছাপিবার চেষ্টা করিব। অর্থাৎ বিশেষ চেষ্টাই করিব। যদি না পারি, সেটা আমার অনিচ্ছার জন্য নয়, অক্ষমতার জন্যই হইবে না।
   
অন্যন্য বিষয়ে ভাল আছি।

আপনাদের  শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
   
‘ভারতবর্ষ’ পেলাম। প্রথমটা কে যে চুরি করিল তা বলিতে পারি না।
   
আফিং ছাড়িবার চেষ্টা করিয়াই এত দুঃখ বোধকরি পাইলাম। আর ছাড়িবার নামটিও কখনো মুখে আনিব না, বেশ করিয়া পুনরায় ধরিয়া তবে পা ভাল হইল। এইবার আর একটু ভাল করিয়া ধরিলে, হাতটাও ভাল হইবে আশা হয়। আফিং কম করিয়া মাথটা একেবারে খালি, হইবার মত হইয়াছিল। আবার ধীরে ধীরে বেশ ভরিয়া আসিতেছে। কি জিনিস! আপনাদেরও ধরা বোধ করি ভাল। আমি ত মনে করি সমস্ত ভদ্রলোকেরই এ সেবন করা কর্তব্য।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

জ্যোতির্ময়ী গঙ্গোপাধ্যায়

বাজে শিবপুর, হাবড়া
১১ই অক্টোবর, ১৩২২

সবিনয় নিবেদন,
   
দিন দুই হইল আপনার পত্র পাইয়াছি; কিন্তু অভ্যাসের দোষে যথাসময়ে জবাব দিয়া উঠিতে পারি নাই। এ কথা এতই সকলে জানে যে আমার ত্রুটি স্বীকার করাও বাহুল্য হইয়া গিয়াছে।
   
আমাকে লিখিতে বলিয়াছেন, কিন্তু আমি ত আর লিখি না। এই পেশা বটে, কিন্তু মনে হয় এ কুকার্য আমার শেষ হইয়াছে, আর ভবিষ্যতে দুঃখ পাইতে হইবে না।
   
বিশেষতঃ কিছুকাল হইতে পীড়িত হইয়া পড়িয়াছি; বোধ হয় নার্ভাস এর বেশি অরগানিক কিছু একটা নয়। তবু নিঃশ্বস টানিবার কষ্ট যখন আরম্ভ হয়, তখন ওই মনে করিয়া সান্তনা যে পাই না, সে সত্য।
   
অনেক কাগজ ত বাহির হইয়াছে, আবার কাগজ কেন? যদি বাহিরই করিলেন নূতন লেখক তৈরী করিয়া তুলুন না। আমাদের ত মরিবার সময় আসিল এখন আমাদের পেনসন্ পাওয়াই উচিত।

আপনাদের শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

হরিদাস চট্টোপাধ্যায়

৫৪, ৩৬ নং স্ট্রীট, রেঙ্গুন,
১৫-১১-১৫

প্রিয়বরেষু,
   
আপনার পত্র যথাসময়ে পাইয়াছিলাম। জ্বর হইয়াছিল বলিয়া জবাব দিই নাই। এখন ভাল হইয়াছি। আমার বিজয়ার আন্তরিক শুভাকাঙ্ক্ষা জানিবেন।
   
‘শ্রীকান্তের ভ্রমণ কাহিনী’ যে সত্যই ভারতবর্ষে ছাপিবার যোগ্য, আমি তাহা মনে করি নাই—এখনও করি না। তবে যদি কোথাও কেহ ছাপে, এই মনে করিয়াছিলাম। বিশেষ তাহাতে গোড়াতেই যে সকল শ্লেষ ছিল সে সকল যে, কোন মতেই আপনার কাগজে স্থান পাইতে পারে না, সে ত জানা কথা। তবে, অপর কোন কাগজের হয়ত সে আপত্তি না থাকিতে পারে, এই ভরসা করিয়াছিলাম। সেই জন্যই আপনার মারফতে পাঠানো।
   
যদি বলেন ত আরও লিখি—আরও অনেক কথা বলিবার রহিয়াছে। তবে ব্যক্তিগত শ্লেষ বিদ্রূপ ঐ পর্যন্তই। তবে শেষ পর্যন্ত সব কথাই সত্য বলা হইবে।
   
আমার নামটা যেন কোনমতেই প্রকাশ না পায়। এমন কি আপনি ছাড়া উপেনবাবু ছাড়া (তাঁর ত মুখ দিয়া কথা বাহির হয় না—তা ভালই হোক মন্দই হোক) আর কেহ না জানে ত বেশ হয়। ও কি ?  অবশ্য শ্রীকান্তর আত্মকাহিনীর সঙ্গে কতকটা সম্বন্ধ ত থাকিবেই, তাছাড়া ও ভ্রমণই বটে। তবে ‘আমি’ ‘আমি’ নেই। অমুকের সঙ্গে শেকহ্যান্ড করিয়াছি, অমুকের গা ঘেঁসিয়া বসিয়াছ—এসব নেই।
   
বাস্তবিক ‘তিনমাস’ যে ত্রিশ বছরের ধাক্কা লইবার উপক্রম করিল। অথচ কি নীরস! কি কটু! আপনি দুঃখিত হবেন না—এইটা শুধু আমার নয়, অনেকেরই মত। মহারাজের ওটায় ত এর শতভাগের এক ভাগও আত্মম্ভরিতা নেই। তাতে ‘আমি’ও যেমন আছে, ‘তুমি’ও তেমনি আছে—‘ওরা’ ‘তারা’ও বাদ যায় নাই। রবিবাবু নিজের আত্মকাহিনী লিখিয়াছেন, কিন্তু নিজেকে কেমন করিয়াই না সকলের পিছনে ফেলিবার সফল চেষ্টা করিয়াছেন। যাহারা লিখিতে জানে না, অর্থাৎ যাহাদের লেখার পরখ হয় নাই, তা তাহারা যত বড় লোকই হোক, না জানিয়া তাহাদের দীর্ঘ লেখা ছাপিবার অনেক দুঃখ। ইহারা মনে করে সব কথাই বুঝি বলা চাই-ই। যা দেখে, যা শোনে, যা হয়, মনে করে সমস্তই লোককে দেখানো শোনানো দরকার। যারা ছবি আঁকিতে জানে না, তারা যেমন তুলি হাতে করিয়া মনে করে, যা চোখের সামনে দেখি সবই আঁকিয়া ফেলি। কিন্তু দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সে-ই শেষে টের পায়, না তা নয়। অনেক বড় জিনিস বাদ দিতে হয়, অনেক বলিবার লোভ সম্বরণ করিতে হয়—তবে ছবি হয়। বলা বা আঁকার চেয়ে, না বলা না আঁকা ঢ়ের শক্ত। অনেক আত্মসংযম, অনেক লোভ দমন করিতে হয়, তবেই সত্যিকারের বলা এবং আঁকা হয়।
   
বাঃ, এ যে আপনাকেই লেকচার দিচ্ছি! মাপ করবেন—এসব আমার চেয়ে আপনি নিজেই ঢ়ের বেশি জানেন—সে আমি খুব জানি। যাই হোক, শ্রীকান্ত পড়ে লোকে কি রকম ছি ছি করে, দয়া ক’রে আমাকে জানাবেন। ততদিন শ্রীকান্ত একটি ছত্রও আর লিখব না।
   
আমি আবার একটা গল্প লিখচি। অর্থাৎ শেষ করব ব’লে লিখচি। ভালই হবে। কমেডি হবে ট্রাজেডি নয়। কত শীঘ্র শেষ হয়।
   
এ গল্পটা গোরার পরেশবাবুর ভাব নেওয়া। অর্থাৎ নিজেদের বলতে অনুকরণ। তবে ধরবার জো নেই। সামাজিক পারিবারিক গল্প। আমার ত মনে বড় উৎসাহ হয়েচে যে চমৎকার হবে। তবে কি থেকে যে কি হয়ে যাবে বলবার যো নেই।
   
প্রমথ চলে গেছে কি ?  আমি অনেকদিন তার চিঠি পাই নি। সে যে ভাল হচ্চে, এই আমাদের ভাগ্য। বাস্তবিক, সত্য কথা বলতে অমন বন্ধু আর হয় না। বন্ধু বলতে ত এই! ও যদি না বাঁচে, আমার ত মনে হয়, আমার ‘বন্ধু’র দিকটা যথার্থই খালি পড়ে যাবে।
   
আপনার পিতাঠাকুরের খবর কি ?  কেমন আছেন আজকাল ?  আচ্ছা ‘যমুনা’ আজকাল কি চলে ?  ফণী নাকি বই ছাপিয়েচে ?  সে বলত, আপনার এক একটা গল্প আমি ৩০/৪০ বার পড়ে মুখস্থ করে ফেলি। আপনার লেখাই আমার আদর্শ। অথচ এমনি গুরুভক্তি যে, একখানা বইও পাঠালে না। আমি তার সব লেখাই পড়েচি এবং সে সব লেখা যে কি, সে ত আমার চেয়ে আর কেউ বেশি জানে না। অবশ্য নানা কারণে আমিও তার সঙ্গে আর কোন সম্বন্ধ রাখি নাই। যাক, পরচর্চায় কাজ নেই।
   
গত মাসের ভারতবর্ষ তেমন ভাল হয় নাই। সমস্তই মেয়েদের লেখা—নতুন কাণ্ড বটে, কিন্তু ‘ওয়ার্থ’ হিসাবে অন্যান্য বারের চেয়ে নীচে। সে ত হবারই কথা। কিন্তু একটা কায হয়েচে—ফাইল অনেকটা ‘ক্লিয়ার’ হয়েচে, না ?
   
আপনি আমাকে ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ পড়িতে দিয়াছিলেন—সেগুলি আমি ফিরাইয়া দিই নাই—আসিবার সময় মনেই হয় নাই—তারপরে সেগুলি এখানে চলিয়া আসিয়াছে। পুলিশে ঘাঁটাঘাঁটি করিয়া তাহাদের (আমার সব বইগুলিরই) এমন অবস্থা করিয়া দিয়াছে যে, বিক্রী হওয়া শক্ত। মলাটে কিসের দাগ লাগিয়েছে—এগুলির অনেক দাম এবং পরের বই—আমি অতিশয় লজ্জিত হইয়া আছি, কিন্তু কোন করম উপায়ও দেখি না। এ ছাড়া আরও অনেকগুলি বৈষ্ণবগ্রন্থ পড়িতে দিয়াছিলেন। সমস্ত বইগুলি যে কতবার পড়িয়াছি (এমন কি রোজই প্রায় পড়ি), তা বলিতে পারি না। এগুলিও ফিরাইয়া দিবার কথা ছিল। আপনাকে অনেক রকমেই ত ক্ষতিগ্রস্ত করিয়াছি, তাই হঠাৎ এগুলির দাম বলিয়া দিতেও ইচ্ছা হয় না। বইগুলি বরং আমাকে দান করুন। আমি অনেক আর্শীবাদ করিব এবং ভবিষ্যতেও প্রত্যহ এই কথা মনে মনে আলোচনা করিয়া লজ্জা পাইব না।
   
উপেনবাবু, জলধরদাকে আমার কথা স্মরণ করাইয়া দিবেন। বহুকাল পূর্বে জলধরদার একখানি চিঠি পাইয়াছিলাম, কিন্তু তাহার জবাব দিয়াছিলাম কিনা মনে হয় না। যাই হোক্, সেজন্য তিনি পথ চাহিয়াও নাই, তাও জানি। আপনাদেরই

শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

হরিদাস চট্টোপাধ্যায়

৫৪, ৩৬ নং স্ট্রীট, রেঙ্গুন,
৭-১২-১৫

প্রিয়বরেষু,
   
আপনার পত্র যথাসময়ে পাইয়াছি। বৈষ্ণব বইগুলি সম্বন্ধে আপনি যাহা লিখিয়াছেন, সে আপনার উদারতা। আমি ত সম্মত হইবই।
   
নূতন গল্পটা আশা করি ঠিক সময়েই পাঠাইতে পারিব। তা যদি না পারি, একটা ছোট গল্প পাঠাইয়া দিব। কারণ, অসম্পূর্ণ গল্প আপনাকে আমিও পাঠাইতে চাহি না এবং তাহা সম্পূর্ণ হইবার ভরসায় ছাপাইতে বলিতেও আমি পারি না। তবে চন্দ্রকান্তের কাহিনী স্বতন্ত্র। এ সম্বন্ধে একটা কথা যদি নির্ভয় দেন ত বলি। এই কাহিনীকে সম্পাদক মহাশয়রা দয়া করিয়া নেহাত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করেন। আমার বড় আশা আছে—ইহা অন্ততঃ যে সকল লেখা ছাপা হয় এবং হইয়াছেও তাহাদের নিতান্ত নীচের আসনের যোগ্যও নয়। অনেক সামাজিক ইতিহাস ইহার ভবিষ্যৎ জঠরে প্রচ্ছন্ন আছে। আমার অনেক চেষ্টা ও যত্নের জিনিস, অন্ততঃ বন্ধুবান্ধবদের কাছেও একটু খাতির পাইবার মত হইবেই। প্রথমটা অবশ্য খুবই খারাপ—তা অনেক সত্যকার ভাল জিনিসেরও প্রথমটা মন্দ-এমন দেখাও যায় ত। এই আমার কৈফিয়ৎ। এবার ছাপা হবে কি ?  হাতের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখার আশাতেই ওটা দেওয়া সে ত ভূমিকাতেই লেখা আছে।
   
শ্রীযুত যোগীন্দ্রনাথ সরকার স্বাক্ষরিত একটা ভ্রমণ ‘সমুদ্রবক্ষে’ নাকি অনেক দিন হইতে আপনাদের ফাইলএ পড়ে আছে। আমারও যেন স্মরণ হয় সেটা দেখেচি। তিনি ক্রমাগতই আমার কাছে সেটা চাইচেন। তিনি বলেন, আপনাকে চিঠি লিখিয়া কোন জবাব পান নাই।
   
সেটা যদি একটু খোঁজ করিয়ে পাঠিয়ে দেন ত ভাল হয়। তাঁর বিশ্বাস সেটা খুব ভাল (অবশ্য আমি পড়িনি), তাই সেটা ফিরিয়ে নিয়ে আর কোন কাগজে পাঠালে হয়ত ছাপা হতেও পারে। এই জন্যই নাকি তাঁর লেখাটিতে এত প্রয়োজন।
   
আর একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে চাই। একটু চিন্তা করে যদি এই প্রশ্নটির জবাব দেন বড় উপকার করা হয়। এবার যখন পত্র লিখিবেন তখন এই কথাটির অতি অবশ্য জবাব দিবেন, অনুরোধ করিতেছি। আমার বই যে কিরূপ বাজারে চলে এবং বিক্রী হয় আজও পর্যন্ত আমি তার কিছুই জানি না। আচ্ছা জিজ্ঞাসা করি, আমার ৬ খানা বই (নভেল) ধরুন গড়ে দাম ১।০, যদি ছাপা হয়ে বিক্রী হবার জন্য প্রস্তুত থাকে তাহাতে অন্য সব খরচ বাদে আমাকে দোকানদার যদি ২০টাকা মাসে দেন—সেটা কি তাঁর খুব দুঃসাহস ?  এতে ভবিষ্যতে তাঁর কি খুব লোকসান হবার সম্ভাবনা ?
   
অপরাপর কথা পরে লিখিব। ‘মেল’ এর আর দেরি নাই।

আপনার  শরৎ

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

হরিদাস চট্টোপাধ্যায়

৫৪, ৩৬ নং স্ট্রীট, রেঙ্গুন
২৫-১২-১৫

করকমলেষু,

এবারকার ভারতবর্ষ চমৎকার হইয়াছে। আমি নিজে ত পড়িবার জিনিস অনেক পাইলাম। আচ্ছা, একটা কথা—‘জড় জগৎ’ সম্বন্ধে যদি কেউ কিছু প্রতিবাদ করে, ধরুন আমার দিদিকে দিয়া যদি কিছু লিখাইয়া লই, আপনারা সে প্রতিবাদ কি ছাপিবেন ?  অবশ্য আপনারা নিশ্চয়ই তাহার সঙ্গতি অসঙ্গতি বিবেচনা করার পর। সিম্বল অর্থাৎ কল্পনা প্রতিমা খাড়া করিয়াই কাজ চলিতেছে (একটা উদাহরণের মত উল্লেখ করিলাম) জার্মানির সকল পণ্ডিতই ত তা মানে নাই। তাদের মতামতেরও ত একটু মূল্য আছে। তাছাড়া হেলম হোজ কি শুধু স্ট্যান্ডার্ড সম্বন্ধে ঐ বলিয়াই শেষ করিয়াছেন ?  তখন সবাই মানিয়া লইয়াছিল কি ?  আপনিই বলুন না ?  আর এটা ত শুধু পদার্থ বিদ্যার—ফিলসফি অব্ সায়েন্স।
   
পল্লী কাহিনী না সমাজ ?  কি এটা। এবার ছাপার বোধ করি বেশি ভুল আছে। শেষটা পাঠাচ্ছি। গত মাসে তেমন ভুল ছিল না। এক জায়গায় মনে আছে ‘আরক্ত’ না হয়ে রক্তাক্ত ছাপা আছে।
   
বড় তাড়াতাড়ি, মেল ক্লোজ হয় হয়।

শরৎ

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

সুধীরচন্দ্র সরকার

ডিসেম্বর ১৯১৫

প্রিয় সুধীর,
   
কাল রাত্রে তোমার পত্র পাইলাম। বিলম্ব যে হইতেছে এবং তাহাতে যে ক্ষতি হইতেছে সে কি জানি না ?  তবে, প্রায় অধিকাংশই নূতন করিয়া লিখিতে হইতেছে। যদি দু-এক মাস দেরি হয় বরং সে ভাল, কিন্তু পাছে এমন করিয়া সুরু করিয়া খারাপ হইয়া শেষ হয়, সেই আমার বড় ভয়।
   
তবে, আর ছাপা বন্ধ হইবে না, পরের মেলেই এতটা যাবে। হয়ত বেশি হইবে। অর একটা কথা, রিরাইট করার জন্য অনেক সময় ভয় হয়, পাছে যাহা একবার পূর্বে বলিয়াছি, হয়ত আবার তাহা বলিতে পারি। যতটা ছাপা হইয়াছে, তাহার অনেক কপি আমি পাই নি। যদি রেজিস্ট্রি করিয়া সমস্ত ছাপা পাঠাও বোধ করি সিকি পরিশ্রম আমার কমিয়া যায়। অতি অবশ্য সবটুকু গোড়া হইতে পাঠাইয়া দিবে। তাড়াতাড়ি করিয়া ত সবটুকু ১৫ দিনে হয়; কিন্তু সে কি ভাল ?  তবে আর যত বিলম্বই হোক মাঘ মাসের শেষে বেশি ছাপা শেষ হয়ে যেতে পারবেই। আমার হাতের অবস্থা ঠিক তেমনি, বোধ করি আর ভালই হবে না। ইচ্ছা আছে, ফাল্গুন মাসে কলিকাতায় যাব। আমার স্নেহাশীর্বাদ জানিবে। ইতি—

আঃ শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
   
সুধীরচন্দ্র সরকারের জন্ম ১৮৯২ সালে মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে। পিতার নাম রায় বাহাদুর মহিমচন্দ্র সরকার। শৈশব ও কৈশোর জীবন অতিবাহিত হয় বিভিন্ন জায়গায়। পিতা ছিলেন বিচার বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারী। ১৯০৭ সালে এন্ট্রান্স, পরে বি.এ. এবং আইন পাশ করে পিতার প্রতিষ্ঠাতা আইন পুস্তক প্রকাশনা সংস্থা ‘রায় এম. সি. সরকার বাহাদুর এন্ড সন্সে’ যোগ দেন। নিজে সাহিত্য ভালবাসতেন। তাঁর নিজের বহু লেখাও ‘ভারতী’, ‘যমুনা’, ‘জাহ্নবী’, ‘ভারতবর্ষ’ প্রভৃতি বিখ্যাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর সঙ্গে তৎকালীন যুগের বহু খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের যোগাযোগ ছিল। ফলে আইন বই-এর ব্যবসায় না গিয়ে তিনি সাহিত্যের বই ছাপাতে মনোযোগী হলেন। তাঁর প্রকাশনা সংস্থা থেকেই ‘নাচঘর’ পত্রিকা প্রকাশ পায়। শিশুদের মাসিক পত্রিকা ‘মৌচাক’ও তিনি বার করেছিলেন। ‘হিন্দুস্থান ইয়ার বুক’ সঙ্কলন ও প্রকাশ তাঁরই কর্মতৎপরতায় প্রকাশ পায়। তিনি শরৎচন্দ্রের পণ্ডিতমশাই (১৯১৪), পরিণীতা (১৯১৪), চন্দ্রনাথ (১৯১৬), নিষ্কৃতি ১৯১৭), চরিত্রহীন (১৯১৭), নারীর মূল্য (১৯২৪) প্রকাশ করেন।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

এ চিঠি কাকে উদ্দেশ্য করে লেখা জানা যায় নি

৫৪. ৩৬ নং স্ট্রীট, রেঙ্গুন,
১-২-১৬

সবিনয় নিবেদন,
   
পরিচয়ের সৌভাগ্য না থাকা সত্ত্বেও মহাশয়ের আশীর্বাদ ও প্রশংসা লাভ করিয়া আমি নিজেকে বারম্বার ধন্য জ্ঞান করিতেছি। আপনি নিজেকে বৃদ্ধ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। আমিও ত প্রায় তাহাই। আমারও বয়স (৩৯) ঊনচল্লিশ হইয়াছে। তথাপি যদি বয়সে কিছু ছোট হই ত আমার প্রণাম গ্রহণ করিবেন।
   
পত্রে আপনি নিজের যৎকিঞ্চিৎ পরিচয় দিয়াছেন। তাহাতেই বুঝিতে পারা যায় পৃথিবীর যাবতীয় সভ্যতার কেন্দ্রগুলি স্বচক্ষে দেখিয়া আসিয়াছেন বলিয়াই আপনার জন্মভূমির প্রতি মমতা ত যায়ই নাই, বরং বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়াছে। কিম্বা এ কথাও হয়ত ঠিক নয়, কারণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উপরেই যে জন্মভূমি পল্লীজননীর প্রতি স্নেহ জন্মে তাহাও নয়।
   
আমি কলিকাতা-প্রবাসী অনেক বড়লোকের জন্মস্থানগুলি চোখে দেখিয়া আসিয়াছি—কিন্তু তাহাদের দুর্দশার সীমা পরিসীমা নাই। তাঁহাদের যাহা সাধ্য তাহার শতাংশের একাংশও যদি সেদিকে দান করেন, বোধ করি দুঃখী গ্রামগুলির সৌভাগ্যের আর অন্ত থাকে না।
   
আমার নিজের ত সময় এবং সাধ্য দুইই এত সামান্য যে তাহা সম্পূর্ণরূপে গণনার বাহিরে ফেলিয়া দিলেও কাহাকেও দোষ দেওয়া চলে না। তথাপি আমি শুধু এই চেষ্টাই করি যদি একটা লোকেরও তাহার পল্লীর উপর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। সেই জন্যই অত্যন্ত অপ্রিয় এবং ক্লেশকর হইলেও পল্লী সম্বন্ধে সত্য কথাগুলিই বলিবার চেষ্টা করি। সহরের লোকেরা কল্পনা করিয়া পল্লী-গ্রামের যে সকল সুখ্যাতি প্রচার করেন, অনেক সময়েই যে তাহার যথার্থ নয়, বরং পল্লীগ্রাম ক্রমশঃ অধঃপথেই যাইতেছে, এই সত্য কথা এই পল্লী-সমাজ বইটাতে বলিবার চেষ্টা করিয়া ছিলাম। কিন্তু চেষ্টা করায় এবং সফলতায় যাহা প্রভেদ, আমার লেখাতেও বোধ করি ততটুকুই মাত্র হইয়াছে।
   
আপনি একে নাটক আকারে প্রকাশ করিবার উপদেশ দিয়াছেন। হয়ত করিলে ভালই হয়, কিন্তু আমার নিজের ত সে ক্ষমতা নাই। অন্ততঃ আছে কিনা তাহা পরীক্ষা করিয়া ত কখনো দেখি নাই। যদি আর কেহ কষ্ট করিয়া করেন (যাঁহার ক্ষমতা আছে) বোধ করি ভাল হইলেও হইতে পারে। কিন্তু আমার দ্বারা হয়ত শুধু পণ্ডশ্রম মাত্র হইবে। এবং কোন থিয়েটারই তাদের সময় এবং সামর্থ্যের অপব্যয় করিয়া তাহাকে স্টেজ করিতে চাহিবে না। তবে আপনার উপদেশটিও মনে রাখিয়া ভবিষ্যতে যদি কিছু করিতে পারি চেষ্টা করিব। পূর্বে গ্রাম সম্পর্কীয় আমার ‘পণ্ডিত-মশাই’ বইটাকেও কেহ কেহ নাটক করিবার কথা তুলিয়াছিলেন, কিন্তু হয় নাই। সেটাও বোধ করি আরও ভাল হইলেও হইতে পারিত। যাই হোক্, আপনার এই উপদেশটিকে আমি বিস্মৃত হইব না এবং সেজন্য আপনাকে প্রণাম করিতেছি।

নিঃ শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

সুধীরচন্দ্র সরকার

৫৪, ৩৬ নং স্ট্রীট, রেঙ্গুন।
১৫-২-১৬


পরম কল্যাণবরেষু,
   
সুধীর, আমার বড় অসুখ। ডান পা’ হাঁটুর নীচে থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ফুলে উঠেছে। কি ব্যায়রাম জানা যায় না। কি হবে তাও ডাক্তার বলতে পারে না। হয়ত অতি সত্বর কলিকাতাতেই চিকিৎসার জন্য যেতে হবে। শুধু উঠতে হাঁটতে পারি না। এ ছাড়া আর কোন রোগের যন্ত্রণাও নেই। কিন্তু ভয়ে মন আমার কণ্টকিত হয়ে উঠছে। কেবলই ভাবি যদি না সারে। এমনি পঙ্গু হয়েই চিরদিন যদি কাটাতে হয়, এই বেলা চরিত্রহীনের ম্যানাস্ক্রিপটা লিখিয়ে নিতেই হবে। ভবিষ্যতে কি হবে কে জানে। তবে আজকাল নিজেই বেশ লিখচি—কারণ আর সব কাজই বেশ করতে পারি।
   
পরের মেলে ম্যানাস্ক্রিপটা পাঠাব। চন্দ্রনাথ কি ছাপা হয়ে গেছে ?  ৮০০ কপি বেশি ছাপানো মন্দ কি ?  বেশ তাই কোরো।

আঃ  শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

হরিদাস চট্টোপাধ্যায়

৫৪, ৩৬ নং স্ট্রীট, রেঙ্গুন
২২-২-১৬

করকমলেষু,
   
অনেক দিন আপনার পত্র পাই নাই। আশা করি, সমস্ত ভাল। ভায়া, আমি এবার বড়ই পড়িয়াছি। সুদূর হইতে প্রমথভায়ার বাতাস লাগিল, না কি হইল বুঝিতে পারিতেছি না। এ আবার আরও খারাপ। এ শুনি বর্মা দেশের ব্যারাম—দেশ না ছাড়িলে কোন দিন এও ছাড়ে না। তাই দুয়ের এক, বোধকরি, অনিবার্য হইয়া উঠিতেছে। কি জানি, ভগবানই জানেন। ভয় হয়, হয়ত বা চির জীবন পঙ্গু হইয়াই বা যাইব। এই সম্ভাবনা মনে করিতেও যেন পারি না। যাহাকে যথার্থই বলে, ভয়ে ‘পেটের ভাত চাল’ হইয়া যাওয়া, আমার তাই হইয়াছে। সুতরাং ডিসপেপসিয়াও ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতেছে। হইবার কথাও বটে। কারণ, খাও দাও, স্নান কর, লেখাপড়া কর, কিন্তু চলিয়া বেড়াইবার বিশেষ ক্ষমতা না থাকিলে হজম হওয়াও বন্ধ হইয়া আসে। ডান পায়ের হাঁটুর নীচে হইতে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত সে এক প্রকাণ্ড কাণ্ড! অথচ গোদ নয়—কি যে ডাক্তারেরা তাহাও বলিতে পারেন না—কতদিনে সারিবে কিম্বা কোন দিন সারিবে কিনা এ খবরও তাঁরা দিতে পারেন না। দুদিন বা কিছু কমে দুদিন বা ঠিক তেমনি হইয়া দাঁড়ায়। গতবারে যখন লিখি, তখন এইরূপ কমিবার মুখে আসিতেছিল বলিয়া খুব একটা আশা হইয়াছিল, কিন্তু তার পরেই আবার যখন ধীরে ধীরে তেমনি হইয়া উঠিতে লাগিল, তখন আশা ভরসা সব গেল। এই মানসিক চঞ্চলতা বশতঃ কিছুই কাজ করিতে ইচ্ছা হয় নাই। এই কথাটি জলধরদাকে জানাইয়া এই ‘সমাজ-ধর্মের মূল্য’ পড়িতে দিবেন। ইহার ফেয়ার কপি করা এইটুকু মাত্র পারিয়াছিলাম—বাকি লেখাটা ফেয়ার করিয়া পরে পাঠাইতেছি। তারপর যাহা লিখিব মনে করিয়াছি তাহা শুদ্ধ মাত্র অপরাপর দেশের সামাজিক নিয়ম কানুনের সহিত আমাদের দেশের সমাজের একটা তুলনামূলক সমালোচনা ছাড়া আর কিছু না, সুতরাং সেদিকে কোনরূপ ব্যক্তিগত সমালোচনার ভয় নাই। জানি না এ প্রবন্ধ ভারতবর্ষে ছাপাইবার তাঁহার প্রবৃত্তি হইবে কি না, কিন্তু যদি না হয়, এ আপনি ফেরৎ পাঠাবেন, আমি ধীরে ধীরে সমস্তটা লিখিয়া একটা পুস্তকের মত করিয়া রাখিব এবং ভবিষ্যতে ইহার ব্যক্তিগত অংশগুলি বাদ দিয়া ছাপাইবার চেষ্টা করিব। বাস্তবিক ভায়া এই সোসিওলজি লইয়াই বহুদিন কটাইয়াছি—অনেক কথা বলিবার জন্য প্রাণটা যেন আনচান্ করে। অথচ, কি করিয়া যে এ সকল বেশ ভদ্র লোকের মত বলা যায়, তাহাও ঠিক করিতে পারি না।
   
আপনি যদি এইটুকুর শেষ দিকটা একবার পড়িয়া দেখিতে পারেন আর সাজেষ্ট করিয়া দিতে পারেন, যে কি করিয়া কোন অংশ পরিবর্তন করিলে কাহারও গায়ে লাগিবে না, অথচ সব কথাগুলি বলাও যাইতে পারিবে, আমি সেইরূপ করিবার একটা চেষ্টা করিব। তবে আরও যেটুকু লেখা আছে, সেটুকু পাঠাইবার পরেই মতামত দিবেন। জলধরদাকে অনেক  আশা দিয়াছিলাম কিন্তু গল্প লেখা মানসিক সুস্থিরতার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে। যদি অদৃষ্ট আমার চিরকালের মতন ভাঙিয়াও থাকে তাহাও যদি ঠিক জানিতে পারি, তাহা হইলেও ধীরে ধীরে এই মহা দুঃখ বোধকরি সহিয়া যাইবে। হয়ত বা তখন এই পঙ্গু হওয়াকেই ভগবানের আশীর্বাদ বলিয়া মনেও করিব এবং স্থিরচিত্তে গ্রহণ করিতেও পারিব। আমার এই কাঠির মত শরীরে এইরূপ একটা ব্যামো যে কখনও সম্ভব হইতে পারিবে, তাহাও মনে করি নাই। আর তাই যদি হয়—হয়ত বা শেষে ইহারই আমার আবশ্যকতা ছিল! ছেলেবেলায় ভগবানকে বড় ভালবাসিতাম—মাঝে বোধকরি সম্পূর্ণ হারাইয়া ছিলাম, আবার শেষ বয়সে যদি তিনিই দেখা দিতে আসেন—তাই ভাল।
   
মনে অস্থিরতায় অনেক বাজে কথা লিখিয়া ফেলিলাম! মাপ করিয়া চিঠিখানি পড়িবেন এই ভরসা।
   
আর একবার প্রমথ ভায়ার খবরটা মনে করিয়া আমাকে জানাইবেন।
   
আপনাকে আন্তরিক শত সহস্র আশীর্বাদ করিলাম।

শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
   
জলধরদাকে বলিবেন—যাহা আরম্ভ করিয়াছি অর্থাৎ ‘শ্রীকান্ত’ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হঠাৎ বন্ধ কিছুতেই হইবে না।

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

সুবোধ রায়

৫৪, ৩৬ নং ষ্ট্রী, রেঙ্গুন,
১০-৩-১৬

পরম কল্যাণবরেষু,
   
আমি বৃদ্ধ বলিয়া আপনাকে আশীর্বাদ করিতেছি, আমার সহিত পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও আমাকে পত্র লিখিয়াছেন, ইহাকে পরম সৌভাগ্য জ্ঞান না করিয়া ধৃষ্টতা মনে করিব, এত বড় উঁচু মন আমার নাই।
   
তবে, আপনার চিঠির জবাব দিতে বিলম্ব হইয়াছে। তাহার প্রথম কারণ, আজকাল ১০/১২ দিনের মধ্যে মেল থাকে না। দ্বিতীয় কারণ, আমি বড় পীড়িত।
   
অবশ্য আমার এ বয়সে আর অসুখ-বিসুখের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা শোভা পায় না, তবুও প্রাণের মায়া ত কাটিতে চায় না—তাই মাঝে মাঝে মনে হয় আর কিছু দিন অপেক্ষা করিয়া চল্লিশের ও-পারে গিয়া এ-সব ঘটিলেই সব দিকেই দেখিতে ভাল হইত। নিজের মনটাও আর খুঁত খুঁত করিতে পারিত না। কিন্তু সে কথা থাক্।
   
পল্লী-সমাজ আপনার মন্দ লাগে নাই, বরং ভালই লাগিয়াছে শুনিয়া আনন্দিত হইয়াছি। বাল্য এবং যৌবন কালটার অনেকখানি পাড়াগাঁয়েই আমার কাটিয়াছে। গ্রামকেই বড় ভালবাসি। তাই দূরে বসিয়াও যে দুই চারি কথা মনে পড়িয়াছে তাহা লিখিয়াছি—স্মরণশক্তিও আর বুড়া বয়সে নাই—তবুও যে কতক কতক মিলিয়াছে, এ আমার বাহাদুরি বই কি। তবে কিনা পাড়াগাঁয়ের লোকে যদি নিজের মনের সহিত মিলাইয়া লইয়া সত্য কথাগুলাই বলিবার চেষ্টা করে, তাহা হইলে কথাগুলা চলনসই প্রায়ই হয়। অন্ততঃ ভুলচুক তত হয় না, যত কলিকাতা বা সহরের বড়লোকে কল্পনা করিয়া বলিতে গেলে হয়।
   
তার পরে প্রতিকারের উপায়। উপায় কি, সে পরামর্শ দিবার সাধ্য কি আমার আছে ?  সে অনেক শক্তি, অনেক অভিজ্ঞতার কাজ। আমার মুখ দিয়া  সে-কথা বাহির করা কতকটা ধৃষ্টতা নয় কি ?  তবুও মনের ঝোঁকে। মাঝে মাঝে বলিয়াও ফেলিয়াছি ত! যেমন, প্রতিকার আছে শুধু জ্ঞান বিস্তারে। আর যারা প্রতিকার করিতে চায়, তাহাদের মানুষ হইতে হইবে গ্রাম ছাড়িয়া দূরে গিয়া—বিদেশে বাহির হইয়া। কিন্তু কাজ করিতে হইবে গ্রামে বসিয়া এবং গ্রামের ভাল মন্দ সকল প্রকার লোকের সহিত ভাল করিয়া মিল করিয়া লইয়া—তবে। এইটা বড় দরকারী জিনিস। এই ধরণের দু’ চারটা কথা।
   
বিশ্বেশ্বরীর কথাগুলো হয়ত আপনার তেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে নাই!—যদি আপনার ধৈর্য রাখা সম্ভবপর হয়, আর একবার তাঁর কথাগুলোয় চোখ বুলাইয়া লইলে যেগুলা প্রথমে নজরে পড়িতে পারে নাই, দ্বিতীয় বারে হয়ত চোখে লাগিতেও পারে। তবে এ কথাও সত্য যে, চোখে পড়িলেও সে-সব কথার এমন কিছু সত্যকার মূল্য নাই, যার জন্য আর একবার পড়িয়া সময় নষ্ট করা যাইতে পারে। সেটা আপনার ইচ্ছা।
   
একে একে মোটের উপর প্রায় সব কথাই হইল। বাকি রহিল শুধু ঐ শিষ্যত্বের কথাটা।
   
গুরু হইবার ভারি শক্তি ছিল আমার বয়স যখন ১৮ পার হয় নাই। তখন যাঁদের গুরুগিরি করিয়াছিলাম,  এখন তাঁরা আমাকে ডিঙাইয়া এত উঁচুতে গিয়াছেন যে তাঁদের নাম যদি করি, আপনার বিস্ময় রাখিবার স্থান থাকিবে না যে, আমি তাঁদেরও এক সময়ে লেখা পড়িয়া কাটিয়া কুটিয়া দিয়াছি, ভালমন্দ মতামত প্রকাশ করিয়াছি এবং পথ দেখাইয়া দিয়াছি।
   
তারপর যত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছি, ঐ ক্ষমতা ততই হারাইয়াছি। এখন আজকাল একেবারেই আর নাই। আমি শিখাইব আপনাদের এ-কথা আর ত মনে আনিতেই পারি না।
   
এ পত্র যত দিনে আপনার হাতে পড়িবে, সেই সময় আমিও সম্ভবতঃ তোড়জোড় বাঁধিয়া রেঙ্গুন ছাড়িয়া জাহাজে চড়িব। দেহটা যদি দেশ বদলাইলে একটু সারে এই আশা।
   
আর একবার বুড়া মানুষের আশীর্বাদ করিবেন। ইতি—

শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up

Re: শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র_PERSONAL LETTER OF SARAT CHANDRA CHATTERJEE

সুধীরচন্দ্র সরকার

পরম কল্যাণবরেষু শ্রীমান সুধীরচন্দ্র সরকার
১৪ মার্চ, ১৯১৬

নিরাপদ দীর্ঘজীবনেষু—
   
কাল তোমার টেলিগ্রাম এবং তাহার আগের দিন পত্র পাইয়াছি।....শুনিয়াছ বোধ হয়, আমি প্রায় পঙ্গু হইয়া গিয়াছি। হাঁটিতে পারি না বলিলেই চলে। তবে লেখাপড়ার কাজ পূর্বের মতই করিতে পারি। কিন্তু মন এত বিমর্ষ যে, কোন কাজে হাত দিতে ইচ্ছা করে না—করিলেও তাহা ভাল হয় না। শুধু যেগুলা আগে লেখা ছিল—অর্থাৎ অর্ধেক, বারো আনা, চার আনা, এমন অনেক লেখাই আমার আছে—সেইগুলাই কোনমতে জোড়াতাড়া দিয়া দিই। চরিত্রহীন সম্বন্ধে ওটা করিতে চাই নাই বলিয়াই এত দিন ২ অধ্যায় করিয়া পাঠাইতে ছিলাম। এবার তুমি আমার কাছে বসিয়া না হয় সবটা ঠিক করিয়া লইয়ো। আমি কবিরাজি চিকিৎসার জন্য কলিকাতা যাইতেছি। এক বৎসর থাকিব। ১১ই এপ্রিল রওনা হইব। কারণ, তার আগে আর টিকিট পাওয়া কোন মতেই গেল না। আজকাল সপ্তাহে একটা, কখনও বা দেড় সপ্তাহে একখানা করিয়া জাহাজ ছাড়িতেছে। ....আজ দেড় মাসের উপর হইতে আফিস প্রভৃতি সমস্তই বন্ধ। কোনমতে টিকিয়া আছি মাত্র।....
   
পল্লী-সমাজ এই জন্যই ভাল হইতে পারিল না। এই জন্যই এত লোক নিন্দা করিল। শরীর সুস্থ, মন সুস্থ থাকিলে শেষটা এরূপ হইতে পারিত না। চরিত্রহীন এরূপ হইয়া যাইলে বড় লাগিবে।
   
বেশত আসিতে ইচ্ছা কর এসো। কিন্তু টিকিট পাইবে কি ?  তাছাড়া এত ভীড় জাহাজে হয় যে লোক মরিয়া মরিয়া আসে।
   
আর এক কথা। কলিকাতার স্বাস্থ্য এখন কেমন ?  এখানে অত্যন্ত বসন্তের প্রকোপ, ওখানেও কি তাই ?  গত বৎসরের মত কি ?  এই খবরটা আমাকে অতি অবশ্য দিবে।

আঃ  শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up