Topic: পুরুষ-নারী_ চপলরানী_কমলেন্দু সরকার_I AM CHAPALRANI NOT CHAPAL BHADURI

ভূমিকা  : পুরুষ-নারী
কমলেন্দু সরকার

শুধু কি স্ত্রীলিঙ্গ? পুংলিঙ্গও এক নির্মাণ। এই নির্মাণের বিরুদ্ধে নিঃশব্দ বিপ্লবের চিহ্ন যে একেবারে নেই, তাও নয়। জেনেশুনে এর বিরুদ্ধে কেউ কেউ স্বর তুলেছেন নিশ্চয়ই, কিন্তু শরীর ততটা নয়, মনই বেশি বেঁকে বসেছে। এই মন মানবী মন। পুরুষ-শরীরটিকে আচ্ছন্ন, অবশ করে দিতে সক্ষম ওই আশ্চর্য মন। এ কাজে হাত মেলায় পেশা, নট-নটীর খেলা...

সামনের দিক দিয়ে ঢোকার উপায় নেই। তাঁকে দেখলে সকলেই গুরু-গুরু বলে হামলে পড়বে। একটা সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে যাবে। তাই কালো কাচ ঢাকা গাড়িটা এসে দাঁড়াল রবীন্দ্র সদনের পিছনে। সাজঘরের সামনের দরজা ঠেলে ঢুকলেন উত্তমকুমার। সঙ্গে সুপ্রিয়াদেবী। উইংসের পাশে এসে তাঁরা বসলেন। প্রেক্ষাগৃহ তখন অন্ধকার। পালা শুরু হয়ে গেছে। ‘মাইকেল মধুসূদন’। মাইকেলের মা জাহ্নবীর অভিনয় দেখে মুগ্ধ মহানায়ক।

chapal bhaduri

ঘটনাটা ১৯৭০ সালের কোনও এক সন্ধ্যার। অভিনয় শেষে উত্তমকুমার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, জাহ্নবীর সঙ্গে আলাপ করবেন। জাহ্নবীর তখন মেকআপ তোলা শেষ। এক ভদ্রলোক জাহ্নবীকে নিয়ে গেলেন উত্তমকুমারের কাছে। তাঁকে দেখে বিরক্ত হলেন উত্তমকুমার। বললেন, ‘না, না, এঁকে নয়। জাহ্নবীর ভূমিকায় যিনি অভিনয় করেছেন, আমি তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে চাই।’

উত্তমকুমারের বিরক্তি প্রকাশ স্বাভাবিক। কেননা, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কোনও মহিলা নন, একজন পুরুষ। সেই অভিনেতা এতটুকু না দমে বললেন, ‘আমিই সেই জন।’ উত্তমকুমার বিস্ফারিত চোখে তাঁকে দেখলেন আপাদমস্তক। তখনও তাঁর ঘোর কাটেনি। অবাক হয়ে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আপনি বিয়ে করেছেন?’

‘না’, অভিনেতাটির উত্তর।

উত্তমকুমারের কণ্ঠে বিস্ময়, ‘তা হলে এমন মাতৃভাব ফোটালেন কীভাবে!’

অভিনেতার উত্তর, ‘ আমি যা নই, তাকে ফুটিয়ে তোলাই তো অভিনয়।’

উত্তমকুমার সেদিন জাহ্নবীর ভূমিকায় যাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, তিনি ছিলেন যাত্রার মহানায়িকা চপলরানি। অর্থাৎ চপল ভাদুড়ি। পেশাদারি যাত্রা-দুনিয়ার নারী চরিত্রের শেষ পুরুষ অভিনেতা। শেষ তো বটে, শুরুটা কোথায় তাঁর?

ফিরতে হবে ১৯৩৯ সালে। উত্তর কলকাতার রাস্তাটার নাম বালাখানা ষ্ট্রিট। অধুনা কালী দত্ত ষ্ট্রিট। এই গলিরই ৪ নম্বর বাড়িতে থাকতেন সেকালের ডাকসাইটে অভিনেত্রী প্রভাদেবী। তাঁর স্বামী শিশিরকুমার ভাদুড়ির ভাই তারাকুমার ভাদুড়ি। প্রভা-তারার ছোট ছেলে চপলের এই বছরই জন্ম।

প্রভাদেবীর আগের স্বামী ছিলেন অমরেশ সিকদার। প্রভাদেবীর সঙ্গে যখন অমরেশের বিয়ে হয়, তখন তিনি তিন সন্তানের জনক। বিয়ে করলেও অমরেশ কিন্তু প্রভাদেবীকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে কোনওদিন তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাননি। বলা ভাল, নিয়ে যেতে পারেননি। অভিনেত্রী-স্ত্রীকে সেইসময় বাড়িতে তোলা ছিল খুব মুশকিল। যদিও দু’জনের ভালবাসা ছিল অটুট। প্রভাদেবীর আশা ছিল গৃহবধূর সম্মান তিনি পাবেন। এই কথা তিনি বারবার বলতেন অমরেশকে। তিনি প্রভাকে বলতেন এইভাবেই জীবনটা কাটিয়ে দাও।

প্রভাদেবী মেনে নিতে পারেননি স্ত্রীর মর্যাদাহীন ভালবাসা। তিনি অসম্মানিত বোধ করেছিলেন। প্রভাদেবী সম্পর্ক শেষ করে দিলেন একদিন। তখন তাঁর দুই পুত্র, এক কন্যা। তাদের নিয়ে একা থাকতেন প্রভাদেবী।

প্রভাদেবী সেকালের বিখ্যাত অভিনেত্রী তিনকড়ি দাসীর কাছে থেকে থিয়েটারে সখীর দলে যোগ দেন। এই কারণে তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে পরিত্যাগ করেন। সখীর দলে নাচার জন্য প্রভাদেবীর পারিশ্রমিক ছিল আটআনা। প্রায় সব নাটকেই তিনি থাকতেন সখীর দলে।

একদিন শিশির ভাদুড়ি সখীর দলের সমস্ত মেয়েকে দাঁড় করালেন। তিনি একটি নতুন মেয়ে খুঁজছেন। ‘আলমগীর’ নাটকের জন্য। চরিত্রটি রূপকুমারীর। অত মেয়ের মধ্যে থেকে ডাকলেন প্রভাদেবীকে। নানা রকমভাবে বাজিয়ে নিলেন। কিছু সংলাপ পড়ালেন। অসাধারণ সুন্দর কণ্ঠস্বর আর চোখ ছিল প্রভাদেবীর। শিশির ভাদুড়ি পরদিন থেকেই মহলায় যোগ দিতে বললেন প্রভাকে।

‘আলমগীর’-এর প্রথম রজনীতেই প্রভাদেবী মাত করে দিলেন। এরপর শুধু ওপরে ওঠার পালা। শিশির ভাদুড়ির দলে অভিনয় করার সুবাদে আলাপ হল তারাকুমারের সঙ্গে। আলাপ থেকে প্রেম এবং বিয়ে। প্রভাদেবীর মতো তারাকুমারও তিন সন্তানের জনক। তিনি অবশ্য ছিলেন বিপত্নীক। দু’জনের মধ্যে ছিল প্রচণ্ড ভালবাসা। খুব বড় মনের মানুষ ছিলেন তারাকুমার। অমরেশের তিন সন্তানকেই তিনি স্বীকৃতি এবং পরিচিতি দিয়েছিলেন। ওরা কিন্তু তারাকুমারকে মেনে নিতে পারেননি।

chapal bhaduri

১৯৪৫ সাল। বালাখানা ষ্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে প্রভাদেবীরা চলে এলেন ১৩/১সি, ডালিমতলা লেনে। শ্রীরঙ্গম থিয়েটারের কাছে তিনতলা বাড়িটির ভাড়া ছিল ৪০ টাকা। পরে বাড়িটি কিনে নেন প্রভাদেবী। শুধু মঞ্চে নয়, হিজ মাস্টার্স ভয়েসেও রেকর্ড করেছেন প্রভাদেবী। সেকালে রেকর্ড-নাটককে বলা হত পালা। চপলের তখন ছ’বছর বয়স। দুপুরবেলা বসে বসে ওই পালা শোনাই ছিল তাঁর কাজ।

ছোটছেলে বলেই বোধহয় চপলকে বেশি ভালবাসতেন প্রভাদেবী। চপলও ছিলেন খুব মা-ন্যাওটা। প্রায়ই মা-কে বলতেন নাটক দেখতে নিয়ে যেতে। মায়ের ধমক, আগে পড়াশুনো করো। ছোটছেলের একটানা বায়না কতদিন এড়ানো যায়!

একদিন চপল মায়ের সঙ্গে গেলেন ‘সীতা’ দেখতে। সেই নাটকে প্রভাদেবী ছিলেন নাম ভূমিকায়। উইংসের পাশে পিয়ানোর তলায় ছেঁড়া ন্যাকড়া পেতে বসে পড়লেন চপল। ভাল লেগে গেল নাটক। এরপর চপলের বায়না, তিনি অভিনয় করবেন।

অভিনয়ের সুযোগও চলে এল একদিন। শ্রীরঙ্গমে তখন চলছে ‘বিন্দুর ছেলে।’ সময়টা ১৯৪৫। প্রভাদেবী আছেন। বিন্দু হলেন সাবিত্রীদেবী। দুপুরবেলা ঘুমচ্ছেন চপল। হঠাৎই একজন এসে বলল, ‘চল, অভিনয় করতে হবে।’ বালক চপল অবাক। সেদিন প্রথম শোয়ে ছোট অমূল্য আসেননি। তাই, ছেলের আবদার মেটাতে প্রভাদেবী ডেকে পাঠিয়েছেন চপলকে।

চপল জানেন না তিনি কী পার্ট বলবেন! তবুও ভাবেন এ আর এমন কী কঠিন কাজ। মা বলেন। ছোড়দিও বলেন। চপলের ছোড়দি হলেন কেতকী দত্ত। অল্প বয়সে তিনি ছেলেদের চরিত্রে অভিনয় করতেন।

নাটক শুরু হল। সাবিত্রীদেবীর হাত ধরে ঢুকলেন চপল। প্রভাদেবীও আছেন। চপলের সামনে অন্ধকার। দর্শক আসনকে মনে হচ্ছে অন্ধকার সমুদ্রে ঢেউ আছড়ে পড়ছে। তাঁর বুকের ভিতরটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। হঠাৎই মায়ের এক চিমটি। সম্বিত ফেরে তাঁর। ওই মঞ্চেই মায়ের চাপা গলার সংলাপ আওড়ে বাজিমাত করে দিলেন চপল। কোনও দর্শকই টের পেলেন না। চপল পেলেন পাঁচটাকা পারিশ্রমিক। নাটক করে জীবনের প্রথম রোজগার।

১৯৫০ থেকেই চপলের নিয়মিত অভিনয় শুরু হয়ে গেছে। মাস মাইনে ৪০ টাকা। পড়াশুনোও চলছে পাশাপাশি। তাতে মন নেই। অভিনয়টাই মুখ্য হয়ে গেছে। ১৯৫২ পর্যন্ত একাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন। ১৯৫২ সালে ‘সেই তিমিরে’ নাটকের একটা শো করে মারা গেলেন প্রভাদেবী। রঙমহলে বন্ধ হয়ে গেল নাটক। মায়ের কাছে অনেক কিছু শেখার বাকি ছিল। সুখের সময় শেষ। আকাশ ভেঙে পড়ল চপলের মাথায়। প্রভাদেবীর ছেলে বলে রঙমহলে থেকে গেলেন চপল। সঙ্গে আরও দু’জন— রেণুবালা সুখের ছেলে সুব্রত আর সত্যব্রত। কোনও কাজ নেই। থিয়েটার হলে গিয়ে শুধু বসে থাকা। তবুও মাস গেলে মাইনেটা পাওয়া যায়।

এভাবে চলে না চপলের। এত কম টাকায় কী হয়! ছোড়দি কেতকীরও বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁর দুটি সন্তান। সবদিক সামলাতে হিমসিম অবস্থা কেতকীর। সরাদিন পরিশ্রম করতে করতে বিরক্ত তিনি। দুঃখ-কষ্ট জমতে জমতে রাগে ফেটে পড়েন একদিন। অনেক কটূ কথা শুনতে হয় চপলকে।

কটু কথার স্ফূলিঙ্গ থেকে দাবানল সৃষ্টি হল চপলের ভিতরে। কিন্তু কী করবেন তিনি? কোথায় যাবেন? ঘোরাঘুরি করেও তো কিছু হয় না। লেখাপড়াও তেমন জানা নেই। কে চাকরি দেবে? একমাত্র পুঁজি বলতে তো শুধু অভিনয়। তেরো-চোদ্দো বছরের কিশোরের কাছে এ এক বিরাট সমস্যা। এই বয়সে কী পার্টই বা মিলবে! কোন চরিত্রই বা পাবেন!

দেখতে দেখতে সময় চলে যায়। সংসারে অভাব-অনটনও বাড়ে। অথচ, কিছুই করতে পারছেন না চপল। এক দিকে মানসিক যন্ত্রণা। অন্য দিকে ঘোরাঘুরির ফলে শারীরিক কষ্ট। এদিকে অভিনয়টা মাথায় চেপে বসেছে। অথচ, কিছু করতে না পারার যন্ত্রণা। বিষণ্ণতা তখন নিত্যসঙ্গী। দেখতে দেখতে দু’টো বছর কেটে গেল। এতটুকু এগোতে পারেন না চপল।

একদিন হঠাৎ এক আত্মীয় চপলকে বলেন, চাকরি করার কথা। চাকরিটা অভিনয়ের। হাতে চাঁদ পেলেন চপল। একে চাকরি, তার ওপর শুধুই অভিনয়। আনন্দে লাফিয়ে ওঠেন তিনি। ভাবেন, কষ্টের দিন বোধহয় শেষ। সেই আত্মীয় জানালেন, শুধু মেয়েদের চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। শুনে মুষড়ে পড়লেন চপল। একজন পুরুষমানুষ মেয়ে সেজে অভিনয় করবে! মন থেকে সায় মিলছিল না। চপলের মনের ভাব বুঝতে পারেন তিনি। বলেন, ‘যাত্রায় তো ছেলেরাই মেয়েদের ভূমিকায় অভিনয় করে। এটা না পারার কী আছে?’ কথাটা ফেলনা নয়। চাকরির লোভটা ভিতরে উঁকি মারছে। পিছন ফিরলেই সেই অভাব। চপলের ভিতরে একটা চ্যালেঞ্জ চাড়া দিয়ে উঠেছে। চপল রাজি হলেন।

চাকরি হয়ে গেল। রেলের কনষ্ট্রাকশন ডিপার্টমেন্টে অভিনয়ের জন্য চাকরি। অফিসে কোনও কাজ করতে হবে না। রেলের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের নাটকে অভিনয় করতে হবে। সবগুলো মহিলা চরিত্র। প্রভাত ঘোষের জায়গায় বহাল হলেন চপল। তিনিই আগে ‘ফিমেল পার্ট’ করতেন। তাঁর বয়স হয়েছে বলেই এই বিকল্প ব্যবস্থা। বাঁকা কথা উড়ে এল প্রভাত ঘোষের কাছ থেকেই। তাচ্ছিল্য তাঁর কথায়— ‘এ করবে মর্জিনার পার্ট, রোগা, মিনমিনে গলা।’

চপলের ভিতর তখন জেদ চেপে গেছে। মর্জিনার গান গেয়ে মাত করে দিলেন। সকলেই খুশি। চাকরি পাকা হয়ে গেল। মাসে সাড়ে বাহাত্তর টাকা মাইনে।

চাকরি তো পাকা। ওদিকে চপলের অবস্থা করুণ। গান গাওয়া এক জিনিস, আর মেয়ে সেজে অভিনয়, সে এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। মায়ের বন্ধু রেণুমার কাছে ছুটে গেলেন তিনি। রেণুমাই সবকিছু শিখিয়ে-পড়িয়ে দিলেন। তবুও, প্রথম অভিনয়ের দিন নার্ভাস চপল। প্রথম ফিমেল পার্ট। তার ওপর নায়িকা। বিখ্যাত ড্রেস কোম্পানি বি ব্রাদার্সের মেকআপ ম্যানেরা সুন্দর করে সাজিয়ে দিলেন। পরনে লাল রঙের বাগদাদি পায়জামা, পাঞ্জাবি, সোনালি ওয়েস্ট কোট, লাল ওড়না। দুটি বিনুনি ঝুলছে পিঠের ওপর। অ্যালবার্ট কাটা চুল। গোলাপ ফুলও রয়েছে একটা। গায়ে সোনার গয়না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতেই পারছেন না চপল। সেই সন্ধ্যাতেই এক অভিনেতার মৃত্যু, এবং এক পুরুষ-অভিনেত্রীর জন্ম হল।

যাত্রার কনসার্ট শুরু হল। দিশেহারা অবস্থা চপলের। কে একজন ঠেলে ঢুকিয়ে দিলেন তাঁকে। সিন তখন শুরু হয়ে গেছে। জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হল। মঞ্চে আর মঞ্চের বাইরে। জীবনের প্রথম ফিমেল রোল।

এরপর থেকে শুধুই অভিনয়। ভিন্ন ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে। মন ভরে না চপলের। ছোট ছোট পার্ট। কোনও নাটকে শুধুই গান। কোনও নাটকে আবার শুধুই নাচ। অথচ, ভাল অভিনয়ের জন্যে পাগল মন। এদিকে ফিমেল রোলে মন বসে গেছে চপলের।

চপলের এই চাকরি চলল ১৯৫৬ পর্যন্ত। যে-সাহেবের অধীনে চাকরি ছিল চপলের, তিনি চলে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমি তো চলে যাচ্ছি, তোমাকে কোনও একটা কারখানায় ঢুকিয়ে দিয়ে যাচ্ছি। প্রথমে তোমাকে লোহা পেটাতে হবে। লেগে থাকলে ফিটার হয়ে যাবে। মাইনে খুব খারাপ হবে না। দেখবে তোমার জীবনধারা বদলে যাবে।’ দোটানায় চপল। কী করবেন! সবাই বললেন, ওসব কাজ কেউ করে নাকি। চেহারা খারাপ হয়ে যাবে। ওই চাকরি কোরো না। আমরা তো আছি।

চাকরি করলেন না চপল। যারা বলেছিল, আমরা আছি, কাজ দেব। তারা কেউ ফিরেও তাকাল না চপলের দিকে। সমস্ত ডিপার্টমেন্টে ঘুরে ঘুরে একটা পার্টের জন্যে দরবার করেন। কেউ কাজ দেয় না। আবার সংকট।

ভিতরে ভিতরে অভিনয় করার তীব্র ইচ্ছে। অথচ, কোনও কাজ নেই হাতে। তিরিশ-চল্লিশ টাকা নাইটে ছোট ছোট ক্লাবের নাটকে অভিনয় শুরু হয়ে গেল চপলের। এ ছাড়া, ড্রেস কোম্পানিগুলোও কাজ দিত চপলকে। অ্যামেচারে মহিলা চরিত্রে অভিনয়ের কাজ আসতে লাগল। বর্ধমান, উত্তরবঙ্গ, জামশেদপুরে চরকির মতো ঘুরে ঘুরে অভিনয়।

একদিন শো ছিল দেওঘরে। অনুকূলচন্দ্রের আশ্রমে, ‘সম্রাট অশোক।’ চপলের ভূমিকা সেখানে তিষ্যা রক্ষিতার। এখানে এসেছে পেশাদারি দল নাথ কোম্পানিও। নাথে কানাই দাস ফিমেল পার্ট করতেন। তাঁর যাত্রায় নাম ছিল বনফুল। ওই কানাই-ই চপলকে বললেন, ‘দাদা, অভিনয়-ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না। পেশাদারি দলে যোগ দিন।’

চপলকে নট্ট কোম্পানিতে নিয়ে এলেন কানাই। সূর্যবাবুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সময়টা ১৯৫৮-র জুলাই। সূর্যবাবু বললেন, ‘বড্ড রোগা। গলাটাও চিঁ-চিঁ করছে। আমাদের অভিনয় তো চড়া স্কেলে। মাখন আসুক।’ নট্ট কোম্পানির কর্ণধার মাখনলাল নট্ট। মাখনবাবু এসে চপলকে দেখলেন, কনে দেখার মতো। বললেন, ‘ঠিক আছে, হয়ে যাবে। তবে, গলাটা একটু নরম।’

ছবিরানির জায়গায় চপলকে নেওয়া হল। তাঁর মতো পুরুষ ফিমেল পার্টে কেউ নেই। নট্টতে তখন মহিলা অভিনেত্রীর চল ছিল না। পুরুষেরাই নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন।

নট্টতে চাকরি হল চপলের। চপলরানি হওয়ার প্রথম সিঁড়ি টপকালেন তিনি। ১৯৫৯। ছবিরানির পার্টগুলো দেওয়া হল চপলকে। একসঙ্গে আট-নটা পালার পার্ট। ‘রাজা দেবিদাস’-এ অঞ্জনা, ‘কোহিনূর’-এ কোহিনূর, ‘সত্যাশ্রয়ী’-তে ঝর্না। সবই ছবিরানির করা।

বড় পার্ট, চড়া অভিনয় করতে প্রথমে খুব কষ্ট হত চপলের। তাই, দুপুরবেলা পার্ট মুখস্থ আর সন্ধেবেলা রিহার্সাল করতেন তিনি। এইভাবেই শুরু হল চপলের পেশাদারি যাত্রা জীবন। শুরু অভিনেত্রীর জীবনও।

মাসে একশো টাকা মাইনে। তা ছাড়া, যেদিন রান্না হত না, সেদিন একটাকা খোরাকি। যাত্রার ভরা মরশুম। সর্বত্র পালা চলছে। প্রচুর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ শুনতে হচ্ছে চপলকে। তুলনা উঠছে ছবিরানির সঙ্গে। অনেকে বলছেন, ‘ভাল, কিন্তু ছবিরানির মতো নয়।’ কলাইয়ের থালায় খাওয়া নিয়ে ঠাকুরের কাছেও শুনতে হয়েছে, ‘কত টাকা মাইনে পাও বাছা? ছবিরানির জায়গায় কাজ করছ বটে, ছবিরানি হয়েছো কি?

ছবিরানি নামটা তাড়া করে বেড়াত চপলকে। পরের ছেড়ে রাখা পোশাক কিছুতেই ফিট করাতে পারছেন না তিনি নিজের শরীরে। ‘প্রতিশোধ’ পালায় সুবিধে করতে পারছেন না। সহ শিল্পীরাও তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ। সূর্যবাবু বলেছেন, ‘নতুন ছেলে, একটু শিখিয়ে-পড়িয়ে নাও।’

তবে, এইটুকু সময়ের মধ্যেই চপল বুঝে গেছেন, যাত্রা-দুনিয়াটা বড় ক্ষুদ্র জায়গা। বড্ড নোংরা, বড় ছোট। কেউই কিছু শেখান না এখানে।

ওদিকে কিন্তু মাখন নট্টের ভরসা রয়েছে চপলের ওপর। ‘আর একটা ছবিরানি করে দেখিয়ে দিন’— এই কথা বলেছেন মাখন নট্ট, সূর্যবাবুকে। এদিকে ‘প্রতিশোধ’ পালা চলছে না। চপল বলেন সূর্যবাবুকে, ‘কী করব?’ সূর্যবাবু বলেন, ‘কিছু করার নেই। ‘প্রতিশোধ’ বন্ধ করে দেব।’ এদিকে চপলের জেদ, ছবিরানির ওপরে উঠতে হবে।

এই সময় যাত্রার পোস্টারে চপল ভাদুড়ির নাম লেখা হত না। এর জন্য দুঃখ ছিল তাঁর। হরিদা তখন নট্টর ফিমেল গাইয়ে-নায়িকা। তাঁরই নাম থাকত— হিরিমতি।

ওদিকে ছবিরানিকে নতুন প্রজন্ম নিচ্ছিল না। চপলের নাম ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে। ছবিরানির মতো চপলের গলা পুরুষালি নয়। গলার স্বর পরিবর্তনের আগে থেকে মহিলা চরিত্র করার জন্য কণ্ঠস্বর নরমই রয়েছে। এ ছাড়া, সাজ আর মেকআপ ছিল আধুনিক। নিজেই করতেন। নট্টর পালা না জমলেও নাম হচ্ছে চপলের। এমন সময় চপলকে মাথায় রেখে পালা লিখলেন ব্রজেন দে। পালার নাম ‘চাঁদবিবি।’ ১৯৬৪সাল। নাম ভূমিকায় চপল ভাদুড়ি। তখনও চপলরানি হয়ে ওঠেননি।

‘চাঁদবিবি’-ই চপলকে এনে দিল ‘চপলরানি’র সম্মান। সুপারহিট হয়ে গেল পালা। নতুন প্রাণ পেল নট্ট। ‘চাঁদবিবি’-র সাজ-পোশাকের পরিকল্পনা ছিল চপলের নিজের। দশগজ কাপড় দিয়ে পেশোয়াজ বানানো হল। সাদা পাঞ্জাবি, সোনালি ব্রোকেটের জহর কোট। বিনুনি করা চুল। কপালের ডানদিকে পাথর সেটিং একফালি বাঁকা চাঁদ। দু’গাছা হিরের চুড়ি। গলায় লম্বা হিরের হার। এই সাজই সব ছিল না। আকর্ষক করে তুলেছিলেন নিজের শরীরটিকেও। চপলের কথায় তা জানা যায়: ‘বক্ষ-সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নিউ মার্কেট থেকে কিনতাম স্পঞ্জের বক্ষ-আবরণী। ফোম তখনও বেরয়নি। স্পঞ্জের সে জিনিসের শেপ এবং গড়ন এমনই ছিল, বোঝাই যেত না যে, সেটা নকল।’ এমন সাজেই মাত হয়ে যেত ‘চাঁদবিবি।’

‘চাঁদবিবি’-র সাফল্যের পর সাফল্য। পালা ‘বিল্বমঙ্গল।’ চপলরানিই বিল্বমঙ্গল। নট্টর সুদিন। ভাগ্য ফিরল চপলরানির। বিজ্ঞাপনে-পোস্টারে ছয়লাপ চপলরানির। শুরু হল পুরনো পালা ‘সোনার ভারত।’ চপলরানি এখানে জয়চন্দ্রের স্ত্রী পূর্ণিমা। এই পালাও সুপার হিট। হিটের হ্যাটট্রিকে চপলরানির মুঠোয় তখন সাফল্য। দর্শকের নয়ন-মণি তিনি।

তাঁর সাফল্য কারও কারও কাছে ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়াল। চক্রান্তের শিকার হলেন চপলরানি। তাঁকে সরে যেত হল নট্ট থেকে। ডাক এল নবরঞ্জন অপেরা থেকে। এক হাজার টাকা অগ্রিম। যাদের চক্রান্তে সরে যেতে হয়েছিল নট্ট থেকে তারাই এক সময় ‘আউট’ নট্ট থেকে। তাই, আবার ‘ব্যাক টু প্যাভেলিয়ন’ চপলরানি। নতুন পালা ‘ময়ূর সিংহাসন’ জমল না। আবার নতুন পালা ‘ভরত বিদায়।’ রামায়ণ নিয়ে কৈকেয়ীর নতুন রূপ। এই পালায় কৈকেয়ী নিষ্ঠুর-খল চরিত্রের নয়। কৈকেয়ীর ভূমিকায় চপলরানি। আবার সাফল্য। বিপুল খ্যাতি। পর পর সাফল্যে তাঁর অহংকার তখন আকাশ স্পর্শ করেছে।

নট্ট কোম্পানির পালাও তখন লেখা হচ্ছে চপলরানিকে মাথায় রেখে। লেখা হচ্ছে বটে, জমছে না। নট্টর সঙ্গে মনোমালিন্য শুরু হল।

নট্ট ছেড়ে আবার নবরঞ্জন অপেরা। এবার ফিরে যাওয়ার কোনও ব্যাপার নেই। ১৯৬৮ সালের চুক্তিপত্রে সই করলেন চপল। এখানে প্রথম পালা ‘মাইকেল মধুসূদন।’ চরিত্র মাইকেল-জননী জাহ্নবী-র। এ ছাড়াও দেবগিরি, আনারকলি, নেকড়ের থাবা, কমলাবাঈ, করালীসহ একাধিক পালা চপলরানির কাছে এল। দলের পরিচালক-অভিনেতা ছিলেন যাত্রা জগতের ভি আই পি স্বপনকুমার। খুব ভাল সর্ম্পক গড়ে উঠল তাঁর সঙ্গে চপলরানির। এমনকী স্বপনকুমারের সাজঘরেই মেকআপ করতেন চপলরানি। স্বপনকুমারের মত ছিল— ‘সকলের সামনে যদি চপল মেয়ে সাজে, তা হলে ওর সমস্ত সৌন্দর্যটাই নষ্ট হয়ে যাবে।’ এই নিয়ে প্রচুর কানাঘুষো ছিল। নবরঞ্জনেও মাত করে দিলেন চপলরানি। দলের নায়িকা মিতা বলেছিলেন, ‘তুই মেয়ে হলি না কেন রে চপল?’

চপল বলতে পারতেন, বলেনও— আমি শরীরে পুরুষ, অন্তরে নারী। পুরুষ-নারী। দুটি সত্তাই তাঁর মধ্যে প্রবল, যেন জোড়া ফুল। তাই তাঁর চোখে নারী কখনও বোন, কখনও মা, বা নিকট আত্মীয়া। চপলকে বেশি টানে অবশ্য পুরুষই। পুরুষ তাঁর ভাললাগা, পুরুষ তাঁর ভালবাসা।

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ শ্রাবণ ১৪০৯ রবিবার ৪ অগস্ট ২০০২

One best book is equal to hundred Good FRIENDS;
But one good friend is equal to a LIBRARY

Thumbs up